সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগে জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল আব্দুল কাদের মোল্লার ফাঁসির রায় ঘোষণার পর এর প্রতিবাদে ঢাকা, চট্টগ্রাম,গাজীপুর, বগুড়াসহ দেশের বিভিন্নস্থানে জামায়াত-শিবির কর্মীরা গতকাল মঙ্গলবার বিক্ষোভ মিছিল করেছে। তারা রাজধানীতে অন্তত ১০টি গাড়ি ভাংচুর করে। শিবির কর্মীদের ছোঁড়া বোমায় এক অটোরিকশা যাত্রীর শরীর ঝলছে যায়। রাজধানীতে ২টি গাড়িতে আগুন ধরিয়ে দেয় শিবির কর্মীরা। চট্টগ্রামে জামায়াত-শিবির কর্মীদের সঙ্গে পুলিশের ব্যাপক সংঘর্ষ হয়। মিছিলকারীরা পুলিশের একটি ট্রাক ও একটি প্রাইভেট কারে আগুন ধরিয়ে দেয়। বগুড়া জামায়াত-শিবিরের হামলায় পুলিশের দুই সদস্য আহত হয়। গাজীপুরে বাসে অগ্নিসংযোগ করে জামায়াত কর্মীরা।
আমাদের বিশেষ প্রতিনিধি জানান, গতকাল বেলা ২টার দিকে ১০/১২ জন শিবির কর্মী মগবাজার এলাকার একটি গলি থেকে কাদের মোল্লার ফাঁসির রায়ের প্রতিবাদে আহূত হরতালের সমর্থনে ঝটিকা মিছিল বের করে। মিছিলটি সেলিনা পারভিন সড়ক দিয়ে যাওয়ার সময় মিছিলকারীরা গুলফেসা প্লাজার সামনে রাস্তার পাশে পার্কিং করে রাখা ৩টি গাড়ি নির্বিচারে ভাংচুর চালায়। এ সময় তারা একটি গাড়িতে আগুন ধরিয়ে দেয় এবং কয়েকটি ককটেল ফাটিয়ে আতঙ্কের সৃষ্টি করে। তাদের হামলায় সাংবাদিক লেখা একটি প্রাইভেট কারও ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
একই সময় যাত্রাবাড়ী এলাকায় হরতালের পক্ষে জামায়াত-শিবির ঝটিকা মিছিল করে। তারা ৫/৬টি ককটেল বিস্ফোরণ এবং ৭টি গাড়ি ভাংচুর করে। এক পর্যায়ে পুলিশের ধাওয়া খেয়ে তারা পালিয়ে যায়। বিজয়নগর এলাকায় বিকাল সাড়ে ৩টার দিকে জামায়াত-শিবিরের ক্যাডাররা একটি সিএনজি চালিত অটোরিক্সায় বোমা নিক্ষেপ করে। বোমার আঘাতে অটোরিক্সার যাত্রী আব্দুল খালেকের (৫৫) শরীর ঝলসে যায়। তাকে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের বার্ণ ইউনিটে ভর্তি করা হয়েছে। শিবিরের কর্মীরা বিজয়নগরে একটি প্রাইভেট কারে আগুন ধরিয়ে দেয়। এখানেও তারা ককটেল ফাটায়। এরপর তারা পল্টন এলাকায় ঝটিকা মিছিল বের করলে পুলিশ ৩ জন মিছিলকারীকে আটক করে।
চট্টগ্রাম অফিস জানায়, নগরীর এনায়েতবাজার মোড়ে পুলিশের সাথে জামায়াত শিবির কর্মীদের ব্যাপক সংঘর্ষ ও ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়ার ঘটনা ঘটেছে। জামায়াত শিবির কর্মীরা মিছিল নিয়ে এসে ব্যাপক ককটেল বিস্ফোরণ ঘটিয়ে এলাকায় ব্যাপক আতঙ্ক সৃষ্টির পর পুলিশের একটি ট্রাক ও একটি প্রাইভেট কারে আগুন ধরিয়ে দেয় বলে পুলিশ জানায়। গতকাল মঙ্গলবার বেলা ১০টা থেকে ১১টার মধ্যে সংঘর্ষের এ ঘটনা ঘটে। এসময় দুর্বৃত্তরা রাস্তায় বেশ কয়েকটি যানবাহন ও দোকানপাটে ভাংচুর চালায়। মিছিলকারীদের ছত্রভঙ্গ করতে পুলিশ কয়েক রাউন্ড ফাঁকা গুলি ও টিয়ার গ্যাস নিক্ষেপ করে। প্রায় ঘন্টাব্যাপী সংঘর্ষে এনায়েত বাজার মোড় থেকে তিনপোলের মাথা পর্যন্ত এলাকা রণক্ষেত্রে পরিণত হয়। তান্ডবে কোতোয়ালি থানার এসআই আলিম ও নায়েক প্রতাপ ছাড়াও অন্তত ১০ জন পথচারী আহত হন বলে সিএমপির সহকারী কমিশনার মির্জা সায়েম মাহমুদ ইত্তেফাককে জানান। এ ঘটনায় কয়েকজন জামায়াত শিবির কর্মীকে আটক করা হয়েছে বলে পুলিশ জানায়।
প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, কাদের মোল্লার রায় প্রত্যাখ্যান করে সকাল ১০টার দিকে নগরীর কোতোয়ালি মোড় থেকে মিছিল বের করে জামায়াত শিবির। মিছিলটি রিয়াজউদ্দিন বাজার তিনপোলের মাথা হয়ে জুবিলি রোড দিয়ে এনায়েতবাজার মোড়ে আসার পর পুলিশ এতে বাধা দিলে উভয় পক্ষের মধ্যে ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়া শুরু হয়।
এদিকে, চট্টগ্রাম মহানগর জামায়াতের সেক্রেটারি মুহাম্মদ নজরুল ইসলাম বলেছেন, নির্বাচন থেকে বাইরে রাখতে জামায়াতকে ধ্বংস করতে চায় আওয়ামী লীগ। এ দূরভিসন্ধি বাস্তবায়ন করার জন্য আব্দুল কাদের মোল্লাসহ শীর্ষ জামায়াত নেতাদের হত্যার ষড়যন্ত্র করছে সরকার। এদেশের জনগণ এ হত্যার ষড়যন্ত্র প্রতিরোধ করবে। তিনি আব্দুল কাদের মোল্লাসহ সকল শীর্ষ নেতাদের
মুক্তির দাবিতে বুধ ও বৃহস্পতিবারের ৪৮ ঘন্টার হরতাল
সফল করার আহ্বান জানান। গতকাল সকালে নগরীর এনায়েত বাজার মোড়ে এক সংক্ষিপ্ত সমাবেশে তিনি এসব কথা বলেন। সমাবেশে আরো বক্তব্য রাখেন জামায়াত নেতা আবু মুনয়িম, এম. ছিদ্দিকুর রহমান, ছাত্র শিবির নগর দক্ষিণ সভাপতি এমএইচ সোহেল, নগর উত্তর সেক্রেটারি মুহাম্মদ নুরুল আমিন প্রমুখ।
গাজীপুর প্রতিনিধি জানান, কাদের মোল্লার ফাঁসির রায়ের প্রতিবাদে এবং আজ থেকে ৪৮ ঘন্টার হরতালের সমর্থনে গতকাল মঙ্গলবার গাজীপুরে বিভিন্ন স্থানে বিক্ষোভ মিছিল, যানবাহন ভাংচুর ও একটি বাসে অগ্নিসংযোগ করেছে জামায়াত-শিবির। গাজীপুর পৌর জামায়াতের উদ্যোগে বিকেলে সিটি কর্পোরেশনের বাসস্ট্যান্ড এলাকায় বিক্ষোভ মিছিল বের করা হয়। এ সময় ৪/৫টি বাসের কাঁচ ভাংচুর করে মিছিলকারীরা। পরে পুলিশ ও পরিবহন শ্রমিকরা ধাওয়া করে মিছিলটি ছত্রভঙ্গ করে দেয়। সন্ধ্যায় চান্দনা চৌরাস্তা এলাকায় গাজীপুর সদর উপজেলা জামায়াতের উদ্যোগে বিক্ষোভ মিছিল ও সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়। এ সময় যানবাহনে ব্যাপক ভাংচুর ও গাজীপুর-ঢাকা রুটে চলাচলকারী বলাকা পরিবহনের একটি বাসে অগ্নিসংযোগ করা হয়। খবর পেয়ে পুলিশ ও ফায়ার সার্ভিস এসে আগুন নেভায়।
বগুড়া প্রতিনিধি জানান, গতকাল বেলা ১টার দিকে বেশকিছু সংখ্যক শিবির কর্মী মুখে কাপড় বেঁধে শহরের থানা মোড়ে শ্লোগান দিতে শুরু করে। এসময় তারা সদর থানা লক্ষ্য করে ২টি ককটেলের বিস্ফোরণ ঘটালে একটি দোকানের কাঁচ ভেঙ্গে যায়। দোকানের সামনে দাঁড়িয়ে থাকা শিবগঞ্জ থানার ২ কনসটেবল আহত হন। আহতরা হলেন রফিকুল ইসলাম ও আব্দুল কুদ্দুস। এরপর শিবির কর্মীরা নবাববাড়ি সড়ক দিয়ে যাওয়ার পথে কাঁঠালতলায় আরও দুটি ককটেল বিস্ফোরণ ঘটায় এবং পরিবহন ভাংচুর করে। এছাড়া শহরের ইয়াকুবিয়া স্কুল মোড়সহ বেশকিছু এলাকায় কয়েকটি ককটেল বিস্ফোরিত হয়। বগুড়া সদর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা সৈয়দ সহিদ আলম জানান, আহত পুলিশ সদস্যদের বগুড়া পুলিশ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। বগুড়া শহর এবং শহরতলীর বিভিন্ন এলাকায় র্যাব, পুলিশ এবং আর্মড পুলিশ এর টহল জোরদার করা হয়েছে। এছাড়াও শহরের ৩ প্লা¬টুন বর্ডার গার্ড অব বাংলাদেশ (বিজিবি) মোতানের করা হয়েছে।
সিরাজগঞ্জে পুলিশকে লক্ষ্য করে ককটেল বোমা নিক্ষেপ
সিরাজগঞ্জ প্রতিনিধি জানান, হরতালের সমর্থনে জেলা ছাত্র শিবিরের সভাপতি রাশেদুল ইসলাম শহীদ ও সাধারণ সম্পাদক জাহিদুল ইসলামের নেতৃত্বে মিছিল বের করা হয়। শহরের মমতাজ সিনেমা হল এলাকা থেকে মিছিলটি বের হওয়ার পর ছাত্র শিবিরের নেতাকর্মীরা পুলিশকে লক্ষ্য করে পরপর ২টি ককটেল বোমা নিক্ষেপ করে। এসময় পুলিশ মিছিলকারীদের ছত্রভঙ্গ করতে টিয়ারসেল ও রাবার বুলট নিক্ষেপ করে। এ ঘটনায় উভয়ের মধ্যে ধাওয়া পাল্টা শুরু হয়। এক পর্যায়ে শিবিরের নেতাকর্মীরা পালিয়ে যায়। শহরের বিভিন্ন স্থানে পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে।
খুলনা অফিস জানায়, গতকাল সকাল ১১টায় নগরীর খুলনা পাবলিক কলেজের সামনে থেকে শিবির কর্মীরা ঝটিকা মিছিল বের করে। মিছিলটি খুলনা সরকারি মহিলা কলেজের সামনে পৌঁছালে শিবির কর্মীরা পুলিশের টহল গাড়ির সামনে দুটি ককটেল বিস্ফোরণ ঘটায়। এ ঘটনায় জড়িত থাকার অভিযোগে পুলিশ শিবির কর্মী এস এম আব্দুল্লাহ মনা, শাহারুল ইসলাম, মাহফুজুর রহমান ও রাশিদুল ইসলামকে গ্রেফতার করে। এছাড়া বেলা ১২ টার দিকে ফুলতলার নতুন হাট এলাকায় শিবিরের মিছিল থেকে একটি ট্রাক ভাংচুর হয়। উদ্ভূত পরিস্থিতিতে গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা ও মোড়ে মোড়ে অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়ন করা হয়েছে।
রাজশাহী অফিস জানান, কাদের মোল্লার মৃত্যুদণ্ডাদেশের প্রতিবাদে রাজশাহী মহানগরীতে বিক্ষোভ-সমাবেশ করেছে ইসলামী ছাত্রশিবির। গতকাল মঙ্গলবার বেলা ১১টার দিকে মহানগর শাখা ছাত্রশিবিরের শতাধিক নেতাকর্মী নগরীর নিউমার্কেট এলাকা থেকে বিক্ষোভ মিছিল নিয়ে কাদিরগঞ্জে শহীদ নজমুল হক গার্লস স্কুলের সামনে গিয়ে সংক্ষিপ্ত সমাবেশে মিলিত হয়। অন্যদিকে একই সময়ে নগরীর তালাইমারী এলাকায় প্রতিবাদ মিছিল করেছে বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রশিবির। তবে নগরীতে নাশকতার কোনো খবর মেলেনি।
চৌমুহনী (নোয়াখালী) সংবাদদাতা জানান, কাদের মোল্লার ফাঁসির রায ঘোষনার পর স্থানীয় জামায়াত ও শিবিরের ঝটিকা মিছিল থেকে গতকাল চৌমুহনীতে ১৫টি গাড়ি ভাংচুর করা হয়। আসরের নামাজের পর হঠাত্ চৌমুহনী বড় মসজিদ থেকে বেগমগঞ্জ উপজেলা পরিষদের ভাইস-চেয়ারম্যান মাওলানা বোরহান উদ্দিনের নেতৃত্বে ঝটিকা মিছিলটি বের হয়। মিছিলটি প্রধান সড়ক ধরে পশ্চিম দিকে ডেল্টা গেট পর্যন্ত গিযে ফিরে এসে রেল গেট অতিক্রম করে হঠাত্ যানবাহনে ইট পাটকেল নিক্ষেপ শুরু করে। এতে অন্তত ১৫টি গাড়ি ভাংচুর হয়।
সাতক্ষীরা প্রতিনিধি জানান, জামায়াত নেতা কাদের মোল্লার রায় ঘোষণার পর গতকাল সাতক্ষীরা- যশোর ও সাতক্ষীরা-কালিগঞ্জ সড়ক অবরোধ করে জামায়াত শিবিরের কর্মীরা। দুপুরে সাতক্ষীরা- কালিগঞ্জ সড়কের বাঁকাল পোট্রোল পাম্পের কাছে জামায়াত শিবিরের কয়েকশ’ কর্মী রাস্তায় গাছ ফেলে অবরোধ সৃষ্টি করে। এ সময় ৩/৪ টি যানবাহন ভাংচুর করা হয়। পরে সেখানে পুলিশ ও বিজিবির ও জামায়াত শিবির মুখোমুখি অবস্থান নেয়।। এসময় পুলিশ এক জামায়াত ক্যাডারকে মোটর সাইকেলসহ আটক করে। এদিকে সাতক্ষীরা-যশোর সড়কের অন্নের মোড়েও রাস্তায় গাছ ফেলে অবরোধ সৃষ্টি করলে পুলিশ তাদের ছত্রভঙ্গ করে দেয়।
শিবগঞ্জ (চাঁপাইনবাবগঞ্জ) সংবাদদাতা জানান, গতকাল বেলা ১১ টার দিকে শিবির চাঁপাইনবাবগঞ্জ-সোনামসজিদ সড়কে ইসরাইল মোড়ে একটি বিক্ষোভ মিছিল বের করে। মিছিল শেষে গাছের গুঁড়ি ফেলে সড়ক অবরোধ করে। আধাঘন্টার বেশি সময়ের অবরোধে সড়কের দুইদিকে অনেক যানবাহন আটকে পরে। অবরোধ চলাকালে সেখানে একটি ককটেল বিস্ফোরিত হয়। খবর পেয়ে ম্যাজিস্ট্রেটেরে নেতৃত্বে পুলিশ ও বিজিবি ঘটনাস্থলে অবরোধ সরিয়ে ফেলে।
নোয়াখালী প্রতিনিধি জানান, নোয়াখালীর জেলা শহর মাইজদীতে শিবির কর্মীদের হামলায় ছাত্রলীগ ও যুবলীগের দুই নেতা আহত হয়েছে। গতকাল মঙ্গলবার জামায়াত নেতা কাদের মোল্লার ফাঁসির রায় ঘাষণার পর দুপুরে এ ঘটনা ঘটে। এর আগে এ রায়ের প্রতিবাদে শিবির কর্মীরা শহরের প্রধান সড়কে ঝটিকা মিছিল বের করে। এ সময় ৩-৪ টি ককটেল বিস্ফোরিত হয় এবং মিছিলকারীরা ২টি গাড়ি ভাংচুর করে। এর বাইরে কুমিল্লা যশোর, বান্দরবান, ফেনীর ছাগলনাইয়া, পরশুরাম, ময়মনসিংহের ফুলবাড়িয়া, কক্সবাজারের টেকনাফ, নাটোরের সিংড়া, গাইবান্ধায় পলাশবাড়ীসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় কাদের মোল্লার ফাঁসির রায়ের প্রতিবাদে গতকাল ঝটিকা মিছিল বের করে জামায়াত শিবির।
