দিনাজপুরের সীমান্ত এলাকার শতকরা ৪০ ভাগ শিশু স্কুলে যাচ্ছে না। তাদের ব্যবহার করা হচ্ছে চোরাচালানের পণ্য বহনের মত ঝুঁকিপূর্ণ কাজে। জেলায় শিশুদের স্কুলে ধরে রাখার জন্য শিক্ষার বিনিময়ে খাদ্য প্রকল্প ও বিনামূল্যে বই বিতরণসহ নানা সরকারি কর্মসূচি রয়েছে। তারপরও কেন এ ঘটনা ঘটছে সেটাই এখন বড় প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে। বলা হয়েছে, মূল ব্যাপারটি আর্থিক। প্রত্যন্ত এলাকায় বাস করে প্রতিদিন নগদ অর্থ রোজগারের সামনে অন্য সব কিছুই সাধারণ বলে বিবেচিত হচ্ছে। শিক্ষা ও পুলিশ বিভাগও এ বিষয়টি সম্পর্কে যথেষ্ট তত্পর নয় বলে অভিযোগ রয়েছে।
জানা গেছে, হাকিমপুর উপজেলার হিলি, পাঁচবিবি উপজেলার বাগজানা, আটাপাড়া, চেঁচড়া, কড়িয়া, ভুটিয়াপাড়া, পাগলদেওয়ান, শালপাড়াসহ সীমান্ত এলাকার গ্রামগুলোর শিশুদের এই নিষিদ্ধ পেশায় টেনে নেয়ার জন্য একশ্রেণির অসাধু ব্যবসায়ী চক্র ও তাদের দালালরা নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছে। শিশুদের দ্বারা চোরাই পণ্য বহন অপেক্ষাকৃত নিরাপদ হওয়ায় অসাধু ব্যবসায়ীরা তাদের হাতে নগদ অর্থ তুলে দিয়ে এ ব্যবসায় উত্সাহ যোগাচ্ছে। সীমান্ত অঞ্চলের পথেঘাটে এসব শিশু চোরাচালানীদের ছোট ছোট চিনি, ডাল, লবণের বস্তা, মসলা এমনকি মদ, ফেন্সিডিলের মত নেশা জাতীয় দ্রব্যের পোটলাও বহন করতে দেখা যায়। এসব শিশু সীমান্ত পাড়ি দিয়ে ভারতের দক্ষিণপাড়া, উজান, হিলি, হাঁড়িপুকুর, পতিরামপুর, দিনাজপুর, বাংলাপুর ও শিওলাসহ বিভিন্ন বাজারে গিয়ে ভারতীয় পণ্য কেনে। তারপর জীবনের ঝুঁকি নিয়ে সীমান্ত পাড়ি দিয়ে বাংলাদেশের অভ্যন্তরে তাদের সরদারের নিকট পৌঁছে দেয়। এখানেই শেষ নয়, শরীরের বিভিন্ন স্থানে চোরাই মাল বেঁধে নিয়ে হিলি, বাগজানা ও পাঁচবিবি রেল স্টেশনে গিয়ে ট্রেনযোগে এসব মাল নওগাঁ, বগুড়া ও নাটোরসহ বাংলাদেশের বিভিন্ন শহরে পৌঁছেও দিচ্ছে তারা। শিশুদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, একশ্রেণির অসাধু রেল কর্মকর্তা তাদের কাছ থেকে নিয়মিত উেকাচ নেয়ার মাধ্যমে তাদের পণ্য পরিবহনে সহায়তা করে থাকে। চোরাই মাল বহনকারী শিশু মরিয়ম জানায়, দারিদ্র্যের কারণে লেখাপড়ার পরিবর্তে তার মা-বাবা এক ব্যবসায়ীর নিকট থেকে টাকা নিয়ে তাকে এ কাজে নামিয়ে দিয়েছে। এতে দৈনিক তার ৫০/৬০ টাকা লাভ হলেও মাঝে মাঝে চোরাই রুট নিয়ন্ত্রণকারী লাইনম্যানদের দ্বারা লাঞ্ছিত হতে হয়। অনেক সময় তল্লাশীর নামে তারা শরীরের স্পর্শকাতর স্থানেও হাত দেয়।
অনুসন্ধানে জানা যায়, সীমান্ত এলাকার প্রাইমারী স্কুলগুলোতে এলাকার ৫০ ভাগ শিশু লেখাপড়া শুরু করলেও প্রাইমারী শেষ হতে না হতেই তাদের অর্ধেক ঝরে যায়। হাকিমপুর উপজেলার অন্যান্য স্থানে প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকে ঝরে পড়া শিশুদের হার ১৪ ভাগ হলেও সীমান্ত এলাকায় এ হার ৪০ ভাগের কাছাকাছি। শিক্ষা বিভাগ, শিশু একাডেমী, জেলা তথ্য অফিসসহ বিভিন্ন শিশু-কিশোর সংগঠন এবং এনজিওগুলো সারাদেশের ন্যায় দিনাজপুরেও শিশু অধিকারের ব্যাপারে জনসচেতনতা বৃদ্ধির কর্মসূচি পালন করে। কিন্তু এসব কর্মসূচি পালন করা হয় জেলা শহরে। সম্প্রতি স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন ওয়ার্ল্ড ভিশন হাকিমপুর উপজেলার সীমান্ত এলাকায় শিশুদের উন্নয়নে কিছু কর্মসূচি চালু করেছে। এর মধ্যে রয়েছে ঝরে পড়া শিশুদের ভ্রাম্যমাণ লেখাপড়া, খেলাধুলার বিকাশ ও আর্থিক সহযোগিতা। এ ধরনের কর্মসূচি ব্যাপকভাবে শুরু হলে পরিস্থিতির উন্নতি হতে পারে বলে মনে করা হচ্ছে।
