নিয়োগপত্র পেয়েও কাজে যোগ দিতে পারলেন না হাওয়া বিবি

আপডেট : ১৮ সেপ্টেম্বর ২০১৩, ২২:২৯
প্রশিক্ষণ শেষ করে দীর্ঘদিন ধরে সরকারি চাকরির আশায় ছিলেন সিনিয়র স্টাফ নার্স বিবি হাওয়া (২৮)। নিয়োগপত্র হাতেও পেয়েছিলেন কিন্তু ভাগ্যের কি নির্মম পরিহাস কর্মস্থলে যোগদান করা হলো না বিবি হাওয়ার। নার্সিং সুপারের দুর্ব্যবহার সহ্য করতে না পেরে অবশেষে হাস-পাতালে চিকিত্সা-ধীন অবস্থায় মারা গেলেন তিনি। এ মৃত্যুর মধ্য দিয়ে শেষ হয়ে গেল বিবি হাওয়ার সব স্বপ্ন। নিয়োগপত্র হাতে পেয়ে খুশিতে আত্মহারা হয়েছিলেন। মনে করেছিলেন এবার সংসারের অভাব অনটন দূর হবে। সংসার নিয়ে তার কত না হিসাব নিকাশ। তার সব স্বপ্ন স্বপ্নই রয়ে গেলো। ময়মনসিংহ মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে কর্মস্থলে যোগদান করতে গেলে কর্তৃপক্ষ তাকে জানিয়ে দেয়, পদ খালি নেই। বলা হয়, আপনার আগে শূন্য পদে যোগদান হয়ে গেছে। আপনি গিয়ে সেবা পরিদফতরে দেখা করেন। শুধু এখানেই শেষ নয়। নার্সিং সুপার তার সাথে এমন দুর্ব্যবহার করেন, তিনি সেখানেই অসুস্থ হয়ে পড়েন। বহুল প্রত্যাশিত নিয়োগ-পত্র হাতে নিয়েই বিবি হাওয়া জ্ঞান হারিয়ে মাটিতে লুটিয়ে পড়েন। তাকে দ্রুত ময়মনসিংহ মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল ইনটেনসিভ কেয়ার ইউনিটে ভর্তি করা হয়। তবে তিনি আর নিয়োগের জন্য অপেক্ষা করতে পারলেন না। হাসপাতালে চিকিত্সাধীন অবস্থায়ই মারা গেলেন। গত ১১ সেপ্টেম্বর বিবি হাওয়া স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় কর্তৃক গঠিত নিয়োগ কমিটি থেকে নিয়োগপত্র নিয়ে ময়মনসিংহ মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে যোগদান করতে গিয়ে চরম দুর্ব্যবহারের শিকার হন। এ মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে নব সৃষ্টকৃত পদ ১১৮টি। সেখানে নিয়োগ দেয়া হয়েছে ১৬৫ জন সিনিয়র স্টাফ নার্সকে। অতিরিক্ত ৪৭ জন সিনিয়র নার্সও চাকরি না পেয়ে ঢাকায় ফিরে আসেন। ২০০১ সালে বিবি হাওয়া ও তার ছোট বোন মনোয়ারা বেগম ময়মনসিংহ মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল নার্সিং ইনস্টিটিউট থেকে পাস করেন। ১২ বছর বেকার থাকার পর বিবি হাওয়া সরকারি নিয়োগপত্র পেয়েছিলেন। তাও ময়মনসিংহ মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে। নিয়োগপত্র পেতে একটি দালাল চক্র বিবি হাওয়ার থেকে উেকাচ নিয়েছিলেন। এটা ছিল তার পছন্দের জায়গা। বিবি হাওয়ার এ করুণ মৃত্যুর খবর ছড়িয়ে পড়লে দেশব্যাপী নার্সদের মধ্যে ক্ষোভের সৃষ্টি হয়। সেবা পরিদফতরের দালাল চক্রের হোতা এক কর্মকর্তার নিকটতম এক ব্যক্তিসহ জড়িতদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা দাবি জানিয়েছে নার্সরা। সেবা পরিদফতর ও স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নির্দেশে নবসৃষ্টকৃত শূন্য পদে ৪ হাজার একশ’ জন সিনিয়র স্টাফ নার্সকে নিয়োগ দেয়ার প্রক্রিয়া শুরু করে। একটি মাধ্যমে নিয়োগ কমিটি এসব সিনিয়র স্টাফ নার্সকে নিয়োগপত্র দেয়। ৫ সেপ্টেম্বর থেকে নিয়োগপত্র পাওয়া নার্সরা কর্মস্থলে যোগদান করতে যান। সেখানে গিয়ে তারা দেখেন প্রতিটি হাসপাতালে সৃষ্ট পদসমূহের দ্বিগুণ নিয়োগ দেয়া হয়েছে। হাসপাতালের পদ সংখ্যা অনুযায়ী নির্ধারিত সংখ্যক নার্সকে নিয়োগপত্র দেয়ার কথা থাকলেও তা করা হয়নি। স্থানীয় কর্তৃপক্ষের কাছে অতিরিক্ত নিয়োগপ্রাপ্ত নার্সরা বলেছেন, সংশ্লিষ্ট হাসপাতালে কত সংখ্যক পদ রয়েছে তা নিয়োগ কমিটির কোন কর্মকর্তার দেখার বিষয় নয়। দালাল চক্রের তালিকা অনুযায়ী নিয়োগপত্র স্বাক্ষর করে নিয়োগ আদেশ জারি করা হয়েছে। দালালরা নার্সদের পছন্দের স্থানে প্রতিটি নিয়োগের জন্য ৫০ হাজার থেকে এক লাখ টাকা নিয়েছে। এ কারণে ঘুষ বাণিজ্যের তালিকায় নিয়োগপত্র দেয়া হয়েছে। স্থানীয় হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ জানান, সরকারি তালিকা অনুযায়ী নিয়োগ দিলে এ সমস্যা হতো না। অপরদিকে রাষ্ট্রপতির অধ্যাদেশে উল্লেখ রয়েছে তৃতীয় ও দ্বিতীয় শ্রেণি পদ মর্যাদায় নার্সকে নিয়োগপত্রে স্বাক্ষর করার কথা সেবা পরিদপ্তরের পরিচালকের। কিন্তু ৪১০০ জন নার্সের নিয়োগপত্রে স্বাক্ষর করেছে মন্ত্রণালয়ের উপসচিব, তা অধ্যাদেশের বহির্ভূত। সেবা পরিদপ্তরের সূত্রে জানা যায়, গতকাল পর্যন্ত প্রায় পাঁচশ নার্স কর্মস্থলে যোগদান করতে পারেননি। তারা প্রতিদিন সেবা পরিদফতরে এসে অন্য জায়গায় যোগদান করার আদেশের জন্য অপেক্ষা করছেন। অনেকের ঢাকায় থাকার জায়গা নেই। নিজেদের দুর্ভোগের কথা জানিয়ে অনেকে কান্নায় ভেঙ্গে পড়েন। নিয়োগপত্র পরিবর্তন করে অন্য হাসপাতালে শূন্য পদে নিয়োগপত্রের ব্যবস্থা করে দিবে এমন শর্তে দালাল চক্র ঐসব নার্সদের কাছে মোটা অঙ্কের টাকা দাবি করছে। দালাল চক্রের সঙ্গে সেবা দফতরের কতিপয় কর্মকর্তা জড়িত। অপর এক কর্মকর্তা বলেন, সরকারের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করার জন্য কতিপয় কর্মকর্তা ষড়যন্ত্র করে নার্সদের নিয়োগ নিয়ে হযবরল অবস্থা সৃষ্টি করেছে। সেবা পরিদফতরের ভারপ্রাপ্ত পরিচালক তাসলিমা বেগম বলেন, ফেরত আসা নার্সদের শূন্যপদে নিয়োগ দেয়ার প্রস্তুতি চলছে। উেকাচ নিয়ে নিয়োগপত্র দেয়ায় এ পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছে প্রশ্নের জবাবে তিনি কিছু জানেন না বলে জানান। অধ্যাদেশের বাইরে নিয়োগপত্রে স্বাক্ষর সম্পর্কে তিনি কোন মতামত দিতে অস্বীকৃতি জানান।