দলীয়ভাবে প্রভাবিত হওয়ার সুযোগ থাকছে
চেইন অব কমান্ড নিয়ে শংকিত সংশ্লিষ্টরা
আগামী দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচন নিয়ে নানামুখী শঙ্কার উদ্ভব হয়েছে। নির্বাচন কবে হবে, দলীয় নাকি তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীন— এ সংক্রান্ত অসংখ্য প্রশ্ন রয়েছে জনমনে। তবে এসবের পরও সবচেয়ে বেশি যে প্রশ্নটি ঘুরপাক খাচ্ছে তা হলো আগামী নির্বাচনে আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ নিয়ে। রাজনৈতিক অনৈক্য যেখানে বিরাট সেখানে নির্বাচনে সুষ্ঠুভাবে দায়িত্ব পালন হবে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর জন্য কঠিন চ্যালেঞ্জ। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখা বেশ কঠিন হবে। বিদ্যমান আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যদের দলীয়ভাবে প্রভাবিত হওয়ার যথেষ্ট সুযোগ রয়েছে। দৈনন্দিন কাজের বাইরে গিয়ে নির্বাচনের দিন আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর পক্ষে তৃণমূলে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের সামর্থ্য নিয়েও সন্দেহ আছে।
ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল, বাংলাদেশের (টিআইবি) নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান ইত্তেফাককে বলেন, একদিনে ৩০০ আসনে ভোট হলে বিদ্যমান আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর পক্ষে নির্বাচন পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ কঠিন হবে। কারণ দিন দিন জনসংখ্যা, ভোটার, ভোটকেন্দ্র ও ভোটকক্ষ বাড়লে তেমনভাবে বাড়েনি আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্য। পাশাপাশি বিদ্যমান আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীসহ অন্যান্য প্রতিষ্ঠানগুলো দলীয় দৃষ্টিকোণের বাইরে দায়িত্ব পালন করতে পারবে কি-না তা যথেষ্ট সন্দেহ রয়েছে।
সর্বশেষ গত ২০০৮ সালের ২৯ ডিসেম্বর অনুষ্ঠিত নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর সংজ্ঞায় সেনাবাহিনী অর্ন্তভুক্ত ছিল; কিন্তু বর্তমান সরকার ২০০৯ সালে গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ (আরপিও) সংশোধন করে সেনাবাহিনীকে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর সংজ্ঞা থেকে বাদ দেয়া হয়। সর্বশেষ গত সোমবার মন্ত্রিসভার বৈঠকে সংশোধিত আরপিওতে আইন-শৃঙ্খলার সংজ্ঞায় সেনাবাহিনীকে রাখা হয়নি। ফলে আগামী নির্বাচনে প্রত্যক্ষভাবে আইন-শৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণের দায়িত্বে থাকছে পুলিশ, আর্মড পুলিশ, ব্যাটালিয়ন, র্যাব, আনসার, বিজিবি ও কোস্টগার্ড। তবে সংবিধানের ১২৬ অনুচ্ছেদ অনুসারে নির্বাচন কমিশনের দায়িত্ব পালনে সহায়তা করা সকল নির্বাহী কর্তৃপক্ষের কর্তব্য হবে। ফৌজদারি কার্যবিধির ১২৮, ১২৯ ও ১৩০ ধারা অনুযায়ী সংসদসহ সব ধরনের স্থানীয় নির্বাচনে সশস্ত্র বাহিনী মোতায়েন করা সম্ভব। ফৌজদারি কার্যবিধির ১২৮, ১২৯ ও ১৩০ ধারায় বলা আছে, কোথাও কোনো বেআইনি সমাবেশ হলে বা জন-শৃঙ্খলা নষ্ট হলে দায়িত্বপ্রাপ্ত ম্যাজিস্ট্রেট অথবা পুলিশ বাহিনী তা ছত্রভঙ্গ করে দেবে। পুলিশ বাহিনী ব্যর্থ হলে জেলা ম্যাজিস্ট্রেট সমাবেশ ছত্রভঙ্গ করার জন্য সশস্ত্র বাহিনীর পুরুষ কর্মকর্তাদের সহযোগিতা কামনা করতে পারবেন। তারপরও ছত্রভঙ্গ করা না গেলে জেলা ম্যাজিস্ট্রেট অথবা মেট্রোপলিটন পুলিশ কমিশনার সামরিক শক্তি প্রয়োগ করে তা ছত্রভঙ্গ করতে পারবেন।
পুলিশের মহাপরিদর্শক হাসান মাহমুদ খন্দকার ইত্তেফাককে বলেছেন, সব ধরনের চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করেই সঠিক দায়িত্ব পালন করে আসছে পুলিশ। ভবিষ্যতে যত চ্যালেঞ্জই আসুক পুলিশ আইনের মধ্যে থেকে দায়িত্ব পালন করবে।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, কমিশন থেকে সাংবিধানিক ক্ষমতা বলে সশস্ত্র বাহিনী মোতায়েনের দাবি জানানো হলে সরকার তাতে সাড়া নাও দিতে পারে। এর অংশ হিসেবে ২০১১ সালের ৩০ অক্টোবর অনুষ্ঠিত নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশন নির্বাচনে এটিএম শামসুল হুদার নেতৃত্বাধীন কমিশন সেনা মোতায়েনের দাবি জানিয়েছিল। এ বিষয়ে কমিশন থেকে দুইটি চিঠি দেয়া হলে সরকারের পক্ষ থেকে সে চিঠির জবাব দেয়া হয়নি। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ফৌজদারি কার্যবিধির আওতায় বড় ধরনের কোনো দাঙ্গা-হাঙ্গামা না ঘটলে নির্বাচনে সশস্ত্র বাহিনী (সেনা, নৌ ও বিমান) মোতায়েনের সুযোগ নেই। ইসির একজন কর্মকর্তা ইত্তেফাককে বলেন, দেশব্যাপী একই দিনে নির্বাচন অনুষ্ঠানের কারণে ছয় লাখেরও বেশি আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যের প্রয়োজন দেখা দেয়। সেখানে সেনাবাহিনী বাদ দিয়ে এত সংখ্যক সদস্য মোতায়েন সম্ভব নয়। ফলে বিদ্যমান আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর জন্য আগামী নির্বাচনে সুষ্ঠুভাবে দায়িত্ব পালন অত্যন্ত কঠিন হয়ে পড়বে।
ভোটে প্রাণ গেলে ক্ষতিপূরণ
আগামী দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে প্রাণহানিরও আশঙ্কা করেছে নির্বাচন কমিশন। নির্বাচনের সময় দায়িত্ব পালনকালে কেউ নিহত হলে তার পরিবার ৫ লাখ টাকা পাবে। গুরুতর আহতরা পাবেন দুই লাখ আর আহতরা পাবেন এক লাখ টাকা। আগামী জাতীয় সংসদসহ সব পর্যায়ের নির্বাচনে নির্বাচনী কর্মকর্তা-কর্মচারী ও আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যদের দায়িত্ব পালনে উত্সাহিত করতে এই ক্ষতিপূরণ দেয়ার সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে।
নির্বাচন কমিশনার মো. শাহ নেওয়াজ ইত্তেফাককে বলেন, ‘ক্ষতিপূরণ সংক্রান্ত প্রস্তাবের বিষয়ে কমিশন সভায় অনুমোদন করা হয়েছে। নির্বাচনী দায়িত্ব পালন করা যে কারোর জন্য ঝুঁকি থাকে বেশি। এজন্য নির্বাচনী কাজের সঙ্গে সংশ্লিষ্টরা যাতে উত্সাহিত হয়ে যথাযথ ভাবে দায়িত্ব পালন করেন এ জন্য কিছু অর্থ সুনির্দিষ্ট করে রাখার উদ্যোগ নেয়া হয়েছে।’
ভোটার ও আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী
গত সংসদ নির্বাচনের তুলনায় আগামী সংসদ নির্বাচনে ভোটার বেড়েছে ১ কোটি ১১ লাখ ১১ হাজার ২৬ জন। ভোট কেন্দ্র বাড়ছে ৮ হাজার ৭৫৮টি ও ভোট কক্ষ বাড়ছে ৪৪ হাজার ১০৭টি। দশম সংসদ নির্বাচনে মোট ভোটার সংখ্যা ৯ কোটি ২১ লাখ ৯৮ হাজার ২৯ জন। দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে সম্ভাব্য ভোট কেন্দ্রের সংখ্যা ৪৪ হাজার ২১টি ও ভোট কক্ষের সংখ্যা ২ লাখ ২১ হাজার ৩৮৪টি। আর নবম সংসদ নির্বাচনে ভোট কেন্দ্র ছিল ৩৫ হাজার ২৬৩টি ও ভোট কক্ষ ১ লাখ ৭৭ হাজার ২৭৭টি। সেই হিসেবে গত পাঁচ বছরে পুলিশ বেড়েছে ৩০ হাজারের মতো। বর্তমানে পুলিশের সদস্য দেড় লাখের কিছু কম। তার মধ্যে এক লাখ ৬ হাজারই কনস্টেবল। আর বিজিবি সদস্য কমেছে ৯ হাজারের মতো। র্যাব ও আনসার আগে যা ছিল তাই আছে। বরং অনেকে অবসরে চলে যাওয়ায় বেশ কিছু সদস্য কমে গেছে। গত নির্বাচনের আগে বিজিবি ছিল ৫৩ হাজারের মতো। আর এখন দাঁড়িয়েছে ৪৪ হাজারে। ফলে নির্বাচনের সময় বিদ্যমান আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী দিয়ে সঠিকভাবে দায়িত্ব পালন আরো কঠিন হয়ে পড়বে বলে মনে করেন সংশ্লিষ্টরা। এসব কারণে আগামী নির্বাচনে আইন-শৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণ নিয়ে ইতিমধ্যে সংশয় দেখা দিয়েছে।
আইন-শৃঙ্খলা নিয়ে ইসির পরিকল্পনা
নির্বাচন পরিস্থিতি যে বেশ জটিল হবে তা আঁচ করতে পেরেছে স্বয়ং নির্বাচন কমিশন। এজন্য আগামী নির্বাচনের আগে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যদের সঙ্গে কয়েকদফা বৈঠকের পরিকল্পনা করা হয়েছে। এর মধ্যে নির্বাচনে তফসিল ঘোষণার ২০ দিন আগে সুষ্ঠু, অবাধ, নিরপেক্ষ ও শান্তিপূর্ণ নির্বাচন অনুষ্ঠানের জন্য আইন-শৃঙ্খলা বিষয়ক প্রাথমিক পরিকল্পনা কমিশনে উত্থাপন, তফসিল ঘোষণার ১০ দিন আগে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী সংস্থার কাছ থেকে প্রয়োজনীয় সহযোগিতা নিরূপণ, তফসিল ঘোষণার সঙ্গে সঙ্গে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, গোয়েন্দা সংস্থার প্রধান ও বিভিন্ন আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী সংস্থাসমূহের প্রধানদের সঙ্গে বৈঠক, নির্বাচনে প্রার্থিতা প্রত্যাহারের ২ দিন পর স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, গোয়েন্দা সংস্থার প্রধান ও বিভিন্ন আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী সংস্থাসমূহের প্রধান, রিটার্নিং অফিসার, বিভাগীয় কমিশনার, পুলিশ সুপারসহ মাঠ পর্যায়ের কর্মকর্তাদের সঙ্গে আইন-শৃঙ্খলা সংক্রান্ত বৈঠক, ভোট গ্রহণের ১৫ দিন আগে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী মোতায়েন, সার্বিক নিরাপত্তা পরিকল্পনা ইত্যাদি বিষয় সম্বলিত পরিপত্র নির্বাচন কমিশন কর্তৃক ভেটিং এরপর স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় কর্তৃক জারি এবং ভোট গ্রহণের ১ বা ২ দিন আগে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী সংশ্লিষ্টদের প্রশিক্ষণ ও ব্রিফিং।
