সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের রায়ের পর জামায়াত নেতা আব্দুল কাদের মোল্লার ফাঁসি কার্যকরের প্রস্তুতি নিচ্ছে সরকার। সরকার মনে করে, আপিল বিভাগের রায়ের বিরুদ্ধে রিভিউর কোন সুযোগ নেই। এমনকি পূর্ণাঙ্গ রায়ের জন্য অপেক্ষার প্রয়োজন পড়বে না। সংক্ষিপ্ত আদেশের সার্টিফায়েড কপির ভিত্তিতেই কারা কর্তৃপক্ষ ফাঁসির কার্যক্রম শুরু করতে পারবে। তবে এক্ষেত্রে রাষ্ট্রপতির কাছে প্রাণভিক্ষার আবেদনের জন্য সাতদিন সময় পাবেন কাদের মোল্লা। অন্যদিকে কাদের মোল্লার পক্ষ থেকে সংক্ষিপ্ত আদেশের সার্টিফায়েড কপির জন্য দরখাস্ত করা হয়েছে। সার্টিফায়েড কপি হাতে পাওয়ার পর রিভিউ পিটিশন দাখিল করা হবে এই আবেদন জানিয়ে আপিল বিভাগের চেম্বার জজের আদালতে ফাঁসি কার্যকরের কার্যক্রম স্থগিত রাখতে বলা হবে।
প্রচলিত আইনে ফৌজদারি কার্যবিধি ও জেল কোডের বিধান অনুযায়ী ফাঁসি কার্যকর করা হয়। জেল কোডের বিধান অনুযায়ী মৃত্যুদণ্ডের রায়ের কপি পাওয়ার পর রাষ্ট্রপতির কাছে প্রাণভিক্ষার জন্য আসামিকে সাতদিনের সময় দেয়া হয়। এই সাতদিন সময় অতিবাহিত হওয়ার পর রাষ্ট্রপতি যদি ফাঁসি কার্যকরের ওপর স্থগিতাদেশ বা দণ্ড মওকুফ বা হ্রাস না করেন তাহলে কারা কর্তৃপক্ষকে ২১ থেকে ২৮ দিনের মধ্যে ফাঁসি কার্যকর করতে হয়। কিন্তু প্রচলিত ফৌজদারি আইন ও জেল কোডের বিধান যুদ্ধাপরাধের দণ্ড কার্যকর করার ক্ষেত্রে প্রযোজ্য হবে না। কেন না আন্তর্জাতিক অপরাধসূমহ ট্রাইব্যুনালস (আইন) ১৯৭৩ একটি বিশেষ আইন। প্রয়োগের ক্ষেত্রে সাধারণ আইনের চেয়ে বিশেষ আইন প্রাধান্য পাবে। ওই আইনের ২০ (৩) ধারায় বলা আছে, ‘এই আইনের অধীন প্রদত্ত দণ্ড কার্যকর হইবে সরকারের আদেশাবলী অনুযায়ী।’ অর্থাত্ রাষ্ট্রপতি প্রাণভিক্ষার আবেদন যেদিনই নাকচ করবেন সেদিন থেকে যে কোন দিন মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হবে। কিন্তু কাদের মোল্লার ফাঁসি কার্যকর করার ক্ষেত্রে একটি মৌলিক প্রশ্ন উত্থাপিত হয়েছে। আসামি পক্ষ থেকে দাবি করা হচ্ছে, সংবিধানের ১০৫ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী রিভিউ পিটিশন দাখিলের সুযোগ কাদের মোল্লার রয়েছে।
প্রসঙ্গত সংবিধানের ১০৫ অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, “সংসদের যে কোন আইনের বিধি-বিধানাবলী সাপেক্ষে এবং আপিল বিভাগ কর্তৃক প্রণীত যে কোন বিধি- সাপেক্ষে আপিল বিভাগের কোন ঘোষিত রায় বা প্রদত্ত আদেশ পুনর্বিবেচনার ক্ষমতা উক্ত বিভাগের থাকিবে”।
১৯৮৮ সালে প্রণীত আপিল বিভাগের বিধিমালার ৬ষ্ঠ অধ্যায়ে রিভিউ পিটিশন দাখিলের জন্য ৩০ দিনের সময়ের কথা বলা আছে। এ প্রসঙ্গে আসামি পক্ষের আইনজীবী ব্যারিস্টার রাজ্জাক বলেন, রিভিউ করা কাদের মোল্লার সাংবিধানিক অধিকার। এই সুপ্রিম কোর্টও সৃষ্টি হয়েছে সংবিধানের দ্বারা। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল আইনে এই সুপ্রিম কোর্ট সৃষ্টি হয়নি। আসামি পক্ষের আইনজীবীরা মনে করেন, রায়ের কপি হাতে পাওয়ার ৩০ দিনের মধ্যে রিভিউ পিটিশন দাখিলের সাংবিধানিক অধিকার তাদের রয়েছে।
অন্যদিকে আইনমন্ত্রীসহ সরকারের আইন কর্মকর্তারা মনে করেন, যুদ্ধাপরাধীদের ক্ষেত্রে সংবিধানের ১০৫ অনুচ্ছেদ প্রযোজ্য হবে না। সংবিধানের ৪৭ক(১)(২) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী আসামির রিভিউ আবেদন দাখিলের সুযোগ নেই। ওই অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, “যে ব্যক্তির ক্ষেত্রে এই সংবিধানের ৪৭ অনুচ্ছেদের (৩) দফায় বর্ণিত কোন আইন প্রযোজ্য হয়, সেই ব্যক্তির ক্ষেত্রে এই সংবিধানের ৩১ অনুচ্ছেদ, ৩৫ অনুচ্ছেদের (১) ও (৩) দফা এবং ৪৪ অনুচ্ছেদের অধীন নিশ্চয়কৃত অধিকারসূমহ প্রযোজ্য হইবে না। ” (২) “এই সংবিধানে যাহা বলা হইয়াছে, তাহা সত্ত্বেও যে ব্যক্তির ক্ষেত্রে এই সংবিধানের ৪৭ অনুচ্ছেদের (৩) দফায় বর্ণিত কোন আইন প্রযোজ্য হয় , এই সংবিধানের অধীন কোন প্রতিকারের জন্য সুপ্রিম কোর্টে আবেদন করিবার কোন অধিকার সেই ব্যক্তির থাকিবে না।” এ প্রসঙ্গে অতিরিক্ত এটর্নি জেনারেল এডভোকেট এমকে রহমান বলেন, কাদের মোল্লার ক্ষেত্রে সংবিধানের ৪৭ (৩) অনুচ্ছেদ প্রযোজ্য হয়েছে। সেক্ষেত্রে সংবিধানে যা কিছুই থাকুক না কেন রিভিউ করার অধিকার তার নেই। তিনি মনে করেন, ফাঁসি কার্যকরের কার্যক্রম শুরু করতে আপিল বিভাগের পূর্ণাঙ্গ রায়ের প্রয়োজন নেই কারা কর্তৃপক্ষের। সংক্ষিপ্ত আদেশ যেটি গত মঙ্গলবার ঘোষিত হয়েছে তার সার্টিফায়েড কপির ভিত্তিতে ফাঁসির কার্যক্রম শুরু করা যাবে। তবে রিভিউর প্রশ্নে সরকারের আইন কর্মকর্তাদের মধ্যে দ্বিধাবিভক্ত রয়েছে। কিন্তু আইনমন্ত্রী ও এটর্নি জেনারেল মনে করেন কাদের মোল্লার রিভিউর কোন সুযোগ নেই। ইতিমধ্যে বিষয়টি তারা সরকারের উচ্চ মহলকে জানিয়েছেন। সংশ্লিষ্টদের ফাঁসি কার্যকরের প্রস্তুতিও নিতে বলেছেন।
অন্যদিকে আসামি পক্ষের আইনজীবীরা মনে করেন রিভিউর সুযোগ না দিয়ে ফাঁসি কার্যকর করা হলে তা হবে একটি জুডিশিয়াল কিলিং। তারা বলেন, এই প্রথম কোন আদালত আসামিকে মৃত্যুদণ্ড দিলো। মানবিক আইনের বিজ্ঞান ও দর্শন (জুরিসপ্রুডেন্স) হচ্ছে মৃত্যুদণ্ডের রায় একটি আদালতের মাধ্যমে নিষ্পত্তি করা যায় না। সংবিধানেও আসামির রিভিউর সুযোগ রয়েছে। সংক্ষিপ্ত আদেশ দিয়েও কারো ফাঁসি কার্যকর করা যায় না। আসামিকে রায়ের কপি দিতে হয়। এমনকি প্রাণভিক্ষার আবেদন বিবেচনার ক্ষেত্রে রাষ্ট্রপতির সামনে রায়ের পূর্ণাঙ্গ কপি থাকতে হয়, নতুবা রাষ্ট্রপতি কিসের বিবেচনায় সিদ্ধান্ত দিবেন।
আইন বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, রিভিউ নিয়ে যে বিতর্ক উঠেছে তা আমাদের দেশে সম্পূর্ণ নতুন একটি ঘটনা। ফলে এর একটি আইনগত মীমাংসা প্রয়োজন। বিষয়টি আদালতের মাধ্যমে নিষ্পত্তি হতে পারে। আপিল বিভাগের সংক্ষিপ্ত আদেশের সার্টিফায়েড কপি পাওয়ার পর আসামি পক্ষ রায়ের কার্যক্রম স্থগিত রাখার আবেদন জানাবে। ওই আবেদনে তারা বলবে যে, তারা পূর্ণাঙ্গ রায়ের কপি পাওয়ার পর ৩০ দিনের মধ্যে রিভিউ পিটিশন দাখিল করবে। সেহেতু আপিল বিভাগের মৃত্যুদণ্ডের কার্যকারিতা স্থগিত রাখা হোক। ইতিমধ্যে আসামি পক্ষ থেকে সংক্ষিপ্ত আদেশের সার্টিফায়েড কপির জন্য দরখাস্ত করা হয়েছে। দিন কয়েকের মধ্যেই সার্টিফায়েড কপি হয়ত পাওয়া যাবে। ফলে বিষয়টি আপিল বিভাগের নজরে আসবে। এ নিয়ে সরকার ও আসামি পক্ষের শুনানি বিতর্কের পর রিভিউর সুযোগ আছে কি নেই এবং সংবিধানের সংশ্লিষ্ট অনুচ্ছেদের ব্যাখ্যা সম্পর্কে সর্বোচ্চ আদালতের নির্দেশনা পাওয়া যাবে। ফলে আইনগতভাবেই মীমাংসার সুযোগ রয়েছে।
