ইসলাম ধর্মে বিশ্বাসী মুসলমানদের মহামিলন মেলা হলো পবিত্র হজ্ব্ব। মুলমানদের কেবলা পবিত্র কাবাঘর তাওয়াফের উদ্দেশে বিশ্বের মুসলমানরা একত্রিত হয় পৃথিবীর কেন্দ্রবিন্দু মক্কায়। কুরবানির ঈদ বা ঈদুল আজহার সাথে জড়িয়ে আছে পবিত্র হজ্ব্ব। হজ্বের একটি পর্ব কুরবানি। ইসলামের বেশ কিছু ঐতিহাসিক ঘটনা হজ্বের সাথে মিলেমিশে একাকার। হজ্বের মূল উদ্দেশ্য হলো আনুগত্যের মাধ্যমে আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন ও সদাসর্বদা মনে প্রাণে আল্লাহর হুকুম পালনে নিজেকে তৈরী রাখা। হজ্ব্ব ইসলামের অন্যতম স্তম্ভ ও সমষ্টিগত ইবাদাত। আল্লাহ প্রেমিক বিশ্বজনগোষ্ঠির মহামিলন মেলা। ইসলাম চায় তার অনুসারীরা যাতে এই বৃহত্ সম্মেলন থেকে সরাসরি উপকৃত হয়। ইসলাম হজ্বের মাধ্যমে এমন একটি বিধান দিয়েছে যার ফলে প্রাচ্যের মানুষ বলুন আর পাশ্চাত্যের মানুষই বলুন সবাই একত্রিত হতে পারে এবং পরস্পরের সাথে পরিচিত ও বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক সৃষ্টি করতে পারে। মানবজাতিকে বর্ণ-গোত্র ও বৈষম্যের উর্ধে ওঠার শিক্ষা দেয় হজ্ব্ব। সামর্থবান মুসলমান মাত্রই হজ্ব্ব করার অধিকার রাখে। এখানে এমন কোনো বিধান নেই যে নিম্নবর্ণের মানুষ হজ্ব্ব করতে পারবে না। এমন কোনো বিধান নেই যে কৃষ্ণাঙ্গরা হজ্ব্ব করতে পারবে না। এমন কোনো বিধান নেই যে এ বংশ বা ঐ জাতির মানুষেরা হজ্ব্ব করতে পারবে না। বিধানটা হলো সচ্ছল মুসলমান মাত্রই সৌদি আরবে অবস্থিত বিশ্বের মধ্যবিন্দু মক্কায় যেয়ে হজ্ব্ব করার অধিকার রাখে। প্রতি বছর হজ্ব্ব মৌসুমে পৃথিবীর সকল প্রান্ত থেকেই বিভিন্ন শ্রেণী-জাতি-বংশ-গোত্র এবং বর্ণের মানুষ ব্যাপক আগ্রহ-উদ্দীপনা নিয়ে, আধ্যাত্মিক বোধ নিয়ে, প্রেমিক সুলভ মন নিয়ে কাবার পথে পাড়ি জমায়। বিশ্বের ঈমানদার মুসলমান সকল প্রকার ভেদাভেদ ভুলে গিয়ে কাবাকে কেবলা করে একই কাতারে সামিল হয়। তাদের সবার মুখে অভিন্ন ধ্বনি.. লাব্বাইক... আল্লাহুম্মা লাব্বাইক। তাদের সবার দেহে একই ধরনের পোশাক। একই সময়, একই স্থানে তাদের সমাবেশ। কী চমত্কার এক বিধান! পোশাকের মাধ্যমে ভুলিয়ে দেয়া হয় বর্ণ আর মর্যাদাগত তারতম্য। মুসলমান মাত্রই সমান-এই বোধটি জাগিয়ে দেয়া হয়। পোশাকের মাধ্যমে স্মরণ করে দেয়া হয় পার্থিব এই জগতের অর্থহীনতার কথা। স্মরণ করিয়ে দেয়া হয় পরকালের কথা। যে জীবনে যাবার মহান পোশাক হলো হজ্বের পোশাক। যেই পোশাক পৃথিবীর সকল মুসলমানের জন্যে এক ও অভিন্ন। স্মরণ করিয়ে দেয়া হয়-এটা সেই জগতে যাবার পোশাক, যে জগতে রাজা-প্রজার মাঝে কোনো ভেদাভেদ নেই। কেবল ভেদাভেদ আছে আমলের। যে-ই নেক আমল করবে, সে-ই মর্যাদাবান হবে। হজ্ব্ব সেই কথাটি স্মরণ করিয়ে দিয়ে বলতে চায়, পরকালকে মনে রেখেই সকল কাজ করতে হবে। ভুলে যেতে হবে অর্থ-বিত্ত ও আভিজাত্যের সকল অহংকার। আল কুরআনের সূরা আল-ইমরানের ১০৫ নম্বর আয়াতে বলা হয়েছে মুসলমানদের কাছে আল্লাহর সুস্পষ্ট আয়াত আসার পর যেন তারা বিচ্ছিন্ন না হয়ে যায়। পবিত্র কুরআন মুসলমানদের কাছে প্রত্যাশা করে যে, তারা যেন আল্লাহর রজ্জুকে দৃঢ়তার সাথে আঁকড়ে রাখে, কোনোভাবেই যেন পরস্পরে বিচ্ছিন্ন না হয়ে যায়। বিদায় হজ্বে মহানবী হযরত মুহাম্মদ (স.) গুরুত্বপূর্ণ ঐশী নীতি বা বার্তাগুলো জনগণের কাছে পৌঁছে দিতেন। ঐশী এই দায়িত্ব পালন করতে গিয়েই তিনি তাঁর অবর্তমানে মুসলমানরা যাতে নিজেদের ভেতরে কোনোরকম বিভক্তির সৃষ্টি না করে, সেজন্যে তাঁর স্থলাভিষিক্ত নিয়োগ করে যান।
