ক্রিকেট খেলা নিয়ে মতবিরোধে বন্ধুর হাতে খুন হয় প্রিন্স

আপডেট : ১৯ সেপ্টেম্বর ২০১৩, ২০:৪৯
সামান্য ক্রিকেট খেলা নিয়ে মতবিরোধে সৃষ্ট রোষে বন্ধুর হাতে প্রাণ যায় স্কুল ছাত্র সাদনাম সাকিব প্রিন্সের। গত ১ সেপ্টেম্বর পিরোজপুরে জেলা প্রশাসকের বাসভবনের অদূরে রায়পুকুরে হাত-পা বাঁধা প্রিন্সের (১৫) লাশ ভেসে ওঠার পর থেকে যে প্রশ্ন এ হত্যা নিয়ে দেখা দেয়, তার অবসান হয়েছে। প্রতিবেশী ও সাবেক সহপাঠী নাফিদ হাসান নাহিদ (১৫) ১৭ সেপ্টেম্বর আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দিতে বন্ধু হত্যা ও লাশ গায়েব চেষ্টার লোমহর্ষক বর্ণনা দিয়েছে। আর এ খুনের ঘটনার সহযোগী হচ্ছে নাহিদের বড় ভাই নাজমুল হাসান নাইম (১৯)। গত মঙ্গলবার রাতে পিরোজপুর থানায় এক প্রেস-ব্রিফিংয়ে পুলিশ সুপার এস এম আক্তারুজ্জামান এ সমস্ত তথ্য সাংবাদিকদের কাছে তুলে ধরেন। শহরের আদর্শ পাড়ার জাকির হোসেন লিটন সরদারের ছেলে প্রিন্স গত ২৯ আগস্ট সকালে বাসা থেকে বের হয়ে নিখোঁজ হয়। এর দুদিন পর সিআইপাড়া সড়কের পাশে রায়পুকুরে ভেসে ওঠে প্রিন্সের লাশ। পুলিশ লাশ উদ্ধার করে থানায় নিয়ে আসে। প্রিন্সকে হত্যার পর হাত-পায়ে ইট ও ভারি কাঠের ফ্রেম বেঁধে লাশ পুকুরে ডুবিয়ে দেয়া হয়। শুরু থেকেই পুলিশের ধারণা ছিল রায়পুকুর পাড়ে কোন একটি বাড়িতে ২৯ আগস্ট রাতে প্রিন্সকে হত্যা করা হয়। এ ঘটনায় জিজ্ঞাসাবাদের জন্য ঐদিনই নাহিদসহ পাঁচ কিশোরকে পুলিশ আটক করে। নাহিদ পিরোজপুর সরকারি বালক উচ্চ বিদ্যালয় এবং প্রিন্স পিরোজপুর সরকারি টেকনিক্যাল স্কুল ও কলেজের দশম শ্রেণীর ছাত্র। উভয়ই একই আদর্শপাড়ার বাসিন্দা ও শৈশব থেকে বন্ধু। পাঁচ দিনের রিমান্ডে এনে দুই দিনের জিজ্ঞাসাবাদে গত মঙ্গলবার হত্যা মামলার মূল আসামি নাফিদ হাসান নাহিদ পিরোজপুরের সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আহসান হাবিবের আদালতে হত্যাকাণ্ড ও লাশ গায়েব করার ঘটনার স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি প্রদান করে। নাহিদের জবানবন্দি থেকে জানা যায়, ঘটনার দিন প্রিন্স একটি ক্রিকেট খেলার আয়োজন নিয়ে নাহিদের বাসায় যায় এবং নাহিদকে প্রিন্সের টিমের পক্ষে খেলার কথা বলে। কিন্তু নাহিদ খেলতে অপারগতা জানালে প্রিন্স তাকে বকাঝকা করে। এক পর্যায়ে প্রিন্সকে নাহিদ ঘুষি দিলে সে পড়ে গিয়ে মাথায় আঘাত পায়। এ সময় নাহিদের বাবা স্কুল শিক্ষক সফিকুল আলম ও নাসিমা বেগম ঢাকায় ছিলেন। তবে এ সময় বাসায় থাকা তাদের বড় ছেলে নাঈম এসে দেখতে পায় প্রিন্স অজ্ঞান হয়ে গেছে এবং নাড়ি ধরে মৃত্যুর বিষয় নিশ্চিত হয়। এরপর দুই ভাই মিলে লাশ গায়েব করার নানা কৌশল আঁটে। নাহিদরা স্থানীয় সরকারি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের জনৈকা অবসর প্রাপ্ত প্রধান শিক্ষিকার ভাড়াটে ছিল। ওই বাড়ির পুরোনো ইট, দরজার পরিত্যক্ত কাঠের ফ্রেম, নাইলনের দড়ি ও ঘরে থাকা পুরোনো জামা, গামছা ইত্যাদি দিয়ে নিহত প্রিন্সের শরীর বেঁধে ও ভার সৃষ্টি করে রাত ১০টার দিকে ঘরের পেছন দিক দিয়ে লাশ নিয়ে রায়পুকুরে ডুবিয়ে দেয়া হয়। এর আগে দীর্ঘ ১২ ঘন্টা ধরে লাশ ওই ঘরেই ছিল। এ সময় দুই ভাইকে যাতে নিহত প্রিন্সের অভিভাবকরা সন্দেহ না করে সে জন্য সেই বাসায় গিয়ে তারা নানা বিভ্রান্তিমূলক কথা বলে, মিথ্যা গল্প শোনায়। এমনকি মাইকে নিখোঁজ সংবাদ প্রচারেরও পরামর্শ দেয়। সদর সার্কেলের এএসপি এনএম মোর্শেদের তত্ত্বাবধানে সদর থানায় ওসি আব্দুর রাজ্জাক মোল্লা, ওসি (তদন্ত) আব্দুল মালেক ও আইও মনিরুজ্জামান এ হত্যা মামলার তদন্ত করেন। এ ঘটনায় নাহিদ ও নাঈম দুই ভাইকে আসামি করা হচ্ছে। নাহিদকে গ্রেফতার করা গেলেও নাঈম পলাতক। প্রেস-ব্রিফিং কালে পুলিশ কর্মকর্তারা ছাড়াও নিহত প্রিন্সের বাবা-মা উপস্থিত ছিলেন। তার মা ডালিয়া সুলতানা সোমা এ সময় তাদের একমাত্র সন্তান হত্যাকারীদের কঠোর শাস্তির দাবি জানিয়ে কান্নায় ভেঙ্গে পড়েন।