তারুণ্যের অদম্য স্পৃহায় দেশ পেল বাংলা সার্চ ইঞ্জিন

আপডেট : ১৯ সেপ্টেম্বর ২০১৩, ২২:৪৩
তারুণ্যের অদম্য ইচ্ছা আর প্রাণশক্তি বিশ্বকে নানা অভিনব উদ্ভাবনে উদ্ভাসিত করেছে। আমাদের দেশেও তরুণদের হাত ধরে এমন অনেক কিছুই সম্ভব হয়েছে, যা অনেকের প্রত্যা-শাকে ছাড়িয়ে গিয়েছে। আজকের এই তথ্যপ্রযুক্তির যুগে তারুণ্যের হাত ধরেই আসছে নতুন নতুন সব উদ্ভাবন। সারাবিশ্ব যেখানে প্রযুক্তিকে হাতিয়ার করে এগিয়ে যাচ্ছে, তখন বসে নেই আমাদের দেশের তরুণরাও। ইতিমধ্যেই আউটসোর্সিং, ফ্রিল্যান্সিং, প্রোগ্রামিং কিংবা মোবাইল অ্যাপ্লিকেশন ডেভেলপমেন্টে তারা নিজেদের দক্ষতার প্রমাণ দিয়েছে বিশ্বের কাছে। মূল ধারার ইন্টারনেটে নিজেদের অবস্থানকে সুসংহত করতেও তারা পিছিয়ে নেই। দেশের প্রথম পূর্ণাঙ্গ বাংলা সার্চ ইঞ্জিন ‘পিপীলিকা’ (www.pipilika.com) তার একটি উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। সাধারণভাবে ইন্টারনেটে তথ্য খোঁজার জন্য যে মাধ্যমটি ব্যবহার করা হয়ে থাকে, তারই নাম সার্চ ইঞ্জিন। গুগল, ইয়াহু কিংবা বিং নামের সার্চ ইঞ্জিনগুলোই বিশ্বব্যাপী সবচেয়ে বেশি ব্যবহূত হয়ে থাকে। সারাবিশ্বের মানুষের কাছেই এই সার্চ ইঞ্জিনগুলো জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে। এসব সার্চ ইঞ্জিন কিছু পরিমাণে স্থানীয় সেবাও প্রদান করে থাকে। তবে স্থানীয় সব তথ্য ইন্টারনেটে পাওয়ার জন্য স্থানীয় সার্চ ইঞ্জিনের বিকল্প নেই। চীনের ‘বাইদু’ই এর সবচেয়ে বড় প্রমাণ। তবে আমাদের বাংলা ভাষায় আজ থেকে মাস পাঁচেক আগ পর্যন্তও এমন কোনো সার্চ ইঞ্জিন ছিল না। কেউ কেউ বাংলা ভাষার সার্চ ইঞ্জিন নিয়ে কাজ করেছেন বটে, তবে সেগুলোর কোনোটিই আলোর মুখ দেখেনি। এই অভাবটিই পূরণ করেছে সিলেটের শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (শাবিপ্রবি) এক ঝাঁক তরুণ প্রাণ। বিশ্ববিদ্যালয়ের কম্পিউটার বিজ্ঞান ও প্রকৌশল বিভাগের তত্ত্বাবধানে একটি প্রকল্প হিসেবে শুরু করা ‘পিপীলিকা’ চূড়ান্তভাবে বাজারে আসার উপযোগী হয় জিপিআইটি’র সহযোগিতায়। অনলাইন বিশ্বে বাংলা ভাষার এই সার্চ ইঞ্জিনটি আনুষ্ঠানিকভাবে আত্মপ্রকাশ করে চলতি বছরের ১৩ এপ্রিল, বাংলা নববর্ষের প্রাক্কালে। ‘পিপীলিকা’ সার্চ ইঞ্জিনের মূলে ছিলেন শবিপ্রবি’র কম্পিউটার বিজ্ঞান ও প্রকৌশল বিভাগের ১১ জন শিক্ষার্থী। তাদের এক বছরের অক্লান্ত পরিশ্রমের ফসল হিসেবে আলোর মুখ দেখে সার্চ ইঞ্জিনটি। ওই ১১ জন শিক্ষার্থী হলেন মিশু, তালহা, তালহা ইবনে ইমাম, তৌহিদ, সাজ্জাদ, আসিফ, বাকের, তপু, ফরহাদ, আশিস এবং মাকসুদ। এই তরুণ দলের সাথে মুখ্য গবেষক হিসেবে নেতৃত্ব দিয়েছেন ওই বিভাগেরই সহকারী অধ্যাপক রুহুল আমিন সজীব। আর এই প্রকল্পের পরিচালক হিসেবে ছিলেন বিভাগের অধ্যাপক ড. মুহম্মদ জাফর ইকবাল। এই দলটি ছাড়াও আরও ৩০ জন শিক্ষার্থীর থিসিস পেপারের উপর ভিত্তি করে প্রকল্পটি চালু করা হয়েছে। মূল দলটি ‘পিপীলিকা’কে বাস্তবে রূপ দিতে এক বছর টানা পরিশ্রম করলেও সবমিলিয়ে তিন বছর ধরেই গবেষণা চলছিল এই সার্চ ইঞ্জিন নিয়ে। স্থানীয় একটি সার্চ ইঞ্জিন হিসেবে ওয়েবে বাংলা ভাষায় যত কনটেন্ট রয়েছে, তার সবগুলোকেই সার্চ করার প্রতিশ্রুতি নিয়ে যাত্রা শুরু করে ‘পিপীলিকা’। তবে বড় বড় সব সার্চ ইঞ্জিনের সাথে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে সক্ষম এই সার্চ ইঞ্জিনে বাংলা ভাষার পাশাপাশি ইংরেজি ভাষাতেও সার্চ করার সুবিধা যুক্ত করা হয়েছে। ফলে উভয় ভাষাতেই প্রয়োজনীয় তথ্যগুলো খুঁজে পাওয়া যাবে ‘পিপীলিকা’ ব্যবহার করে। শুধু তাই নয়, এই সার্চ ইঞ্জিনে যুক্ত করা হয়েছে একটি নিজস্ব বাংলা অভিধান এবং বানান পরীক্ষক। ফলে যে কেউ ‘পিপীলিকা’তে কিছু লিখতে গেলে বানান ভুল করলে তা স্বয়ংক্রিয়ভাবে শুদ্ধ করার পরামর্শ প্রদান করবে সার্চ ইঞ্জিনটি। আর তথ্যের অনুসন্ধান করা যাবে পাঁচটি ভিন্ন ক্যাটাগরিতে। এগুলো হলো: সকল (সাধারণ অনুসন্ধান), সংবাদ, ব্লগ, বাংলা উইকিপিডিয়া এবং জাতীয় ই-তথ্যকোষ। সংবাদের মধ্যে আবার রয়েছে ব্যবসা ও বাণিজ্য, তথ্য ও প্রযুক্তি, বিনোদন এবং খেলাধুলা শীর্ষক চারটি শ্রেণীবিভাগ। এতে সার্চ করার পর সার্চের ফলাফল প্রদর্শিত হয়ে থাকে সময়ক্রমিক অনুসারে। আর দেশের প্রধান প্রধান বাংলা ও ইংরেজি সংবাদপত্র, বাংলা ব্লগ, বাংলা উইকিপিডিয়া ও সরকারি তথ্য স্বয়ংক্রিয়ভাবে বিশ্লেষণ ও সংরক্ষণ করা রয়েছে এতে। ‘পিপীলিকা’র সার্চ বক্সে বাংলা লেখার জন্য স্বয়ংক্রিয়ভাবে যুক্ত রয়েছে অভ্র ফোনেটিক ব্যবস্থা। তবে এর বাইরে ইনক্রিপ্ট, ন্যাশনাল কিবোর্ড এবং প্রভাত লেআউটও ব্যবহার করা যাবে । সম্প্রতি দেশের প্রথম পূর্ণাঙ্গ বাংলা এই সার্চ ইঞ্জিনে নিউজ ফিডের একটি ফিচার যুক্ত করা হয়েছে। এর ফলে ‘পিপীলিকা’য় প্রবেশ করে ‘শীর্ষ সংবাদ’ শীর্ষক ভুক্তিতে ক্লিক করলেই দিনের প্রধান প্রধান খবরগুলো প্রদর্শিত হবে। এ ক্ষেত্রেও খবরের শ্রেণীবিভাগ রয়েছে। এগুলো হলো: দেশে-বিদেশে, ব্যবসা ও বাণিজ্য, তথ্য ও প্রযুক্তি, খেলাধুলা এবং বিনোদন। বামপাশের প্রধান অংশে গুরুত্বপূর্ণ সব খবর দেখানোর পাশাপাশি ডান পাশে সর্বশেষ সব সংবাদ দেখানো হয়ে থাকে এই ওয়েবপেজে। এই পেজেরই নিচের দিকে ঢাকা শহরের কয়েকদিনের আবহাওয়ার পূর্বাভাসও প্রদর্শন করা থাকে। সবমিলিয়ে পূর্ণাঙ্গ একটি সার্চ ইঞ্জিন হওয়ার জন্য সব ধরনের প্রচেষ্টাই রয়েছে ‘পিপীলিকা’র।