সিনিয়র স্টাফ নার্স নিয়োগে বাণিজ্য ও অব্যবস্থাপনায় অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন শীর্ষ কর্মকর্তারা। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষও চরম ক্ষোভ প্রকাশ করেছে। নিয়োগপ্রাপ্ত আর কোন নার্স যেন বিবি হাওয়ার মতো করুণ পরিণতির শিকার না হন সেজন্য নির্দেশ দিয়েছেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী।
স্বাস্থ্যমন্ত্রী ডা. আ ফ ম রুহুল হক গতকাল নার্স বিবি হাওয়ার করুণ মৃত্যুর ঘটনা জরুরি ভিত্তিতে তদন্ত করার নির্দেশ দেন। মন্ত্রীর নির্দেশে ময়মনসিংহ মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ একটি তদন্ত কমিটি গঠন করেছে। অপরদিকে সেবা পরিদফতরের পক্ষ থেকে বিবি হাওয়ার মৃত্যুর ঘটনা নিয়ে আলাদা আরো একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হচ্ছে বলে এক কর্মকর্তা জানান। গতকাল বৃহস্পতিবার দৈনিক ইত্তেফাকে প্রকাশিত ‘নিয়োগপত্র পেয়েও কাজে যোগদান করতে পারলেন না হাওয়া বিবি’ শীর্ষক সংবাদে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়সহ দেশব্যাপী চিকিত্সা শিক্ষা নার্সিং ইনস্টিটিউট ও কলেজে তোলপাড় সৃষ্টি হয়।
নিয়োগ বাণিজ্য ও অব্যবস্থাপনার কারণে নিয়োগপত্র পেয়ে সিনিয়র স্টাফ নার্স বিবি হাওয়া কর্মস্থলে যোগদানে ব্যর্থ হন। নার্সিং সুপার তার সাথে এমন দুর্ব্যবহার করেন যে, তিনি সেখানেই অসুস্থ হয়ে পড়েন। বহুল প্রত্যাশিত নিয়োগপত্র হাতে নিয়েই বিবি হাওয়া জ্ঞান হারিয়ে মাটিতে লুটিয়ে পড়েন। তাকে দ্রুত ময়মনসিংহ মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল ইনটেনসিভ কেয়ার ইউনিটে ভর্তি করা হয়। তবে তিনি আর নিয়োগের জন্য অপেক্ষা করতে পারলেন না। হাসপাতালে চিকিত্সাধীন অবস্থায়ই মারা যান।
তার এ করুণ মৃত্যুর জন্য নার্স নেতৃবৃন্দ নিয়োগ নিয়ে অব্যবস্থাপনা ও উেকাচ বাণিজ্যকে দায়ী করেছেন। অনেকে দাবি করেন, নিয়োগ নিয়ে দালাল চক্রের উেকাচ বাণিজ্য ও অব্যবস্থাপনার কারণে নার্স হাওয়া বিবির মৃত্যু হয়েছে। শত শত নার্স কর্মস্থলে যোগদান করতে না পেরে পুনরায় সেবা পরিদপ্তরে ফিরে আসছেন। গতকাল পর্যন্ত এ সংখ্যা ৫ শতাধিক বলে সেবা পরিদফতরের এক কর্মকর্তা জানান।
ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে সৃষ্ট পদ ১৪৮টি। গত বুধবার অর্থাত্ নিয়োগের শেষ দিন পর্যন্ত মাত্র ৭৪ জন নার্স যোগদান করেছেন। আরো ৭৪টি পদ শূন্য রয়েছে। একইভাবে সিলেট মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল ও সিলেট বিভাগে ৬শ’ নার্সের পদ শূন্য রয়েছে। সেখানে কাউকে যোগদানের জন্য পাঠানো হয়নি। একই অবস্থা চট্টগ্রাম বিভাগেও।
ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, বার্ন ইউনিটে ১১ জন সিনিয়র স্টাফ নার্স প্রায় এক যুগ ধরে উন্নয়ন খাতে কাজ করে আসছেন। তারা বার্নের ওপর অভিজ্ঞ। তাদেরকে রাজস্ব খাতে বার্ন ইউনিটে নিয়োগ দেয়ার জন্য কমিটির কাছে অনুরোধ জানানো হলেও কমিটি মাত্র ২ জনকে বার্ন ইউনিটে নিয়োগ দিয়ে বাকি ৯ জনকে ঢাকার বাইরে পাঠিয়ে দিয়েছেন। সরকারি মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালসহ জেলা, উপজেলা হাসপাতালে শূন্য পদের তালিকা প্রস্তুত করে সে তালিকা অনুযায়ী নিয়োগপত্র জারি করে স্ব স্ব হাসপাতালে পাঠানো হলে কোন সমস্যা হতো না। কোন কোন হাসপাতালে শূন্য পদের দ্বিগুণ নিয়োগ দিয়েছে আবার কোন কোন হাসপাতালে শূন্য পদের তিন ভাগের এক ভাগ নিয়োগ দিয়েছে। দালাল চক্র নার্সদের পছন্দের জায়গায় নিয়োগ পেতে ৫০ হাজার থেকে এক লাখ টাকা নিয়েছে। সেই দালাল চক্রের তালিকা অনুযায়ী নিয়োগপত্র জারি করায় এ অব্যবস্থাপনা সৃষ্টি হয়েছে বলে হাসপাতাল পরিচালকগণ জানিয়েছেন। সরকার মাত্র ৪১০০ নার্স নিয়োগ দিয়েছে। কিন্তু নবসৃষ্টসহ শূন্য পদের সংখ্যা দ্বিগুণ বলে সেবা পরিদফতর সূত্রে জানা যায়। দালাল চক্র প্রায় ১০ কোটি টাকার নিয়োগ বাণিজ্যের মাধ্যমে অনিয়মের অতীত সব রেকর্ড অতিক্রম করেছে। সেবা পরিদফতরের ভারপ্রাপ্ত পরিচালক তাসলিমা বেগম বলেন, আগামী রবিবার ফেরত আসা সব নার্সদের শূন্য পদে যোগদানের ব্যবস্থা করা হবে।
ময়মনসিংহ প্রতিনিধি জানান, ‘নিয়োগপত্র পেয়েও কাজে যোগ দিতে পারলেন না হাওয়া বিবি’ এ শিরোনামে দৈনিক ইত্তেফাকে সংবাদ প্রকাশের পর বৃহস্পতিবার ময়মনসিংহ মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের পরিচালক বিগ্রেডিয়ার জেনারেল মো. ফসিউর রহমানকে প্রধান করে ৩ সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে।
বিবি হাওয়ার বোন ফজিলা খাতুন বলেন, আমার বোন মোবাইলে এডিএনএস সুরাইয়ার সাথে যোগদান নিয়ে কথা বলার সময় হঠাত্ করে অসুস্থ হয়ে পড়ে। পরে তাকে রাত সোয়া ৮টার দিকে ফুলপুর হাসপাতালে নিয়ে ভর্তি করি। সেখানে ডাক্তারের সেবা না পেয়ে রাতেই ময়মনসিংহ মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করি। কিন্তু এখানেও ভাল সেবা পায়নি সে। রাত দেড়টায় বিবি হাওয়া মারা যায়।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, বিবি হাওয়ার গ্রামের বাড়ী মুক্তাগাছা উপজেলার চেচুয়ার বাহিঙ্গা গ্রামে। তার শ্বশুর বাড়ি নেত্রকোনার শ্যামগঞ্জে। তাকে শ্বশুর বাড়িতে দাফন করা হয়েছে।
