গভীর সংকটে দেশ

আপডেট : ২০ সেপ্টেম্বর ২০১৩, ২২:৪৫
প্রধান দুই রাজনৈতিক দলের বিপরীতমুখী অবস্থানের কারণে দেশ গভীর সংকটের দিকে যাচ্ছে। অনেকে মনে করছেন, এই সংকট সাংবিধানিক, আবার কেউ কেউ বলছেন এটি রাজনৈতিক। তবে মূল সংকট হচ্ছে একটি বিশ্বাসযোগ্য নির্বাচনের জন্য গ্রহণযোগ্য পদ্ধতি খুঁজে বের করা। এই সংকট থেকে উত্তরণে এখন পর্যন্ত কোনো উপায় খুঁজে বের করতে পারেনি সরকার ও বিরোধী দল। এমনকি তারা মুখোমুখি সংলাপে বসার আয়োজন করতে ব্যর্থ হয়েছে। আইন বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, এ ধরনের পরিস্থিতি অব্যাহত থাকলে দেশের রাজনীতিতে সংঘাতময় পরিস্থিতির সৃষ্টি হবে। গভীর সংকটে নিপতিত হবে দেশ। গত ২ সেপ্টেম্বর সচিবালয়ে সচিবদের সঙ্গে বৈঠকে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেন, চলতি নবম জাতীয় সংসদের পাঁচ বছর মেয়াদ পূর্ণ হবে ২০১৪ সালের ২৪ জানুয়ারি। সংবিধান অনুযায়ী সংসদের মেয়াদ পূর্ণ হওয়ার পূর্ববর্তী ৯০ দিনের মধ্যে দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। তবে ঐ ৯০ দিনে সংসদের কোনো অধিবেশন বসবে না। ঐ সময়ে ছোট একটি মন্ত্রিসভা থাকবে, তবে মন্ত্রিসভা কোনো গুরুত্বপূর্ণ নীতি-নির্ধারণী সিদ্ধান্ত গ্রহণ করবে না, শুধু দৈনন্দিন কার্যক্রম পরিচালনা করবে। পরদিন প্রধানমন্ত্রীর এই বক্তব্য প্রত্যাখ্যান করে প্রধান বিরোধী দল বিএনপি। দলটির পক্ষ থেকে এক প্রেস-ব্রিফিংয়ে বলা হয়, প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্যে জনগণ শুধু হতাশই হয়নি, তাদের মধ্যে আরও উদ্বেগ বেড়েছে। এতদিন মানুষের মধ্যে যে সংলাপ ও সমঝোতার আশা ছিল, প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্যের পর সেই সম্ভাবনা একেবারে রুদ্ধ হয়ে গেছে। এমনকি মহাজোট সরকারের শরিক জাতীয় পার্টি (জাপা) চেয়ারম্যান এইচএম এরশাদও বলেন, ‘প্রধানমন্ত্রী ঘোষিত ব্যবস্থায় নির্বাচন করা আমাদের জন্য কঠিন হবে।’ বাংলাদেশের সংবিধান রচনা কমিটির আহ্বায়ক ড. কামাল হোসেন ইত্তেফাককে বলেন, সরকার ও বিরোধী দলসহ যেসব দল নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করবে তাদের সবাইকে নিয়ে জাতীয় সংলাপ হওয়া জরুরি। সেই সংলাপেই এসব প্রশ্ন কিংবা বিতর্কের অবসান হওয়া উচিত। অন্যথায় চাপিয়ে দেয়া সিদ্ধান্তে একতরফা নির্বাচন হতে পারে না। সংলাপ এড়িয়ে শুধু সংবিধানের দোহাই দিয়ে কিছু করা হলে তাতে শান্তি আসবে না। কেননা দেশের জনগণ সবার অংশগ্রহণে অবাধ, নিরপেক্ষ ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন চায়। সরকার সংলাপ ডাকুক, সেখানে তারা তাদের যুক্তি দেখাবে, যারা নির্দলীয় সরকার দাবি করছে তারা তাদের যুক্তি তুলে ধরবে। এভাবেই বিতর্কের নিষ্পত্তি করতে হবে। তা না হলে সংকট আরও বাড়বে। এদিকে বড় দুই রাজনৈতিক দলের এই অনড় অবস্থানে শুধু দেশে নয়, আন্তর্জাতিক পর্যায়েও উদ্বেগ দেখা দিয়েছে। ইতিমধ্যে সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন আয়োজনের লক্ষ্যে সঠিক পন্থা খুঁজে বের করতে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও প্রধান বিরোধী দল বিএনপির চেয়ারপার্সন বেগম খালেদা জিয়াকে গত ২৩ আগস্ট টেলিফোন করেন জাতিসংঘ মহাসচিব বান কি মুন। টেলিফোনে বান কি মুন দুই নেত্রীকে বলেন, জাতিসংঘ বাংলাদেশে অবাধ ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের মাধ্যমে ক্ষমতার শান্তিপূর্ণ হস্তান্তর দেখতে চায়। আগামী সাধারণ নির্বাচন সংবিধান অনুযায়ী যথা সময়ে অনুষ্ঠিত হবে এবং জনগণ কোনো বাধা-বিপত্তি ছাড়াই তাদের ভোটাধিকার প্রয়োগ করতে পারবে। এরপর গত ৭ সেপ্টেম্বর যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রী জন কেরি রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে সংলাপের তাগিদ দিয়ে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও বিরোধী দলীয় নেত্রী খালেদা জিয়াকে চিঠি দেন। তবে আন্তর্জাতিক এই তত্পরতার মুখেও সরকার সংবিধান অনুযায়ী নির্বাচন করার সিদ্ধান্তে অটল রয়েছে। যদিও বিএনপি বলছে, সরকারের সদিচ্ছার ওপর এই সংলাপ নির্ভর করছে। আন্তর্জাতিক তত্পরতার মুখে চলতি মাসে জাতিসংঘ মহাসচিব বান কি মুনের বিশেষ দূত অস্কার ফার্নান্দেজ তারানকো বাংলাদেশে আসছেন। আন্তর্জাতিক মহলের এই উদ্বেগের বিষয়ে ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের স্কুল অব ল’র পরিচালক ও সংবিধান বিশেষজ্ঞ ড. শাহদীন মালিক ইত্তেফাককে বলেন, জাতিসংঘ মহাসচিব বান কি মুন স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছেন যে বাংলাদেশে দুটি বড় রাজনৈতিক দল পরস্পরবিরোধী অবস্থানে রয়েছে। পূর্ব অভিজ্ঞতা থেকে দেখা যায়, এ ধরনের পরিস্থিতিতে সংঘাতময় পরিবেশের জন্ম হয়। এজন্য তারা আগেভাগে রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দকে সাবধান করছেন। অথচ আমরা এই সাবধান বাণীর অর্থ বুঝতে সক্ষম হচ্ছি না। তিনি বলেন, জাতিসংঘের একটি ক্রাইসিস গ্রুপ রয়েছে। তাদের কাজই হলো কোন দেশে রাজনৈতিক সংঘাত লাগলে তা নিরসনে ভূমিকা রাখা। তারা মনে করছে, আগামী নির্বাচন নিয়ে এই দেশে সংঘাতময় পরিস্থিতির সৃষ্টি হতে পারে। তাই জাতিসংঘ এই তত্পরতা দেখিয়েছে। তিনি বলেন, সমস্যা হচ্ছে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের এই সাবধান বাণী বোঝার লোকও এদেশে নেই। অনেকেই বলছে, বিদেশিরা আমাদের উপর চাপ সৃষ্টি করছে। আসলে তা নয়। জাতিসংঘ ও আমেরিকা দেখতে পাচ্ছে বাংলাদেশে ৬ নম্বর সংকেতের একটি সাইক্লোন বইছে। এজন্য তারা রাজনৈতিক দলের মধ্যে সংলাপ চেয়ে টেলিফোন করেছে ও চিঠি পাঠিয়েছে। ওই চিঠি পাঠানোর অর্থ হলো সাইক্লোনটা নিয়ন্ত্রণের নির্দেশনা দেয়া। ড. শাহদীন মালিক আরো বলেন, ‘একটা নির্বাচন তো হবে। তবে সেটি কতটা সুষ্ঠু ও অংশীদারিত্বমূলক হবে, কতজন অংশগ্রহণ করবেন সেটাই প্রশ্ন। এখন যেটি মনে হচ্ছে, অংশগ্রহণ মোটেও ব্যাপক হবে না, সীমিত হবে। অংশগ্রহণটা সীমিত হলে ওই নির্বাচনের পরে যে সরকার গঠিত হবে তাদের গ্রহণযোগ্যতা বিরাট প্রশ্নবিদ্ধ হবে। ফলে ওই সরকারের জন্য দেশ পরিচালনা করাটা দুষ্কর হবে।’ আইন বিশেষজ্ঞ ও রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, বাংলাদেশে অতীতে রাজনৈতিক দলগুলো কয়েকবার সংলাপে বসেছে। কিন্তু তারা কোন সমঝোতায় পৌঁছতে পারেনি। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বাংলাদেশে এ ধরনের সংকট নতুন কিছু নয়। বর্তমান সরকার ও তাদের উপদেষ্টারা ভালো করেই জানেন, বর্তমান সরকারের অধীনে বিএনপি নেতৃত্বাধীন বিরোধী জোট কখনোই নির্বাচনে আসবে না। এখন সরকারই সংবিধান সংশোধন করে এ অসম্ভবকে সম্ভব করতে পারে। সংসদে সংখ্যাগরিষ্ঠতা থাকায় সংবিধান সংশোধন করার সুযোগ বর্তমান সরকারের রয়েছে।