তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক উপদেষ্টা ড. আকবর আলী খান বলেছেন, বর্তমান রাজনৈতিক সংকটের মূলে রয়েছে নির্বাচনকালীন একটি গ্রহণযোগ্য সরকার প্রতিষ্ঠার ব্যাপারে বিবদমান পক্ষগুলোর মধ্যে ঐকমত্য না হওয়া। বাকি যেসব সমস্যার কথা বলা হচ্ছে, তার কোনোটিই প্রধান সমস্যা নয়, সেগুলো ছোট ছোট সমস্যা। নির্বাচন-কালীন গ্রহণযোগ্য সরকারের বিষয়ে সংশ্লিষ্টরা একমত হতে পারলেই সংকট কেটে যাবে।
গতকাল শুক্রবার দুপুরে রাজধানীর সিরডাপ মিলনায়তনে ইলেকশন ওয়ার্কিং গ্রুপের উদ্যোগে ‘গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ (আরপিও) সংশোধন প্রসঙ্গ’ শীর্ষক এক গোলটেবিল আলোচনায় বত্তৃদ্ধতাকালে তিনি আরও বলেন, সংকট সমাধানের কথা বলা হলেও প্রধান দুই পক্ষ এ ব্যাপারে কোনো সমঝোতার পথে হাঁটছে না। নেতাদের বক্তব্য থেকে সুস্পষ্ট কিছু বেরিয়ে আসছে না। উভয় পক্ষই প্রচণ্ড বিপরীতমুখী অবস্থানে রয়েছে। এক্ষেত্রে নির্বাচন কমিশনকে শক্তিশালী করা না করা বড় বিষয় হতে পারে না। যা চলছে, তাতে মনে হচ্ছে আমরা যেন ছায়ার সঙ্গে যুদ্ধ করছি।
অনুষ্ঠানটিতে আরও বক্তব্য রাখেন জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল - জেএসডির সভাপতি আ স ম আব্দুর রব, তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক উপদেষ্টা ও সুশাসনের জন্য নাগরিক - সুজন এর এম হাফিজ উদ্দিন খান, সুজন সম্পাদক বদিউল আলম মজুমদার, দুর্নীতি দমন কমিশনের সাবেক চেয়ারম্যান গোলাম রহমান, জাতীয় নির্বাচন পর্যবেক্ষণ পরিষদ - জানিপপ এর অধ্যাপক নাজমুল আহসান কলিমউল্লাহ প্রমুখ । অনুষ্ঠানে সকল বক্তাই একমত পোষণ করেছেন যে, নির্বাচনের সময় একটি দলীয় সরকার ক্ষমতায় থাকলে নির্বাচন কমিশনের পক্ষে সরকারি কর্মচারীদের ওপর যথাযথ নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা সম্ভব হয় না।
অনুষ্ঠানে ড. আকবর আলী আরো বলেন, চলমান সংকট নিরসন প্রশ্নে প্রধান দুই দলের কেউই নিজ নিজ জায়গা থেকে একটুও সরে আসতে চাইছে না। এতে রাজনৈতিক সংঘাতের আশঙ্কা আরও বেড়ে যাওয়াটাই স্বাভাবিক। কারণ, একদিকে বর্তমান সরকার বলছে তত্ত্বাবধায়ক ব্যবস্থা দরকার নেই, ইসিকে শক্তিশালী করলেই চলবে। অন্যদিকে প্রধান বিরোধী দল নির্বাচনকালীন নির্দলীয় সরকারের বিকল্প অন্যকিছু মানতে নারাজ। এর পরিপ্রেক্ষিতে এখন নির্বাচন কমিশন বলছে, গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ বা আরপিও সংশোধন করে সমস্যার সমাধান করা হবে। কিন্তু আরপিও সংশোধন করাই বড় কথা নয়। নির্বাচনকালীন গ্রহণযোগ্য সরকারই বড় বিষয়। যেহেতু রাজনৈতিক দলগুলো কেউ কাউকে বিশ্বাস করে না এবং সেটা না করবার যথেষ্ট যৌক্তিক কারণও রয়েছে, সুতরাং নির্বাচনকালীন গ্রহণযোগ্য সরকারের বিষয়ে মতৈক্য না হলে সংকট রয়েই যাবে। সমস্যা সমাধানে নির্বাচনের সময়টাতে সব মন্ত্রণালয়ের কর্তৃত্ব নির্বাচন কমিশনকে দেয়ার কথা উঠেছে। এটাও একটা অসাংবিধানিক প্রস্তাব। কারণ, সংবিধান অনুযায়ী সবগুলো মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব কেবিনেটের ওপর ন্যস্ত। সুতরাং সংবিধান সংশোধন ছাড়া সেই দায়িত্ব ইসিকে দেয়া যায় না।
এম হাফিজ উদ্দিন খান বলেন, গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ বা আরপিওতে যেসব অসঙ্গতি আছে তা নিরসনে নির্বাচন কমিশনকে চাপ প্রয়োগ করতে হবে। ইতিপূর্বে পরপর কয়েকটি নির্বাচনের জন্য নির্বাচন কমিশন গঠিত হয় নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময়। কিন্তু বর্তমান নির্বাচন কমিশন গঠিত হয়েছে রাজনৈতিক সরকারের শাসনকালে। সে কারণে এই কমিশনের গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যায়। একটি রাজনৈতিক বা দলীয় সরকারের শাসনকালে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হলে সেই নির্বাচনের সময় সরকারি কর্মচারীদের নিয়ন্ত্রণ করা ইসির পক্ষে সম্ভব নয় বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
জেএসডি সভাপতি আ স ম আব্দুর রব বলেন, আমরা নির্বাচন নিয়ে অনেক কথা বলছি। নির্বাচন কমিশনের ক্ষমতা বৃদ্ধি ও নির্বাচনী আইন সংশোধনের আলোচনাও হচ্ছে। কিন্তু দেশে আদৌ কোনো নির্বাচন হবে কি না সেটাই আজ সবচেয়ে বড় প্রশ্ন। সুজন সম্পাদক ড. বদিউল আলম মজুমদার বলেন, বর্তমান নির্বাচন কমিশন আরপিও সংশোধনের কথা বলছে ঠিকই, কিন্তু একটি সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের জন্য যে ধরনের সংশোধনী আনা দরকার সে ব্যাপারে কমিশনের কোনো উদ্যোগ দেখা যাচ্ছে না।
