দক্ষিণাঞ্চলের ৩ হাজার কিলোমিটার নৌপথ মরণফাঁদে রূপ নিয়েছে। ১৪শ’ কিলোমিটার নৌপথ নাব্যতা হারিয়ে নৌযান চলাচলের অনুপযোগী হয়ে পড়েছে। নাব্যতা সংকটের ফলে বন্ধ হয়ে গেছে এ অঞ্চলের ২৭টি নৌপথ। আরো তিনটি রুট বন্ধ হওয়ার উপক্রম। নদীবেষ্টিত দক্ষিণাঞ্চলের মাত্র ১৩টি রুটে ছোট লঞ্চ চলাচল করে।
যে নদী এক সময় ভাটি অঞ্চলের মানুষের বাঁচার অবলম্বন ছিল, তা এখন ছোট খাল বা নালা ছাড়া আর কিছু নয়। কিছুকাল আগেও বিভাগের ৬টি জেলা ও ৪০টি উপজেলার কয়েক কোটি মানুষের প্রধান যাতায়াত মাধ্যম ছিল নৌপথ। বিআইডব্লিউটি’র সূত্রমতে, তখন ৮৮টি নৌ-রুটে একতলা লঞ্চ চলাচল করতো। এর বাইরেও সাধারণ নৌকা ও ইঞ্জিনচালিত নৌকা ছিল যাতায়াত মাধ্যম। খেয়ামাঝি যাত্রী পারাপার করে জীবন যাপন করতো। এ অঞ্চলের মানুষ আগে ‘গয়না নৌকায়’ চড়ে দূর-দূরান্তে যাতায়াত করতো।
বিশাল বিশাল নৌকায় মালামাল আনা-নেয়া করা হতো। গয়না নৌকাযোগে মানুষ শহর-বন্দরে যাতায়াত করতো ও জিনিসপত্র আনা-নেয়া করতো। ভোররাতে বিভিন্ন গ্রাম থেকে গয়না নৌকা যাত্রী নিয়ে শহরের উদ্দেশ্যে রওনা হতো। গয়না নৌকা চলাচলে আবার সময়সূচি ছিল। কোনটা সকালে, কোনটা বা বিকালে গন্তব্যের উদ্দেশ্যে যাত্রা করতো। ছইওয়ালা নৌকায় চড়ে গ্রামের বধূরা বাবার বাড়ি-শ্বশুর বাড়ি যাতায়াত করতো। এ ধরনের নৌকাকে বলা হতো নাইয়রি নৌকা। এই নদী, এই নৌকা, এই মাঝি, এই পানি, এই নাইয়র নিয়ে অসংখ্য গান রয়েছে বাংলায়। কিছুদিন আগেও মাঝিদের গাওয়া ভাটিয়ালী সুর মায়াজাল বুনতো নদীর তীরে তীরে। তবে সেসব এখন কেবলই বেদনা জাগানো সুখস্মৃতির মত নাড়া দেয় মনকে।
বৈঠার ছলাত ছলাত শব্দে কোষা নৌকা বা মাঝিমাল্লার গুন টেনে একাবৈঠার নৌকা (রশি দিয়ে নৌকা টেনে নিয়ে যাওয়া) যাওয়ার দৃশ্য চোখে পড়ে না। নদী ভরাট হয়ে যাওয়ায় নৌকার যাত্রী আর মাঝিমাল্লারা যেন উল্টো সুরে বলছেন, ‘মন মাঝি তোর বৈঠা নেরে আমি আর বাইতে পারলাম না’। গয়নার নৌকার পর বরিশাল, ভোলা, পটুয়াখালী, বরগুনা, পিরোজপুর ও ঝালকাঠীর অভ্যন্তরীণ রুটে চলাচল করতো এমএল টাইপের লঞ্চ। এখন তাও অধিকাংশ গুটিয়ে গেছে।
হিজলা-মেহেন্দীগঞ্জ উপজেলার পাশ দিয়ে বয়ে যাওয়া মেঘনা নদী দিয়ে এক সময় শরিয়তপুরের পট্টি পর্যন্ত যাতায়াত করতো একতলা লঞ্চ। ভাষাণচর, হিজলা, শৌলা, লালখারাবাদ, লতা, আন্ধারমানিক ও খুন্না বাজারের মতই বরিশাল-ভোলা রুটে অসংখ্য যাত্রীবাহী লঞ্চ কালাবদর, আড়িয়াল খাঁ নদী অতিক্রম করে যাতায়াত করতো। কালাবদর ও বিষখালী নদী পাড়ি দেয়ার সময় যাত্রীদের সাথে লঞ্চ স্টাফরাও প্রাণ হাতের মুঠোয় নিয়ে সৃষ্টিকর্তার নাম জপতো। এখন এসব রুটে এমএল টাইপের লঞ্চ চলাচলের জন্য প্রয়োজনীয় ৮/৯ ফুট পানি পর্যন্ত নেই। লঞ্চ মালিকরা অন্য ব্যবসায় ঝুঁকছেন। যারা লঞ্চ কিংবা নৌকা চালিয়ে জীবিকা অর্জন করতেন, সেসব মানুষ আর নতুন পেশায় গিয়ে সুবিধা করতে পারেনি। নৌ-যান চালকরা জানান, লোহালিয়া, বিষখালী, পায়রা, নিশিন্দা, আগুনমুখা, আন্ধারমানিক, লাউকাঠী, ইলিশা, গনেষপুরা, সন্ধ্যা, সুগন্ধা ও পালরদী নদী নাব্যতা হারিয়েছে। জেগে উঠেছে অসংখ্য চর। সাহেবেরহাট ও লাহারহাট পয়েন্টে নাব্যতা কমে যাওয়ায় দুধল, দাঁড়িয়াল, বাকেরগঞ্জ, চরামদ্দি, বলাইকাঠী, চন্দ্রমোহন, বুখাইনগর, মেহেন্দিগঞ্জ রুটের লঞ্চ চলাচল প্রায় বন্ধ।
নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ের সূত্র জানায়, সারাদেশের ২৪ হাজার কিলোমিটার নৌপথ ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠেছে। নৌকা, ইঞ্জিনচালিত ট্রলার, লঞ্চ মালিক ও চালকরা বেকার হওয়ার পাশাপাশি দুর্বিষহ জীবন যাপন করতে হচ্ছে জেলেদের।
হিজলার মেঘনা পাড়ের মাঝি আব্দুর রাজ্জাক জানান-‘ছোড কালে বাবার লগে গাঙ্গে জাল বাইতে যাইতাম, জোয়ারের পানির লগে যেন ইলশা মাছের মিছিল আইয়্যা জালে হাইন্দ্যা পরতো। একটা খেও দেলেই মাছে মাছে নাওডা ভইর্যা যাইতো। হেই দিন যে কই গেল! বলেই দীর্ঘ নিঃশ্বাস ছেড়ে বৃদ্ধ আরজ আলী বললেন, ‘বাবা এহন তো গাঙ্গে পানিই নাই, মাছ আইবো কোম্মে গোনে?’ এ হতাশা মেঘনা, তেঁতুলিয়া, বুড়া গৌরগঙ্গা, বিষখালী, রামনাবাদ, আড়িয়াল খাঁ ও আগুনমুখা নদীর তীরবর্তী জেলেপল্লীর বাসিন্দাদের। দক্ষিণ উপকূল ভাগের প্রায় ৩ লাখ পরিবার নদীতে মাছ শিকার করে জীবিকা নির্বাহ করে। মত্স্য আড়ত, পাইকার ও শ্রমিক মিলিয়ে মত্স্য সম্পদকে কেন্দ্র করে বেঁচে আছে ৬ লাখের বেশি পরিবার। আমন ধান পাকলেই মাটির হাঁড়ি, পাতিল, কলসসহ বিভিন্ন জিনিসপত্র নৌকায় তুলে বিভিন্ন গ্রামে বিক্রির জন্য ছুটতো ব্যবসায়ীরা। গত দুই যুগে নদীতে এসব পাল তোলা নৌকা চোখে পড়েনি বলে জানালেন চরহোগলা গ্রামের এনছান মাঝি (৯১)।
বেদে সমপ্রদায়ের লোক বংশ পরম্পরায় নদীতে বাস করতো। বেদে সমপ্রদায়ের নারীরা নদীতে জাল পেতে মাছ ধরতো। পুরুষরা সে মাছ হাট-বাজারে বিক্রি করে সংসার চালাতো। নারীরা গ্রামে সাপের খেলা, জাদু দেখানো, ঝাড় ফুঁক ও পানি, তেল পড়া দিত, আলতা, নখ পালিশ ও চুড়ি-ফিতা বিক্রি করত। তাদের নদীতেই জন্ম, বিয়ে ও ঘর-সংসার। এখন নদী শুকিয়ে যাওয়ায় বেদেরা নৌকা ছেড়ে ডাঙ্গায় উঠেছে। তারা এখন ডাঙ্গাতেই নতুন করে বেঁচে থাকার চেষ্টা করছে।
দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের ৩০ নদী পানিশূন্য
দেশের ৭শ’ টি নদীর মধ্যে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে ২১ জেলার মধ্য দিয়ে প্রবাহিত নদীগুলোর মধ্যে ৩০টি নদ-নদী পলি পড়ে ও চর জেগে নাব্যতা হারিয়েছে। এখন সামান্য জোয়ার হলেই নদীর দু-কূল উপচে পড়ে গ্রাম ও চরগুলো প্লাবিত হয়। লবণাক্ত এ পানিতে নষ্ট হয় ফসলি জমি। এককালে স্রোতস্বিনী নদ-নদীর বুক জুড়ে এখন শুধুই ধু-ধু বালুচর। প্রমত্তা মেঘনার বুকেও এখন অসংখ্য চর। আগে ভোলা ও লক্ষ্মীপুরের মধ্যবর্তী প্রমত্তা মেঘনার এক তীর থেকে অন্য তীর দেখা যেত না। মাঝে মাঝে জেগে উঠেছে একাধিক চর। যে রাক্ষুসে শাহবাজপুর নদী পাড়ি দিতে মাঝিমাল্লাদের বুক দুরু দুরু করতো, তা এখন মরা নদী।
মেহেন্দীগঞ্জ উপজেলার উলানিয়ার মেঘনায় জেগে উঠছে চর। একইভাবে অসংখ্য চর জেগেছে হিজলা, চাঁদপুরসহ ঢাকা-বরিশাল রুটের বিভিন্ন স্থানে। বিপজ্জনক হয়ে উঠেছে ঢাকা-বরিশাল-চট্টগ্রাম নৌ-রুট। বঙ্গোপসাগরের লোনা পানি ছেড়ে ইলিশ ডিম ছাড়তে শাহবাজপুর, মেঘনা ও কালাবদরের গভীর মিঠা পানির এলাকায় ছুটে আসতো। কিন্তু গভীরতা কমে যাওয়ায় ইলিশ তার গতিপথ পরিবর্তন করে এখন ছুটছে মিয়ানমার সীমান্তের নদীগুলোতে।
এক সময় রূপালী ইলিশের মৌসুমকে কেন্দ্র করে শত কোটি টাকার লেনদেন হতো নদীতে। এখন নদী মানেই লাখো পরিবারের দীর্ঘশ্বাস। খোদ বরিশাল নগর সংলগ্ন কীর্তনখোলা নদীতেই জেগে উঠেছে একাধিক চর।
নদীর পানির সাথে পলি জমে মাটি উর্বর হত। তাতে ফসল ফলত সোনার মত। এ কারণে বাংলার শস্য ভান্ডারের খেতাব পেয়েছিল বরিশাল। সেই বালাম চালের দিন আর নেই। নদীতে পানি নেই তাই আর তেমন ফসল হয় না। চরমোনাই গ্রামের কবির হোসেন জানান, চাষাবাদে এখন আর আগের মত লাভ না হওয়ায় তিনি ইটের ভাটায় কাজ নিয়েছেন। এনসান মাঝি আগে একা বৈঠার নৌকায় নগরীর উত্তর পাড়ের যাত্রীদের আট আনার বিনিময় আনা নেয়া করতেন। ৬৮ বছর বয়সেও একাই বৈঠা বেয়ে উত্তাল কীর্তনখোলা পাড়ি দিয়ে ১০/১২ জন যাত্রীকে এপার ওপার করে সংসার চালাতেন এনসান। ছেলেরা বাবার পেশার আধুনিকতার ছোঁয়া দিতে ইঞ্জিন চালিত নৌকায় যাত্রী পরিবহন শুরু করেন। কিন্তু কালীবাবুর খেয়াঘাট ভরাট হয়ে যাওয়ায় এখন এনসান মাঝির ছেলে তারিকের মতই রব্বানী, গোলাম আলী রিকশা ও ভ্যানের শক্ত হ্যান্ডেল ধরতে বাধ্য হচ্ছেন।
উত্তর তীরের মানুষ নগরীতে যাতায়াতের সহজ পথ হিসাবে বেলতলা ফেরিঘাটকে বেছে নিয়েছেন। এনসানের ছেলেদের মত বংশ পরম্পরায় যারা নৌকা কিংবা ট্রলারে যাত্রী পরিবহন করতেন তারা এখন সড়ক পথে ইজিবাইক, টমটম কিংবা ভটভটির সাথে খাপ খাওয়াতে পারছেন না। বেদে বহরে থাকা দুলাল সরদার ও মকবুল সরদারসহ তাদের গোত্রের লোকজন জল ছেড়ে ডাঙ্গায় আবাস গড়েছেন। নদীর তীরবর্তী রাজারচর গ্রামে এখন প্রায় অর্ধশত বেদে পরিবারের বসবাস। সরকারি ভিজিএফ এবং ভিজিডিসহ নানান সাহায্য নিয়ে তাদের জীবন চলে। প্রতিবেশীরা তাদের ঐ এলাকাটিকে বেবাইজ্যা বাড়ি বলে সম্বোধন করে। সেখানকার প্রবীণ আব্দুল আলী জানান, তার জন্ম বেদে বহরের নৌকায়। ঝড়-জলোচ্ছ্বাসে তিনি ছিলেন নৌকার অকুতভয় মাঝি। কিন্তু নিজের যৌবন হারানোর আগেই নদীর যৌবনে ভাটা দেখা দেয়ায় নদী ছেড়ে আবাস গেড়েছেন স্থলে। তিনি জানান, নদী নেই, মাছ নেই। তাই খাবারের চুলা জ্বলে না। তার পরিবারের যুক্তি গ্রামে শাক পাতা যোগাড় করে দু’ বেলা দু’ মুঠো খাবারের ব্যবস্থা করা যায়। সে কথা অনুযায়ী বেদের দল ইউপি চেয়ারম্যানের অনুমতি নিয়ে সরকারি খাস জমিতে ভবিষ্যতের নীড় গড়েন। প্রতিবেশীরা জানান, ইউপি চেয়ারম্যান এদের ভোটার করার শর্তে গ্রামে ঠাঁই দিয়েছেন।
জীবনানন্দ’র ধানসিঁড়ি এখন মরা খাল
ঝালকাঠী শহরের পাশ দিয়ে বয়ে যাওয়া গাবখান চ্যানেলকে বলা হয় বাংলার সুয়েজ খাল। এ চ্যানেলকে ঘিরেই এক সময়ে বরিশাল-ঝালকাঠী ও মংলা বন্দরের মাঝে অনেক স্থানে ব্যবসা বাণিজ্যের কেন্দ্র গড়ে ওঠে। তখন ভারতের হলদিয়া বন্দর থেকে পণ্যবাহী জাহাজ মংলা বন্দর হয়ে গাবখান চ্যানেল দিয়ে ঝালকাঠী ও চট্টগ্রাম বন্দরে পৌঁছাত। যাত্রীবাহী জাহাজগুলো হলদিয়া বন্দর থেকে বরিশাল হয়ে সিরাজগঞ্জ পর্যন্ত যাতায়াত করতো । সে সব এখন রূপকথার মত শোনায়। গাবখান চ্যানেল ড্রেজিং করেও সচল রাখা সম্ভব হচ্ছে না। চ্যানেলে দু’প্রান্ত থেকে দু’টি জাহাজ একত্রে ঢুকলে দুর্ঘটনা অনিবার্য । ঝালকাঠীর যে নদী নিয়ে রূপসী বাংলার কবি জীবনানন্দ দাশ বিখ্যাত কবিতা লিখেছিলেন সেই ধানসিঁড়ি এখন মরা খালে রূপ নিয়েছে। নগরীর পাশ দিয়ে বয়ে যাওয়া বিশাল ঝুনাহার নদীটি দিয়ে মুক্তিযুদ্ধের সময় পাক বাহিনী প্রথম বরিশাল আক্রমণ করেছিল। ঐ নদীতে মুক্তিবাহিনী পাকিস্তানিদের একটি বড় জাহাজ ডুবিয়ে দিয়েছিল। এখন বড় জাহাজ তো দূরের কথা ছোট নৌকাও ঢুকতে পারে না।
বন্ধ হচ্ছে বাণিজ্য কেন্দ্র
নদীর নাব্যতা সংকটের কারণে ঝালকাঠীসহ দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে বাণিজ্যকেন্দ্রগুলোও বন্ধ হচ্ছে। সড়কপথে পরিবহন খরচ বেড়ে যাওয়ায় উত্পাদিত পণ্যের মূল্যবৃদ্ধিজনিত কারণে দক্ষিণ-পশ্চিম অঞ্চলের শিল্প কারখানাগুলো একে একে বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। শ্রমিকরা হয়ে পড়ছে বেকার। কৃষি উত্পাদন বাড়াতে নদীর ওপর ভিত্তি করে এ অঞ্চলে নির্মিত গঙ্গা-কপোতাক্ষ প্রকল্প (জিকে প্রজেক্ট), সঞ্জুরী প্রজেক্ট, মধুমতি-মাদারীপুর বিল রুট ক্যানেল সেচ প্রকল্প (এমবিআর প্রজেক্ট), বরিশালের উজিরপুরের সাতলা-বাগদা সেচ প্রকল্প, বরিশাল-ঝালকাঠী ও পিরোজপুরের ইরিগেশন প্রকল্পসহ অসংখ্য সেচ প্রকল্প মুখ থুবড়ে পড়েছে। বছরের পর বছর প্রকল্পভুক্ত বিস্তীর্ণ ফসলি জমি অনাবাদী থাকায় উত্পাদন কমে গেছে।
দেশে নদীর সংখ্যা কত?
সরকারি হিসাবে সারাদেশে নদীর সংখ্যা ৭শ’ বলা হলেও বিআইডব্লিউটিএ বলছে এটি ১৯৫৫ সালের তথ্য। অর্ধশত বছরে বেশ কয়েকটি নদী একেবারেই ভরাট হয়ে গেছে। কোনটি সরু খালে পরিণত হয়েছে। বর্তমানে সার্বক্ষণিক নৌ-যান চলাচলের জন্য মাত্র ২১২টি নদীতে প্রয়োজনীয় নাব্যতা রয়েছে বলে বিআইডব্লিউটিএ’র কর্মকর্তারা জানান। যদিও পানি উন্নয়ন বোর্ডের হিসেব মতে ৩১০টি নদীর নাব্যতা রয়েছে। তাদের দেয়া তথ্য অনুযায়ী এক সময় উল্লেখযোগ্য নদ-নদীর মধ্যে ছিল আগরপুর, পালরদি, সন্ধ্যা, সুগন্ধা, আড়িয়াল খাঁ, কালা বদর, আগুন মুখা, বলেশ্বর, বিষখালী, খাতাপোড়া, খাতা ছেড়া, ঝুনাহার, ইলিশা ও বুড়া গৌরগঙ্গ। এ সব নদ-নদীতে বর্তমানে স্রোত নেই। বাংলাদেশ নদী গবেষণা ইনস্টিটিউটের সাইন্টিফিক অফিসার জানান ঋতু পরিবর্তন ও জলবায়ু পরিবর্তনের ফলেই এ অবস্থার সৃষ্টি হয়েছে। ফারাক্কা বাঁধের পর পানির প্রবাহ কমে যাওয়ায় ছোট নদীগুলোতে আগাছা, কচুরি পানা ও পলি জমে ভরাট হতে থাকে।
নদী বিশেষজ্ঞরা বলছেন সামপ্রতিক বছরগুলোতে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের ৩০টি নদীর পানি প্রবাহের প্রধান উত্স পদ্মা ও মেঘনায় স্রোত কমে যাওয়ায় এসব শাখা নদীতে এর প্রভাব পড়েছে। এ শাখা নদীগুলো স্রোতহীন হয়ে পড়ায় বর্ষায় নদীবক্ষে জমা হওয়া পলি অপসারিত হয় না। ফলে প্রতিবছর জেগে উঠছে অসংখ্য ছোট-বড় চর। নদীগুলো হারাচ্ছে নাব্যতা। পলি জমে নদ-নদীগুলো পানিশূন্য হয়ে পড়ায় এ অঞ্চলে মত্স্য সম্পদও উজাড় হতে চলেছে। মিঠা পানির কমপক্ষে ৫০ প্রজাতির মাছ হারিয়ে গেছে। কৃষি, মত্স্য, শিল্প ও ব্যবসা বাণিজ্য ক্ষেত্রে ক্রমাবনতির কারণে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের সামগ্রিক অর্থনীতিতে ধস নেমেছে। বেড়েছে এ অঞ্চলে দারিদ্র্যের হার। পানি বিশেষজ্ঞরা বলছেন, নদীর নাব্যতা হারিয়ে যাওয়ায় কৃষি, মত্স্য, পশু সম্পদ, নদীর সাথে সম্পৃক্ত শিল্প কারখানা, পরিবেশ সম্পূর্ণ বিপন্ন ও বিপর্যস্ত হয়ে পড়বে। নদী বেষ্টিত এলাকাগুলোর পরিবেশের জন্য মারাত্মক বিরূপ প্রতিক্রিয়া বয়ে আনবে। হুমকির মুখে পড়বে জীববৈচিত্র্য।
