বহুল আলোচিত ঢাকা ঘেরাও কর্মসূচি শেষে সাড়ে চার মাস ধরে অনেকটাই নিষ্ক্রিয় থাকার পর কওমী মাদ্রাসা রক্ষার ইস্যুতে আবার সক্রিয় হচ্ছে হেফাজতে ইসলাম। আজ শনিবার চট্টগ্রামে প্রায় ৪ হাজার আলেম ওলামার অংশগ্রহণে ওলামা মাশায়েখ সম্মেলন আয়োজন করছে কওমী মাদ্রাসাভিত্তিক সংগঠনটি।
ফটিকছড়ি উপজেলার জামিয়া আজিজুল উলুম বাবুনগর মাদ্রাসায় দিনব্যাপী সম্মেলনের জন্য প্রস্তুতি সম্পন্ন হয়েছে বলে হেফাজতে ইসলামের সাংগঠনিক সম্পাদক মাওলানা আজিজুল হক ইসলামাবাদী গতকাল ইত্তেফাককে জানান।
একই দাবিতে গত বুধবার কওমী মাদ্রাসা সংরক্ষণ পরিষদ নামে একটি সংগঠনের ব্যানারে দেশের বিভিন্ন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার মাধ্যমে প্রধানমন্ত্রী বরাবরে স্মারকলিপি প্রদান করেছিলেন হেফাজত নেতারা।
চট্টগ্রামে এ বছর হেফাজতে ইসলামের এটি দ্বিতীয় ওলামা মাশায়েখ সম্মেলন। এর আগের সম্মেলনটি অনুষ্ঠিত হয় মার্চে হাটহাজারী উপজেলায় হেফাজতে ইসলামের প্রধান কার্যালয় দারুল উলুম মাদ্রাসায়। এতে প্রায় সাড়ে ৩ হাজার আলেম ওলামা যোগ দেন। ওই সম্মেলন থেকে রাসুল (সা.)-এর অবমাননাকারী নাস্তিক মুরতাদ ব্লগারদের সর্বোচ্চ শাস্তিসহ ১৩-দফা দাবি ঘোষণার পাশাপাশি আন্দোলনের মাসব্যাপী কর্মসূচি ঘোষণা করা হয়।
আন্দোলনের অংশ হিসেবে ৬ এপ্রিল ঢাকা অভিমুখী লংমার্চ ও ৫ মে ঢাকা ঘেরাও করে হেফাজত। দু’টি কর্মসূচিতেই দেশের বিভিন্ন এলাকা থেকে লাখ লাখ কর্মী অংশগ্রহণ করেন। ৬ এপ্রিল ঢাকার মতিঝিল শাপলা চত্বরে স্মরণকালের বৃহত্তম সমাবেশের মাধ্যমে লংমার্চ কর্মসূচিতে চমক সৃষ্টি করলেও পরবর্তীতে ৫ মে ঢাকা ঘেরাও কর্মসূচি ঘিরে রাজধানী জুড়ে চরম নৈরাজ্যকর পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়।
কর্মসূচি চলাকালে মতিঝিল ও আশেপাশের এলাকায় চলে ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞ ও হতাহতের ঘটনা। গভীর রাতে হেফাজত কর্মীদের শাপলা চত্বর থেকে সরিয়ে দেয়ার সময় আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর হাতে অসংখ্য কর্মী নিহত হন বলে হেফাজতে ইসলামের পক্ষ থেকে দাবি করা হলেও সরকারের তরফ থেকে ১১ জন নিহত হওয়ার কথা স্বীকার করা হয়।
হেফাজতের আজকের সম্মেলনের ব্যাপারে গতকাল সকাল পর্যন্ত পুলিশের অনুমতি নেয়া হয়নি বলে জানা গেছে। পুলিশ সুপার একেএম হাফিজ আকতার এ সম্মেলনের ব্যাপারে কিছু জানেন না বলে গতকাল বেলা সাড়ে ১১টায় ইত্তেফাককে জানান। ফটিকছড়ি থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা আতাউর রহমান ভূঁইয়া বলেন, তাদের কাছে সম্মেলনের অনুমতি নিতে এখন পর্যন্ত কেউ আসেননি।
মাওলানা আজিজুল হক ইসলামাবাদী বলেন, ওলামা মাশায়েখ সম্মেলন অনেকটা ঘরোয়া পরিবেশে শান্তিপূর্ণভাবে অনুষ্ঠিত হবে। এমন একটি অনুষ্ঠানের জন্য প্রশাসনের অনুমতি নিতে হবে বলে আমরা মনে করি না।
তবে হেফাজতের এ সম্মেলনকে কেন্দ্র করে স্থানীয় বাসিন্দাদের মধ্যে ব্যাপক উদ্বেগ সৃষ্টি হয়েছে। কারণ হেফাজতে ইসলাম নামের পাশাপাশি ফটিকছড়ি উপজেলার নামটিও এ বছর নানা কারণে আলোচনায় এসেছে। এর প্রধান কারণ, গত ১১ এপ্রিল ফটিকছড়ি উপজেলার ভুজপুর কাজীরহাট বাজারে আওয়ামী লীগের একটি মিছিলে দুর্বৃত্তদের হামলায় ৩ জন আওয়ামী লীগ কর্মী নিহত হয়। ওই ঘটনায় শতাধিক নেতাকর্মী আহত হওয়া ছাড়াও মোটর সাইকেল, প্রাইভেট কারসহ ২ শতাধিক যানবাহন ভাংচুর ও অগ্নিসংযোগ করা হয়। আওয়ামী লীগ এ হামলার জন্য বিএনপি-জামায়াত-হেফাজত জোটকে দায়ী করে।
গত ২৯ আগস্ট স্থানীয় আওয়ামী লীগের উদ্যোগে ফটিকছড়ির পাইন্দংয়ে জনসভা আয়োজন করা হয়। এতে প্রধান অতিথি ছিলেন দলের সভানেত্রী প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। দলের মিছিলে ‘মৌলবাদী’ চক্রের হামলার জবাব দিতেই এ জনসভার আয়োজন করা হয় বলে আওয়ামী লীগ নেতারা জানান।
আজকের সম্মেলনের উদ্দেশ্য সম্পর্কে জানতে চাইলে মাওলানা আজিজুল হক ইসলামাবাদী টেলিফোনে ইত্তেফাককে বলেন, সরকার কওমী মাদ্রাসা শিক্ষা কর্তৃপক্ষ গঠন করে কওমী মাদ্রাসাগুলোকে আজ্ঞাবহ প্রতিষ্ঠানে পরিণত করার পাঁয়তারা করছে। কওমী মাদ্রাসা রক্ষার বিষয়টি সম্মেলনের প্রধান এজেন্ডা হলেও ১৩ দফা দাবির সমর্থনে ঝিমিয়ে পড়া আন্দোলনে প্রাণসঞ্চার, শাপলা চত্বর থেকে হেফাজত কর্মীদের বিতাড়িত করতে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর আগ্রাসী ভূমিকা এবং সংসদ নির্বাচনে হেফাজতে ইসলামের ভূমিকাসহ বিভিন্ন ইস্যুতে দিকনির্দেশনা প্রদান করা হবে।
