আমরা আছি, তাই আমি আছি

আপডেট : ১৭ মে ২০১৯, ২১:৪৩

দক্ষিণ আফ্রিকার উবুন্টু ফিলসফি অত্যন্ত জনপ্রিয়। উহা হইল—আই অ্যাম বিকজ উই আর। সরল তর্জমা করিলে দাঁড়ায়—আমরা আছি, তাই আমি আছি। অর্থাত্ ‘আমরা’ না থাকিলে ‘আমার’ একার পক্ষে টিকিয়া থাকা সম্ভব হইত না। এই কথাটিতে আমরা আরেকটু বৃৃহত্ অর্থে ব্যবহার করিতে পারি। জগতে সকল জীব-জন্তু কীটপতঙ্গ আছে বলিয়াই আমরা ‘মানবজাতি’ টিকিয়া আছি। জীব-জন্তুর বৃহত্ একটি অংশের বিলুপ্তি ঘটিলে আমাদের জীবনও এইভাবে সুখের লহরে বহিয়া নাও যাইতে পারে। সম্প্র্রতি একটি গবেষণা প্রতিবেদনে জানা গিয়াছে যে, প্রায় ১০ লক্ষ প্রাণী ও উদ্ভিদ প্রজাতি বিলুপ্তির হুমকিতে রহিয়াছে। আর ইহার নেপথ্যে রহিয়াছে মানুষের কর্মকাণ্ড। ওই প্রতিবেদনে বলা হইয়াছে যে, পৃথিবীর ৭৫ শতাংশ স্থলভূমি ও সামুদ্রিক পরিবেশের ৬৭ শতাংশই মানুষের কর্মকাণ্ডের কারণে পরিবর্তিত হইয়াছে। আর এই কারণে বিলুপ্তির হুমকিতে পড়িয়াছে পৃথিবীর সামগ্রিক প্রাণী ও উদ্ভিদকুল।

প্রাণী ও উদ্ভিদকুলের বিলুপ্তি ঘটিবার ঘটনা পৃথিবীতে অবশ্য নূতন নহে। নানান গবেষণায় উঠিয়া আসিয়াছে যে, পৃথিবীতে প্রাণের বিকাশের পর এখন অবধি পাঁচবার প্রাণের মহাবিলোপ ঘটিয়াছে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে ৯৯ শতাংশ প্রাণ বিলুপ্তি হইয়া গিয়াছিল। তাহার পর সেই অন্তিম প্রান্ত হইতে পুনরায় ঘুরিয়া দাঁড়াইয়াছে পৃথিবীর প্রাণিজগত্। কিন্তু এইবার প্রথমবারের মতো পৃথিবীর প্রাণের মহাবিলোপ ঘটিতে যাইতেছে মনুষ্যসৃষ্ট কারণে। ইন্টারগভর্নমেন্টাল সায়েন্স-পলিসি প্ল্যাটফর্ম অন বায়োডাইভারসিটি অ্যান্ড ইকোসিস্টেম সার্ভিসেসের প্রকাশিত প্রতিবেদনে এই তথ্যই উঠিয়া আসিয়াছে। ব্যাকটেরিয়া, ফাঙ্গাস ও অ্যামিবার মতো এককোষী প্রাণীদের হিসাবের বাহিরে রাখিলে পৃথিবীতে প্রায় ৮০ লক্ষ প্রজাতির জীব-জন্তু ও উদ্ভিদ রহিয়াছে। অনেক মেরুদণ্ডী প্রজাতি থাকিলেও বিলুপ্তির শঙ্কায় থাকা প্রজাতিদের মধ্যে বেশির ভাগই অমেরুদণ্ডী। পৃথিবীতে থাকা ৮০ লক্ষ জীব-জন্তু ও উদ্ভিদের প্রজাতির মধ্যে প্রায় ৫৫ লক্ষ প্রজাতিই কীটপতঙ্গ শ্রেণির। আশঙ্কা করা হইতেছে আগামী ১০ বত্সরের মধ্যে ১০ লক্ষাধিক প্রজাতির কীটপতঙ্গের বিলুপ্তি ঘটিতে পারে। প্রায় ১৫ হাজার গবেষণাপত্রের সমন্বয়ে তৈরি ঐ প্রতিবেদনে আরো বলা হইয়াছে, পৃথিবীর ৪০ শতাংশেরও বেশি উভচর প্রাণী বিলুপ্ত হইয়া যাইবার আশঙ্কায় রহিয়াছে। এক-তৃতীয়াংশ সামুদ্রিক স্তন্যপায়ী প্রাণী, হাঙর ও কোরাল বিলুপ্ত হইবার দ্বারপ্রান্তে।

প্রযুক্তির উত্কর্ষের কারণে মানুষ নিজেকে সকল কিছুর ঊর্ধ্বে মনে করিতেছে। কিন্তু প্রযুক্তির অহমিকায় যে শেষরক্ষা হইবে না—তাহা দ্ব্যর্থহীনভাবে বলিয়াছেন অনেক বিজ্ঞানী। মৃত্যুর আগে জগদ্বিখ্যাত বিজ্ঞানী স্টিফেন হকিং একাধিকবার এই সতর্কবার্তা উচ্চারণ করিয়া গিয়াছেন। মনে রাখিতে হইবে, হাজারো শৃঙ্খলে জড়াইয়া রহিয়াছে প্রাণবৈচিত্র্য। মৌমাছি ও অন্যান্য কীট-পতঙ্গ পরাগায়ণ ঘটায় বিধায় ফসল উত্পাদন সম্ভব হয়। সুতরাং মানুষ যদি এই পৃথিবীর চলমান অসংখ্য জীবের খাদ্যশৃঙ্খল ভাঙিয়া দেয়, তবে তাসের ঘরের মতো ভাঙিয়া পড়িবে পৃথিবীর প্রাণিকুলের শৃঙ্খল। ইহাতে অনেক প্রজাতি যেমন নিশ্চিহ্নের লাল তালিকায় ঢুকিয়া পড়িবে, তেমনই একটি লাল তালিকায় ঢুকিয়া পড়িতে পারে মানবজাতিও। সুতরাং কান পাতিয়া শুনিতে হইবে মানুষের এই বিপদঘণ্টার বার্তা। ব্যবস্থা গ্রহণ করিতে হইবে তদানুযায়ী।