গ্রামের কলেজ শূন্য রেখে তদ্বিরের জোরে ঢাকায়

আপডেট : ২১ সেপ্টেম্বর ২০১৩, ২২:৪৮
ঢাকাসহ বিভাগীয় শহরের বাইরে সরকারি কলেজে শিক্ষক সংকটের কারণে ওই শিক্ষা কার্যক্রম বন্ধ হবার পথে। সংকট এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে, কোন কোন বিভাগে একজন শিক্ষকও নেই। অথচ রাজধানীর কলেজগুলোর চিত্র ঠিক উল্টো। পদের চেয়ে এখানে শিক্ষকের সংখ্যা অনেক বেশি। শিক্ষা মন্ত্রণালয় এবং মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা অধিদপ্তরের (মাউশি) কর্মকর্তারা বলছেন, শিক্ষকরা গ্রামের কলেজে থাকতে রাজি নয়। এ কারণে তারা মন্ত্রী ও এমপিদের সুপারিশ নিয়ে ঢাকার কলেজে চলে আসেন। আর মন্ত্রণালয় গ্রামের কলেজগুলোর দুরবস্থার চিত্র আমলে না নিয়ে মন্ত্রী-এমপির মন রক্ষায় ব্যস্ত থাকেন। এছাড়া মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে ঘুষ লেনদেনেরও অভিযোগ করেছেন মাউশি’র কর্মকর্তারা। গ্রামের কলেজ শূন্য করে তদ্বিরের জোরে রাজধানীর ১৩টি সরকারি কলেজে এসেছেন প্রায় পাঁচশ’ অতিরিক্ত শিক্ষক। অন্যদিকে সরকারি কলেজগুলোতে ৩ হাজার ২২৫টি পদ শূন্য রয়েছে। এই শূন্য পদগুলোর সবই গ্রামের কলেজে। ফলে দুইভাবেই গ্রামের শিক্ষার্থীরা শিক্ষক হারাচ্ছেন। এ সব কলেজে শিক্ষা কার্যক্রম হয় না বললেই চলে। একাধিক অধ্যক্ষ বলেছেন, প্রতিদিনই শিক্ষার্থীদের ক্ষোভের মুখে পড়তে হয়। শিক্ষক সংকটের কারণে ক্লাস নেয়া যাচ্ছে না। শিক্ষকরা তদ্বির করে ঢাকায় চলে যান। এখানে আমাদের কোন কিছুই করার নেই। মফস্বলের ৭৯টি সরকারি কলেজের ১৫০টি বিভাগে কোনো শিক্ষকই নেই। এরমধ্যে বেশ কয়েকটি কলেজে ইংরেজি, গণিত, রসায়ন ও পদার্থ বিজ্ঞান বিষয়ে ন্যূনতম একজন করেও শিক্ষক নেই। ফলে এক বিষয়ের শিক্ষক অন্য বিষয়ের শিক্ষার্থীদের ক্লাসে শুধু হাজিরাই নিচ্ছেন, পড়াতে পারছেন না। হাতিয়া উপজেলার ৫ লাখ লোকের জ্ঞানার্জনের একমাত্র সরকারি উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠান হাতিয়া দ্বীপ সরকারি কলেজ। কিন্তু কলেজে বর্তমানে ভয়াবহ শিক্ষক সংকটের কারণে ছাত্র-ছাত্রীদের লেখাপড়া ব্যাহত হচ্ছে। বর্তমানে কলেজের অধিকাংশ বিষয়ের কোন শিক্ষক নেই। কলেজের ৫২ জন শিক্ষকের মধ্যে কর্মরত আছেন মাত্র ১১ জন। বাংলা, অর্থনীতি, দর্শন, ব্যবসা শিক্ষা, পদার্থ বিজ্ঞান, গণিত, রসায়নসহ অনেক বিষয়েরই শিক্ষক নেই। অন্যদিকে রাজধানীর তিতুমীর কলেজ। এই কলেজের পদের বাইরে অতিরিক্ত রয়েছেন প্রায় একশ’ শিক্ষক। যদিও কলেজের পক্ষ থেকে দাবি করা হয়েছে শিক্ষার্থীর সংখ্যা বিবেচনায় এ কলেজে শিক্ষকের সংখ্যা কম। এই কলেজে ইনসিটু হিসাবে রয়েছেন ১৭ জন এবং সংযুক্তি রয়েছেন ৭৭ জন শিক্ষক। যারা এই কলেজে রয়েছেন তারা সকলেই তদ্বিরের জোরে এসেছেন বলে জানিয়েছেন মন্ত্রণালয়ের একাধিক কর্মকর্তা। মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, ঢাকা কলেজ, ইডেন, তিতুমীর, সরকারি বিজ্ঞানসহ রাজধানীর সরকারি ১৩ কলেজে পদের বাইরে শিক্ষকের সংখ্যা অন্তত পাঁচশ’। রাজধানীতে দেড় শতাধিক শিক্ষক ইনসিটু (পদোন্নতি পাবার পরও অন্য কলেজে বদলি/পদায়ন না হওয়া) হিসাবে রয়েছেন। আর ঢাকায় সংযুক্তি আছেন তিন শতাধিক শিক্ষক। অন্যদিকে দেশের বিভাগীয় শহরসহ পছন্দের কলেজে থাকার জন্য ইনসিটু হিসাবে রয়েছেন সাড়ে ছয়শ’। এর মধ্যে সহকারী অধ্যাপক ৩৪৭ জন, সহযোগী অধ্যাপক ২০৪ জন এবং অধ্যাপক ১০৪ জন। রাজধানীর কলেজগুলোতে আসার জন্য প্রতিদিনই মন্ত্রণালয়ের ডিও লেটার জমা হচ্ছে বলে সূত্র জানিয়েছে। ঢাকায় থাকতে দুটি কৌশল: রাজধানী বা বিভাগীয় শহরের কলেজগুলোতে থাকতে শিক্ষকরা দুটি কৌশল বেছে নেন। একটি ইনসিটু অন্যটি সংযুক্তি। এই দুটি নিয়ম ভালোর জন্যই তৈরি করা হলেও শিক্ষা মন্ত্রণালয় ও শিক্ষকরা এটিকে ব্যক্তি স্বার্থে ব্যবহার করছেন। প্রভাষক থেকে সহকারী অধ্যাপক, সহকারী থেকে সহযোগী আবার সহযোগী থেকে অধ্যাপক পদে পদোন্নতি পাবার পর নিয়ম অনুযায়ী তাকে অন্য কলেজে বদলি/পদায়ন হতে হয়। কিন্তু তিনি বদলি না হয়ে ওই কলেজে থেকেই সুযোগ-সুবিধা পান। এই প্রক্রিয়া ইনসিটু। এছাড়া একজন শিক্ষক একটি কলেজ থেকে মন্ত্রণালয়ে তদ্বির করে অন্য একটি কলেজে সংযুক্তি থাকেন। এই শিক্ষক মাউশির অধীনে ওএসডি হন। পরে তাকে একটি কলেজে সংযুক্তি রাখা হয়। কোন কলেজে শিক্ষক সংকট থাকলে অন্য কলেজ থেকে সংযুক্তি করে নিয়ে আসার এই ভাল উদ্যোগটির এখন অপব্যবহার হচ্ছে। পছন্দের কলেজে আসার জন্য ‘সংযুক্তি’ সুবিধাটি নিচ্ছেন। মাউশিকে না জানিয়েই: দেশের সরকারি কলেজগুলোর দেখভাল করার প্রধান দায়িত্ব মাউশি’র। কোন কলেজে শিক্ষকের কতটি পদ শূন্য রয়েছে এ সম্পর্কে তথ্য থাকে মাউশির কাছে। কিন্তু শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে মাউশির কোন পরামর্শ বা মাউশিকে না জানিয়েই অযৌক্তিকভাবে এসব কাজ করে থাকে। গ্রামের কোন কলেজের একটি বিভাগে একজন শিক্ষক থাকলে তাকেও তদ্বিরের জোরে ঢাকায় নিয়ে আসে শিক্ষা মন্ত্রণালয়। ফলে বিপাকে পড়ে ওই কলেজের শিক্ষার্থীরা। অন্যদিকে মন্ত্রণালয়ের প্রতিটি পদোন্নতি, বদলি, ইনসিটু, সংযুক্তি সকল অফিস আদেশ শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের ওয়েবসাইটে দেয়া হলেও গত ২০ আগস্টের পর ওয়েবসাইটে কোন তথ্য দেয়া হচ্ছে না। এ বিষয়ে মন্ত্রণালয়ের একটি সূত্র জানিয়েছে, মন্ত্রণালয় বিষয়টি প্রচার করতে চাইছে না। বিষয়টি এক প্রকার গোপন রাখতে চাইছে। তিন হাজার শিক্ষকের পদ শূন্য: মাউশি’র তথ্য অনুযায়ী কলেজে প্রভাষকের ৭ হাজার ৪শ’ ৮০ পদের মধ্যে ২ হাজার ৬০৫টি, সহকারী অধ্যাপক ৮ হাজার ৯২টির মধ্যে ৩৭৬টি, সহযোগী অধ্যাপক ২ হাজার ৩৫৩টির মধ্যে ১৯৩টি এবং অধ্যাপকের ৭৯৭টি পদের মধ্যে ৫১টি পদসহ মোট ৩ হাজার ২২৫টি পদ শূন্য রয়েছে। ফলে এই শূন্য পদগুলো সবই গ্রামের কলেজগুলোতে। সার্বিক বিষয়ে মাউশি’র মহাপরিচালক অধ্যাপক ফাহিমা খাতুন বলেন, ‘অনেক শিক্ষকের পদ শূন্য রয়েছে। আবার প্রতিনিয়ত শিক্ষকরা সংযুক্তি হয়ে ঢাকা আসছেন। গ্রামের কলেজগুলোতে শিক্ষা কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে।’