গার্মেন্টস শ্রমিক মহাসমাবেশে শাজাহান খান

নারী শ্রমিকদের নিয়ে হেফাজতের বক্তব্য দেশবাসী প্রত্যাখ্যান করেছে

আপডেট : ২১ সেপ্টেম্বর ২০১৩, ২২:৫২
নারী শ্রমিকদের নিয়ে হেফাজতের প্রধান মাওনালা আল্লামা শফির বক্তব্য দেশবাসী প্রত্যাখ্যান করেছেন বলে জানিয়েছেন শ্রমিক নেতা নৌ পরিবহন মন্ত্রী শাজাহান খান। মহাসমাবেশে শাজাহান খান বলেন, হেফাজতের আমীর আল্লামা শফি যে ভাষায় গার্মেন্টস শ্রমিকদের নিয়ে কথা বলেছেন তা মানা যায় না। তিনি নারীদের নিয়ে যে কটূক্তি করেছেন তা সকলেই প্রত্যাখ্যান করেছেন। বাংলার মা বোনেরা এই বক্তব্য মানতে পারবে না। শনিবার সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে গার্মেন্টস শ্রমিক সমন্বয় ঐক্য পরিষদ আয়োজিত এক মহাসমাবেশে তিনি একথা বলেন। বিকালে জাতীয় সঙ্গীত পরিবেশনের মধ্য দিয়ে এই মহাসমাবেশ শুরু হয়। জিএসপি সুবিধা পুনর্বহাল, গার্মেন্টস কারখানা ভাঙচুর বন্ধ, ন্যূনতম মজুরি নির্ধারণসহ বিভিন্ন দাবি নিয়ে এই সমাবেশের আয়োজন করে ঐক্য পরিষদ। বৃষ্টি ও রোদ উপেক্ষা করেই শ্রমিকরা সমাবেশকে সফল করে তোলে। সমাবেশে বক্তৃতার ফাঁকে নকুলের গান পরিবেশন করা হয়। সমাবেশে শাজাহান খান শ্রমিকদের ন্যূনতম মজুরি আট হাজার ১১৪ টাকা করার দাবি জানিয়ে বলেন, শ্রমিকরা কখনো গার্মেন্টস এ আগুন দিতে পারে না। তারা কোন সহিংস ঘটনায় জড়িত হয় না। শ্রমিকরা নানা আক্রমণের শিকার হচ্ছে। শ্রমিকরা মালিকদের প্রতিপক্ষ নয়। সবাই একই পরিবারের সদস্য। নির্দিষ্ট একটি গোষ্ঠি ভাঙচুর করে পরিস্থিতি নষ্ট করতে চাইছে। তিনি বলেন, ন্যায্য মজুরি থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। কথায় কথায় বাড়ি ভাড়া বাড়ানো হচ্ছে। বিভিন্ন নির্যাতনে জীবন দিতে হচ্ছে। ষড়যন্ত্রকারী, চক্রান্তকারীদের অপপ্রচারে জিএসপি সুবিধা বাতিল হয়েছে। এতে শ্রমিকসহ দেশ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। তিনি গামেন্টস্ মালিকদের বলেন, আপনারা শ্রমিকদের নিজের সন্তানের মত মনে করেন। নিজ সন্তানের যেমন চাহিদা মেটান, তেমনই শ্রমিকদেরও শুধু ন্যূনতম চাহিদা টুকু মেটান। তাদের ন্যায্য মজুরি দিন। তিনি বলেন, প্রত্যেক শ্রমিককে ন্যূনতম আট হাজার ১১৪ টাকা মজুরি দাবি করা হয়েছিল। কিন্তু মালিকরা বর্তমান ৩ হাজার টাকার সাথে আরো ৬০০ টাকা বাড়াতে ইচ্ছুক। এটা হতে পারে না। ন্যূনতম চাহিদা মেটাতে যত টাকা প্রয়োজন সেই টাকা মজুরি হিসেবে দিতে হবে। দরকষাকষির মাধ্যমে ন্যূনতম মজুরি ঠিক করতে হবে। তিনি বলেন, দীর্ঘদিন পর ১৯৮৪ সালে মজুরি বাড়ানো হয়েছিল। সে সময় সাড়ে সাত ভাগ বাড়ানো হয়েছিল। এরপর ২০০৬ সালে সোয়া তিন শতাংশ মজুরি বাড়ানো হয়। পরে ২০১০ সালে এক হাজার ৬৩১ টাকা থেকে বাড়িয়ে তিন হাজার ২০০ টাকা করা হয়েছিল। শাজাহান খান বলেন, যুদ্ধাপরাধীদের বিচার করতে হবে। ১৯৭১ সালের খুনিরা আবার মাঠে নেমেছে। তাদের রুখতে হবে। মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে বাস্তবায়ন করতে হবে। মুক্তিযুদ্ধে নারীরা সম্ভ্রম দিয়েছে। পুরুষের সাথে যুদ্ধ করেছে। দেশ স্বাধীন করতে তাদের অবদান অন্যদের মতই। নারীরা দেশের উন্নয়নে অগ্রণী ভূমিকা রাখছে। নারী না থাকলে দেশের উন্নয়ন বন্ধ হয়ে যাবে। সমাবেশে কর্মজীবী নারীর সভানেত্রী শিরীন আখতার বলেন, দেশের উন্নয়নে যে খাত প্রধান ভূমিকা রাখছে সেটি গার্মেন্টস খাত। আর এই উন্নয়নের চাবিকাঠি শ্রমিকরা। গার্মেন্টস শিল্পে ৮০ ভাগ নারী শ্রমিক কাজ করছে। এই নারীদের অসম্মান করেছে হেফাজত ইসলাম। নারীদের নিয়ে তিনি হেফাজত ইসলামের প্রধানের বক্তব্যের তীব্র সমালোচনা করেন। তিনি বলেন, পুরুষরা আমাদের ভাই, বাবা, সহকর্মী। হেফাজতের প্রধানের বক্তব্য সকল নারী শ্রমিক প্রত্যাখান করেছে। বিরোধী দলীয় নেতা খালেদা জিয়ার আশ্রয়ে হেফাজতের নেতারা এই কাজ করছে। শ্রমিকদের দাবির প্রতি সমর্থন জানিয়ে তিনি বলেন, এই শ্রমিকরা যদি কাজ না করতো তবে বাংলাদেশের উন্নয়ন হতো না। তিনি প্রধানমন্ত্রীকে শ্রমিকদের পাশে দাঁড়ানোর অনুরোধ জানান। সড়ক পরিবহন শ্রমিক ফেডারেশনের সাধারণ সম্পাদক ওসমান আলী বলেন, গার্মেন্টস শ্রমিক আর পরিবহন শ্রমিকের মধ্যে কোন ভেদাভেদ নেই। আমরাও চাই গার্মেন্টস শ্রমিকদের দাবি আদায় হোক। গার্মেন্টস শ্রমিকদের উদ্দেশ্যে তিনি বলেন, দাবি আদায় রাস্তায় নেমে গাড়ি ভাঙচুরের প্রয়োজন নেই। আমরা সড়ক পরিবহনের শ্রমিকরা গাড়ি বন্ধ রেখে আপনাদের দাবি আদায় করে দেব। তিনি বলেন, একের পর এক সরকার পরিবর্তন হচ্ছে কিন্তু গার্মেন্টস শ্রমিকদের ভাগ্য পরিবর্তন হচ্ছে না। শ্রমিক নেতা কায়সার আহমেদ বলেন, নানা অত্যাচার নির্যাতনের মধ্য দিয়ে শ্রমিকদের গার্মেন্টসে কাজ করতে হয়। এই শ্রমিকদের সব ধরনের সুযোগ সুবিধা থেকে বঞ্চিত করা হচ্ছে এমন অভিযোগ করে তিনি বলেন, শ্রমিকদের সব সুযোগ সুবিধা আদায় করে দিতে হবে। আল হাদিসের উল্লেখ করে তিনি বলেন, নারী ও পুরুষ একে অন্যের রক্ষাকারী। ফলে পুরুষরা যেমন নারীদের রক্ষা করবে তেমনই নারীরাও পুরুষদের রক্ষা করবে। তারা একে অন্যের সাথে কাজ করবে। এ জেড কামরুল আনাম বলেন, গার্মেন্টস শ্রমিকরা ঐক্যবদ্ধ না হলে কখনো দাবি আদায় করা সম্ভব হবে না। শ্রমিকরা রফতানি আয়ের ৭৭ ভাগ অবদান রাখছে। অথচ এই শ্রমিকদেরই বঞ্চিত করে রাখা হয়েছে। গার্মেন্টস শ্রমিকরা যে বেতন পান তা দিয়ে তাদের চলে না। এত কম মজুরি দেয়া হয় যে, তারা ঠিক মতো খেতে পায় না। সুস্থভাবে বেঁচে থাকতে হলে যে টাকার প্রয়োজন, তা দেয়ার জন্য মালিকদের কাছে দাবি জানান তিনি। শ্রমিক নেতা আবুল হোসেন বলেন, মালিকদের প্রস্তাবিত ৩ হাজার ৬০০ টাকার মজুরি প্রত্যাখান করছি। আমরা বাঁচার মতো বাঁচতে চাই। কথায় কথায় শ্রমিক ছাঁটাই হচ্ছে এমন অভিযোগ করে তিনি বলেন, শ্রমিকদের ওপর হামলা-মামলা করা যাবে না। শিরিন শামীমা আদায়ে সবাইকে ঐক্যবদ্ধ থাকার আহবান জানান। শামীমা নাসরিন বলেন, এই সমাবেশ হেফাজতের বিরুদ্ধে। হেফাজত ইসলাম নারীদের তিরস্কার করেছে। বাড়ি ভাড়া বৃদ্ধি না করার জন্য তিনি বাড়ি মালিকদের প্রতি অনুরোধ জানান। সমাবেশ শুরুর আগে সকাল থেকে দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে শ্রমিকরা সমাবেশ স্থলে জড়ো হন। সমাবেশে ইসলামী ঐক্যজোটের মহাসচিব মাওলানা মনিরুজ্জামান রব্বানী বলেন, কথিত ইসলামী সংগঠন হেফাজতের আমীর নারীদের বিরুদ্ধে কথা বলে কোরআন ও হাদিসের অবমাননা করেন। সমাবেশে ঘোষণা পত্র পাঠ করেন সংগঠনের সদস্য সচিব বদরুদোজ্জা নিজাম।