সফলতা আপনাআপনি হাতের মুঠোয় আবদ্ধ হয় না। আবদ্ধ করতে হয়। সময়ের সঠিক ব্যবহার, অনুশীলন, স্থির লক্ষ্য আর দৃঢ় প্রতিজ্ঞা নিয়ে সফলতা পায়নি এমন নজির পৃথিবীতে দু’এক বৈ বেশি খুঁজে পাওয়া দুষ্কর। সময়ের নিয়মতান্ত্রিক ব্যবহার আর দৃঢ় প্রতিজ্ঞায় জীবন পথে সফলতার সন্ধান পাওয়া এমন একজনের সাথে আজ আমরা কথা বলবো যার পরিশ্রম, দৃষ্টিভঙ্গি ও একাগ্রতাই তাকে এনে দিয়েছে প্রতিষ্ঠা।
জান্নাত আরা ২০০৩ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ‘ইন্টারন্যাশনাল রিলেশনশীপ’ ডিপার্টমেন্ট থেকে অনার্স মাস্টার্স সম্পন্ন করে নিজের মেধা ও মননকে কাজে লাগাবার লক্ষ্যে ঐ বছরই বেক্সিমকো লিঃ-এ যোগদান করেন অ্যাডমিনিসট্রেশন অফিসার পদে। যোগ্যতা ও দক্ষতার সাথে তিন বছর দায়িত্ব পালন করার পর জান্নাত আরা যোগ দেন ‘অতিশ দীপঙ্কর’ বিশ্ববিদ্যালয়ের হিউম্যান রিসোর্স বিভাগে অফিসার পদে। প্রশাসনিক বিভাগের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব সামলিয়ে এখানেও তিনি দক্ষতার সাথে কাজ করেন দুই বছর। ইচ্ছা থাকলে উপায় হয়, দৃঢ় প্রতিজ্ঞা বিফল হবার নয়- চাকরির ব্যস্ততা থাকলেও এমবিএ’র স্বপ্ন পিছু ছাড়ে না জান্নাত আরাকে।
২০০৯-এ এমবিএ সম্পন্ন করেন নিজের চাকরিস্থল অতিশ দীপঙ্কর বিশ্ববিদ্যালয় থেকে। এমবিএ করে এ বছরই আবার যোগ দেন ইউএনডিপি’তে। এখানেও কাজ, দায়িত্ব, নিজের কর্তব্য পালন করেন বিচক্ষণতার সাথে। ইউএনডিপি’তে প্রায় এক বছর কাজ করার পর ২০০৯-এর শেষ দিকে জান্নাত আরা জয়েন করেন সিটি ব্যাংক (এন.এ) এ সিনিয়র অফিসার হিসেবে। কর্মদক্ষতা, মনোনিবেশতা, কাজের প্রতি দায়িত্বশীলতা, পেশার প্রতি সম্মানবোধ্যতা প্রতিফল দিয়েছে জান্নাত আরাকে। নিজের যোগ্যতায় নিষ্ঠায় পরিশ্রমে তিনি উত্তরণ ঘটিয়েছেন নিজের। ২০০৯ থেকে অদ্যবধি এখানেই কর্মরত আছেন তিনি। এ অধ্যবসায়ী এখন কাজ করছেন অ্যাডমিনিসট্রেটিভ কো-অর্ডিনেটর (ট্রানজেকশন ব্যাংকিং) হিসেবে।
প্রতিষ্ঠাই শেষ কথা নয়। এখনও প্রতি মুহূর্তেই জান্নাত আরা প্রতিযোগিতা করছেন নিজের সাথে, নিজের কাজের সাথে। প্রতিদিনই নিজের কাজের দক্ষতাকে বাড়াতে কোনো না কোনোভাবে উত্তরণ ঘটান নিজের মেধার, ধৈর্যের, দক্ষতার। কর্তব্যে সচেতন, কাজে নিষ্ঠাবান, পরিশ্রমী জান্নাত আরা অফিস করেন অফিসিয়াল নিয়মেই ১০-৬টা। তবে কাজের প্রয়োজনে এ হিসাব তার কাছে বাড় বাদ্য হয়ে বাজে না। প্রয়োজনে দ্বিধা না করে সাবলীলভাবেই কখনো কখনো কঠোর পরিশ্রম বা অফিসিয়াল সময়ের অধিক সময় কাজ করতে এতটুকু দ্বিমত করেন না নিজের সাথে। অতিরিক্ত কাজের কথা বললে জান্নাত আরা সাবলীলভাবে বলেন, ‘যে কাজ ভালো লাগে বা যে কাজে আপনি উত্ফুল্লতা পাবেন তা দুই চার-ঘণ্টা কেন ঘণ্টার পর ঘণ্টা করে গেলেও এতটুকু টের পাবেন না। আমার কাজ আমার ভালো লাগে। যখন যে কাজ করি সে কাজ তৃপ্তি নিয়ে করি, আর তৃপ্তি পাই বলেই কাজে পাই আনন্দ। সবচেয়ে বড় কথা হলো, পেশাদার কাজে সময়টাকে অত বিবেচনা করলে পেশাদারিত্ব থাকে না। কিছু করতে হলে অধিক সময় ব্যয় করতেই হবে। কাজ বড়, সময় বিবেচ্য না।’
পেশাগত জীবনে প্রবেশের আগে পড়াশোনা অবস্থায় জান্নাত আরা চাকরির জন্য যেমন নিয়মিত অধ্যবসায় করেছেন তেমনি এখনো পড়াশোনা বা একটা অধ্যবসায়ের মধ্যেই পার করেন দিনের কিছুটা হলেও সময়। সাধ্য-সাধনার যোগে সূর্য রশ্মি ফলায়! তিনি বলেন, একটা চাকরি হয়ে যাওয়া মানেই সব হিসাব মিলে যাওয়া এমনটা চিন্তা করা সমীচীন নয়। আসলে চাকরিতে ঢোকার পরই আসল দায়িত্ব শুরু হয়। সে অনুযায়ী প্রত্যেককে কাজ করতে হয়। এখানে পড়াশোনাটা হয়তো একটু ভিন্ন ট্রেকের কিন্তু একটা পড়াশোনা, ট্রেনিং, কোর্স ইত্যাদির মধ্য দিয়েই এগিয়ে চলতে হয়। যে যত পড়াশোনা করবে, প্রতিজ্ঞ থাকবে নিজের সাথে তার জন্য ততই ফলদায়ক হবে পথ চলা।
সরকারি চাকরি বা বিসিএস প্রসঙ্গ আসলে তিনি বলেন, ‘সবাইকে যে সরকারি চাকরি করতে হবে এমন কোনো কথা নেই। বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা করা অবস্থাই আমার ইচ্ছে ছিল বেসরকারি চাকরি করবো। বিশেষভাবে ব্যাংকিং সেক্টরের প্রতি একটা টান ছিল।’ কেন? ‘ব্যাংকিং-এ একটা চ্যালেঞ্জিং বিষয় আছে। তাছাড়া কাজের ক্ষেত্র, পরিবেশ, সম্মান সব মিলিয়ে মনে হয়েছে আমার জন্য সঠিক। তাই ব্যাংকিং সেক্টর আমার আগে থেকেই পছন্দ ছিল, এখন আমি আমার পছন্দের কাজ করছি; ভালো লাগছে।’
নারী হিসেবে কাজের পরিবেশ বলতে জান্নাত আরা বলেন, ‘গৃহ বা বাহির যেখানেই বলেন না কেন একটা অনুকূল আর প্রতিকূল শব্দ এর সাথে জড়িয়ে থাকবেই। এটা বেগম রোকেয়া সাখাওয়াত এর সময়েও ছিল, সুফিয়া কামালের সময়ও ছিল, জাহানারা ঈমামের সময়ও ছিল, আজ আমাদের সময়েও আছে। স্থান কাল পাত্রকে নিজের যোগ্যতা দিয়ে জয় করে নিতে হবে। তারপরও পারিপার্শ্বিকতা কথাটি যদি ধরি তবে বলব, সময় অনেক এগিয়েছে। এখন আর ছেলে বা মেয়ে বলে কোনো কথা নেই কি ঘরে কি বাহিরে কিংবা কর্মপরিসরে। সবাই যেমন স্বাধীন তেমনি সবাই সমান। ছেলে বা মেয়ে সে যে’ই হোক কাজের পরিবেশ তাকে মানিয়ে নিতে হবে অতঃপর সে পরিবেশে নিজের দক্ষতার স্বাক্ষর রাখতে হবে। কাজ ও কাজের দক্ষতাই এগিয়ে নিবে যে কাউকে।
এসময়ের তরুণদের প্রতি জান্নাত আরার কথা, সবার আগে নিজের পথ ঠিক করতে হবে যে সে কি করতে বা কি হতে চায় অথবা আজ থেকে ২ ৪ ৬ বছর পর সে নিজেকে কোন জায়গায় দেখতে চায়। বিশেষ করে প্রত্যেককে পড়াশোনা করা অবস্থাই ঠিক করতে হবে সে ভবিষ্যতে কি করবে। সেই পরিকল্পনা অনুযায়ী তাকে একটু একটু করে এগুতে হবে। একাডেমিক পড়াশোনার পাশাপাশি চাকরির জন্যও প্রস্তুতি নিতে হবে। যে বিসিএস দিতে চায় তাকে বিসিএস-এর জন্য যে পড়াশোনার লাইন-আপ সে পথেই এগুতে হবে আর যে করপোরেট লেভেলে আসতে চায় তাকে সে মাফিক মনোপ্রস্তুতি নিতে হবে, শিক্ষাক্ষেত্রে ক্যারিয়ার গড়তে চাইলে অথবা যে ব্যাংকিং সেক্টরে কাজ করতে আগ্রহী তাকে এ বিষয়ে সমৃদ্ধ হতে হবে। মোদ্দাকথা, নিজের কাজে নিজেকে প্রতিজ্ঞ রাখতে হবে এবং লক্ষ্যপথে এগুতে হবে একটু একটু করে।
পরিবারের প্রতি জান্নাত আরো বলতে চান, মেয়েদের সুযোগ দিতে হবে। এখনো অনেক পরিবার আছে যেখানে মেয়েদেরকে অবলা ধরে নেয়া হয়। ভাবা হয় সে সব ক্ষেত্রে কাজ করতে পারবে না বা করা উচিত নয়। কিন্তু সে সময় অতীত, সময় এগিয়েছে। মেয়েরাও এগিয়েছে। তারা সুযোগ পেলে পারে। সুযোগ বলতে সুবিধা তা নয়! চলার, মতের, ইচ্ছার স্বাধীনতা দিলে মেয়েরাও সব কর্মপরিসরে দক্ষতার সাথে কাজ করতে পারে। তাদেরকে চাপিয়ে না রেখে তাদের যোগ্যতার স্বাক্ষর রাখার স্বাধীনতা দিলে তারা তার প্রমাণ রাখতে পারে এবং পারবে আরো বিস্তৃতভাবে। তাছাড়া, অনেক ক্ষেত্রে মেয়েরা ছেলেদের চেয়ে অনেক বেশি পরিবারের প্রতি দায়িত্ব প্রবণ হয়, অনেক বেশি কন্ট্রিবিউশন করতে পারে। লিঙ্গান্তর নয়, মানুষ হিসেবে স্বাধীনতা প্রয়োজন। ‘পৃথিবীতে যা কল্যাণকর অর্ধেক তার আনিয়াছে নারী, অর্ধেক তার নর।’ ছেলে বা মেয়ে তা নয় পরিবার বুঝবে সন্তান, সন্তান সুযোগ আর সহযোগিতা পাবে সমান, এটা জান্া্নত আরার প্রত্যাশা।
ছবি: বাপ্পি আখন্দ
