ন্যূনতম মজুরি আট হাজার টাকা নির্ধারণের দাবিতে গতকাল রবিবার টঙ্গী, কালিয়াকৈরসহ গাজীপুরের বিভিন্ন এলাকার শত শত গার্মেন্টস শ্রমিক কাজে যোগ না দিয়ে রাস্তায় নেমে আসে। তারা সড়ক অবরোধ করে বিক্ষোভ করতে থাকে এবং বেশ কয়েকটি কারখানা ভবন ও যানবাহনে ভাংচুর চালায়। এসময় পুলিশ লাঠিচার্জ করলে দু’পক্ষের মধ্যে সংঘর্ষ বেধে যায়। এতে শ্রমিক-পুলিশসহ শতাধিক ব্যক্তি আহত হয়েছেন। ক্ষয়ক্ষতি এড়াতে দুপুরের পর অধিকাংশ কারখানায় ছুটি ঘোষণা করে কর্তৃপক্ষ।
টঙ্গী সংবাদদাতা জানান, দুপুরের দিকে টঙ্গী বাজার সেনাকল্যাণ কমার্শিয়াল কমপ্লেক্সে অবস্থিত এবা ফ্যাশন, পাগাড় ও বিসিক এলাকার জাবের এন্ড জোবায়ের ফেব্রিক্স, অনন্ত, শিশির, উইন্ডি, হামদিল ফ্যাশন ও হামীম গ্রুপের একটি কারখানায় ব্যাপক ভাংচুর চালায় শ্রমিকরা। এক পর্যায়ে তারা টঙ্গী স্টেশন-পাগাড় রোডে টায়ার জ্বালিয়ে অবরোধ সৃষ্টি করে। খবর পেয়ে টঙ্গী মডেল থানা ও শিল্প পুলিশের সদস্যরা ঘটনাস্থলে গিয়ে শ্রমিকদের বাধা দিলে তারা আরও উত্তেজিত হয়ে উঠে। পুলিশকে লক্ষ্য করে ইটপাটকেল নিক্ষেপ করতে থাকে। এক পর্যায়ে পুলিশের সাথে সংঘর্ষে লিপ্ত হয়। এসময় পুলিশ দেড়শতাধিক রাউন্ড শর্টগানের গুলি ও কাঁদানে গ্যাস ছুঁড়ে। সংঘর্ষে ২০ পুলিশ সদস্য ও অর্ধশতাধিক শ্রমিক আহত হয়েছে বলে জানা গেছে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে সংশ্লিষ্ট এলাকায় প্রায় তিন শতাধিক পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে।
টঙ্গী মডেল থানার অফিসার্স ইনচার্জ মো. আবুল কালাম আজাদ বলেন, হাজার হাজার শ্রমিক একসাথে রাস্তায় বের হওয়ায় কিছুসময় এলাকাটি অবরুদ্ধ হয়ে পড়ে। তবে বর্তমানে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রয়েছে।
পুলিশ ও স্থানীয় সূত্রের বরাত দিয়ে আমাদের গাজীপুর প্রতিনিধি জানান, সকাল ৯টার দিকে মজুরি বাড়ানোর দাবিতে গাজীপুর ধান গবেষণা ইন্সটিটিউট সংলগ্ন তিন সড়ক এলাকায় ইন্টারমেক্স গ্রুপ, স্প্যারো এ্যাপারেল, এএসটি নীট ওয়্যার লি. বাইপেড সোয়েটার ও ইন্টার্ন ক্রাফট সোয়েটার কারখানার শ্রমিকরা অবরোধ শুরু করে। এসময় তারা বিভিন্ন কারখানা ভবনের কাঁচ ভাংচুর এবং নিরাপত্তা কর্মীদের মারধর করে। এক পর্যায়ে ঢাকা-গাজীপুর সড়কে অবস্থান নিয়ে যানবাহন ভাংচুর শুরু করলে পুলিশ এসে লাঠিচার্জ করে শ্রমিকদের সড়ক থেকে সরিয়ে দেয়।
দুপুরে কোনাবাড়ি এলাকায় যমুনা নীট গার্মেন্টসের শ্রমিকরা বেতন বৃদ্ধির দাবিতে বিক্ষোভ করেছে। তারা কারখানার ফেব্রিক্স গুদামে আগুন ধরিয়ে দেয়। এতে গুদামে থাকা কাপড়ের ২০ থেকে ২৫টি রোল পুড়ে যায়। বিকালে গাজীপুর মহানগরের নাওজোর এলাকার দিগন্ত সোয়েটার কারখানা ও আশপাশের এলাকার কয়েকটি গার্মেন্টসের শ্রমিকরা একই দাবিতে কর্মবিরতি করেছে। এক পর্যায়ে তারা রাস্তায় নেমে সড়ক অবরোধের চেষ্টা করলে পুলিশ লাঠিচার্জ করে ছত্রভঙ্গ করে দেয়। এছাড়া চন্দ্রা এলাকায় স্থানীয় নায়েগ্রা টেক্সটাইল কারখানার শ্রমিকরা গতকাল কর্মবিরতি ও বিক্ষোভ করে।
কালিয়াকৈর সংবাদদাতা জানান, ন্যূনতম মজুরি ৮ হাজার টাকার দাবিতে পল্লীবিদ্যুত্, চন্দ্রা ও সফিপুর এলাকার পোশাক কারখানার শ্রমিকরা সকালে প্রায় দেড় ঘন্টা ঢাকা-টাঙ্গাইল মহাসড়ক অবরোধ করে রাখে। এসময় তারা সড়কের পাশের গোমতি টেক্সটাইল, ইকোটেক্স লিমিটেড, এপেক্স গার্মেন্টসসহ বেশ কিছু কারখানা ও যানবাহন ভাংচুর করে। এতে মহাসড়কের উভয় পাশে যান চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। পরে পুলিশ শ্রমিকদের ছত্রভঙ্গ করতে সাঁজোয়া যান থেকে রাবার বুলেট ও টিয়ারশেল নিক্ষেপ করে। এতে ২০-২৫ জন আহত হয়। এক পর্যায়ে শ্রমিকরা মহাসড়ক থেকে সরে গেলে বেলা ১১ টায় মহাসড়কে যান চলাচল স্বাভাবিক হয়।
গাজীপুর শিল্প পুলিশের সিনিয়র এ.এস.পি সামছুর রহমান সামস ঘটনার সত্যতা স্বীকার করে জানান, এ ঘটনার পর এলাকার অধিকাংশ কারখানায় ছুটি ঘোষণা করা হয়েছে।
উত্তরায় শ্রমিকদের বিক্ষোভ : বেতন বৃদ্ধির দাবিতে রাজধানীর উত্তরায় দফায় দফায় বিক্ষোভ করেছে তৈরী পোশাক শ্রমিকরা। এ সময়ে কয়েকটি গার্মেন্টস কারখানায় বিক্ষুব্ধ শ্রমিকরা হামলা চালালে পুলিশ তাদের লাঠিচার্জ করে হটিয়ে দেয়।
উত্তরা পশ্চিম থানার ওসি খন্দকার রেজাউল হাসান জানান, রবিবার সকাল থেকেই স্থানীয় কয়েকটি গার্মেন্টসের কর্মীরা বিভিন্ন অলিগলিতে জড়ো হতে থাকে। একপর্যায়ে সকাল ৮টার দিকে শ্রমিকরা বিভিন্ন সড়কে বিক্ষোভ শুরু করে এবং কয়েকটি তৈরী পোশাক কারখানা লক্ষ্য করে ইট পাটকেল নিক্ষেপ করে। এ সময় পুলিশ বাধা দিলে কথা কাটাকাটির এক পর্যায়ে বিক্ষোভকারীদের সঙ্গে পুলিশের ধাওয়া, পাল্টা ধাওয়ার ঘটনা ঘটে। তবে এ সময় ঢাকা-ময়মনসিংহ সড়কে যানবাহন চলাচলে কোন বিঘ্ন ঘটেনি। শ্রমিকরা থেমে থেমে শান্তিপূর্ণভাবে মিছিল করে।
এদিকে দক্ষিণখান থানার ওসি আবদুল আলিম জানান, বেলা সাড়ে ১২টার দিকে বিক্ষুব্ধ শ্রমিকরা মিছিল নিয়ে উত্তরা থানা এলাকা থেকে দক্ষিণখান থানা এলাকার দিকে রওনা হয়। সেখানে কোনো বিশৃঙ্খল হয়নি।
