আমার কথা

মহসিন হোসাইন

আপডেট : ২৪ সেপ্টেম্বর ২০১৩, ১৮:৩৯
নড়াইল জেলার কালিয়া একটি বিশ্ববিখ্যাত গ্রাম। এখানে জন্মগ্রহণ করেছিলেন নৃত্য শিল্পী উদয় শঙ্কর, সেতার বাদক, রবি শঙ্কর, সুরকার কমল দাশগুপ্তসহ আরো আরো গুণী মানুষ। এরই একেবারে পূর্ব পাশের গ্রাম কলাবাড়িয়া। এই কলাবাড়িয়া খুব প্রাচীন জনপদ। প্রাচীন কেলাবাড়ি বা আধুনিক কলাবাড়িয়া গ্রামের দশআনি মধ্যপাড়ায় ১৩৬১ সালের ২১ বৈশাখ মঙ্গলবার দুপুর বেলায় আমি ভূমিষ্ঠ হয়েছিলাম। ১৯৫৪ সালের ৪ মে। আমার পিতা আ. রাজ্জাক মিয়া ও মা শাহেদা খানম। পিতা আ. রাজ্জাক মিয়া কবিতা রচনায় ছিলেন কিছুটা মনোযোগী। লেখাপড়া শিখেছি মায়ের কাছে। আমার মা ভালো লেখাপড়া জানতেন। মায়ের তত্ত্বাবধানেই তালপাতায় লেখা শুরু করেছিলাম। সাহিত্যের প্রতি অনুরাগ আমি আমার মায়ের কাছ থেকেই পেয়েছিলাম। মদনমোহন তর্কালঙ্কারের ছড়াগুলো মা নির্বিঘ্নে পাঠ করতে পারতেন। আমি তার কাছ থেকে অনেক ছড়া শিখেছি যা আজও মনে আছে। ১৯৬৫ সালে আমি যখন কলাবাড়িয়া মডেল প্রাইমারি স্কুলের ৫ম শ্রেণির ছাত্র তখন বাবার একটি কবিতা শুনে (তিনি পাঠ করে শুনিয়ে ছিলেন) একটি ছড়া-কবিতা লিখে ফেলি। তার প্রথম লাইন ছিলো ‘যুদ্ধতে ভাই সাইরেন বাজে তোরা সবেচল’। এইভাবে আমার ছড়া বা শিশু সাহিত্য রচনা শুরু হয়। ১৯৭০-১৯৭১ সালে প্রচুর ছড়া বা শিশু সাহিত্য রচনা করি। সেকালে খুলনা মহানগরীতে সাপ্তাহিক ও স্বাধীকার’ নামে একটি পত্রিকা ছিলো। ১৯৭১ সালের ফেব্রুয়ারি সংখ্যায় আমার একটি ছড়াপদ্য প্রকাশ পায়। ছাপার অক্ষরে আমার নাম সেই প্রথম দেখতে পেলাম— সে সময়ে আনন্দে এমন আত্মহারা হয়ে উঠি যে, কয়েক রাত ঘুমাতে পারিনি। শিশু সাহিত্যের সঙ্গে এই আমার সরাসরি যোগাযোগ সৃষ্টি হলো। তখন আমি এসএসসি পরীক্ষা দেয়ার জন্য প্রস্তুতি নিতেছি। সে যুগে অর্থাত্ কলাবাড়িয়া উচ্চ বিদ্যালয়ে অধ্যায়নকালে আমার পিতা আ. রাজ্জাক মিয়া, আমার ফুফো ও স্কুলের শিক্ষক এসএম মকিদুর রহমান, বাবার বন্ধু ও ক্লাসের পন্ডিত মশাই অটল চন্দ্র চৌধুরি এবং শিক্ষক নিরদ চন্দ্র চৌধুরি আমার ছড়া-কবিতা আমার মুখে শুনেছেন ও খুব উত্সাহিত করেছেন। ১৯৬৭ সালে সেই ছোটবেলায় আমি গান রচনা করি আর আমার সেই গানের সুর করেছিলো আমার একান্তজন জাহাঙ্গির আলম ভুঁইয়া। আমার এই বন্ধুসহ সহপাঠী জালাল ফকির, মোস্তাইন বিল্লাহ, মতিয়ার রহমান আমার সাহিত্য রচনায় আন্তরিকভাবে উত্সাহিত করেছিলো। তারা আমার রচনা নিয়ে খুব আশাবাদী ছিলেন। আমি অনেক বড় হবো এই কামনা করতো। ঢাকার পত্র-পত্রিকায় লেখা প্রকাশের আগেই আমি খুলনা, যশোর, ভারতের কলকাতা, ২৪ পরগনা, বর্ধমান, মেদিনীপুর ও নদীয়ার বহু ছোট ও বড় কাগজে লেখা প্রকাশের সুযোগ পাই। উল্লেখিত এলাকার শিশু সাহিত্যিকদের কাছে আমার ব্যাপক পরিচিতি লাভ হয়। সেই পুরানো দিনের সম্পর্কের রেশ ধরে অনেকেই আজও যোগাযোগ রাখেন। তবে ঢাকায় আসার পরে দৈনিক ইত্তেফাকের কচি-কাঁচার আসরে লেখার সুযোগ পাই— এখান থেকে আমার ছড়া-পদ্য প্রকাশ পায়। আমি যখন এসএসসি পরীক্ষা দেয়ার প্রস্তুতি নিতে ছিলাম ১৯৭১ সাল, আমাদের মুক্তিযুদ্ধের বছর। নানা পথ-বিপথ পেরিয়ে আমি ভারতের ৫ নম্বর টালিখোলা ক্যাম্পে অবস্থান করি। ট্রেনিং নেই। ট্রেনিং সেন্টারের ভেতরে রাতে যে মটিভেশন ক্লাস হতো সেখানে আমার বহু ছড়া-কবিতা পাঠ করেছি। ঐ সময়কার লেখা ছড়াগুলো নিয়ে পরবর্তীকালে আমার একটি বই প্রকাশ পায়: ‘একাত্তরের ঘটনা: মুক্তিযুদ্ধের ছড়া’। আমার প্রথম প্রকাশিত ছড়ার বইয়ের নাম: ‘ইকিরমিকির চিকির দান’। ঢাকা বই মেলায়। আমি ছোটদের জন্য ২০ খানি বই লিখেছি। এই ২০ খানি বইয়ের মধ্যে ১২ খানি ছড়ার বই। ২০০৬ সালে ঢাকার জ্যোতিপ্রকাশের ৩টি ছড়ার বইকে বাংলাদেশ সরকারের সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ের অর্থে জাতীয় গ্রন্থ কেন্দ্র পুরস্কার ঘোষণা করে। এর মধ্যে কবি শামসুর রাহমান ও আমার ‘পাখির রাজ্যে কিচিরমিচির’ ছড়ার বইটিও পুরস্কৃত হয়। আমার লেখা উল্লিখিত ছড়ার বইগুলো হলো, ‘ইকিরমিকির চিকির দান’ উটকো রাজা উটুস ফুটুস,’ ‘সেই হাতিরা উড়তে পারে’, ‘পাখির রাজ্যে কিচিরমিচির’, প্রীতিরছড়া জয়ের পড়া’, ‘চাঁদের দেশে জোছনা ঝরে’, ‘ছড়ায় ছড়ায় নদ ও নদী’, ‘একুশের ছড়া’ ইত্যাদি। সেই শিশু বেলায় শিশুতোষ লেখা নিয়ে আমার লেখালেখির শুরু, আজো লিখছি। বর্তমান পর্যায়ে আসতে মাঝ পথে অনেক কাজের সঙ্গে যুক্ত হয়েছিলাম। কবিগানের দলে কবিয়াল বিজয় সরকারের কবির দলে এবং অন্যদের সঙ্গে সরকারি পেশাদার যাত্রাদলে কাজ করেছি— আমি যে দুটি যাত্রা দলে কাজ করেছিলাম তা হলো, ‘জোনাকি অপেরা’ ও ‘নর-নারায়ণ অপেরা’। এছাড়া বিভিন্ন থিয়েটার দলে কাজ করেছি। কবিয়াল বিজয় সরকার ও শিল্পি সুলতান আমার মনের সারা আকাশ জুড়ে রয়েছে। কবিয়াল বিজয় সরকার তিনি শুধু আমার কবিগানের গুরুই ছিলেন না। তিনি আমাকে তার মানসপুত্র হিসেবে গ্রহণ করেছিলেন। বিজয়ের বহু বিখ্যাত গানের রচনা আমার সামনে ঘটেছে। গানে তার সুর প্রয়োগ ও শিষ্যদের শিখিয়ে দেয়ার পদ্ধতিটি আজও স্মৃতি হয়ে আছে। সরকার মশাইয়ের মৃত্যুর পরে একাকী চলার পথে চলতে চলতে ঢাকায় এলাম। আমি ছায়াছবি সাদ্দাম বাদশায় অভিনয় করেছি। আমি ১৯৭৬ সালে বাংলাদেশ বেতার আয়োজিত দেশাত্ববোধক সঙ্গীত রচনা প্রতিযোগিতায় প্রশংসাপত্র লাভ করি। ১৯৭৯ সালে সরকার ঘোষিত জেলাওয়ারি একুশে সাহিত্য প্রতিযোগিতায় প্রথম পুরস্কার লাভ করি। ২০০২ সালে ভারতের রাবাঙপুর ও কলকাতার নির্ভা আর্টস গ্যালারিতে সংবর্ধনা ও পুরস্কার লাভ করি। এ বছরে পেয়েছি শেরে বাংলা স্মৃতি পুরস্কার।