এভারেস্ট নিয়ে যত কথা

আপডেট : ২৪ সেপ্টেম্বর ২০১৩, ১৮:৩৯
এভারেস্টের কথা বলতে গেলে যে নামটি প্রথমে আসে, তা হলো হিমালয় পর্বতমালা। আসলে হিমালয় শব্দটির যদি সন্ধি বিচ্ছেদ করি, তাহলে দাঁড়ায় হিম+আলয়, অর্থাত্ যেখানে সারা বছর বরফে ঢাকা থাকে। এই হিমালয় কিন্তু বাংলাদেশ থেকে বেশি দূরে নয়। মাত্র ৬০ কিলোমিটার দূরে। হয়তো অনেকে আশ্চর্য হবেন যে হিমালয় এতো কাছে? গাড়িতে মাত্র এক ঘণ্টা সময় লাগে। এক্ষেত্রে উল্লেখ্য যে, পঞ্চগড় জেলাধীন মালামালের জন্য নির্ধারিত স্থল বন্দর জিরো পয়েন্টে বাংলাবান্ধা ইউনিয়ন থেকে ৬০ কিলোমিটার। অবশ্য, ঢাকা রাজধানী থেকে প্রায় ৪৬০ কিলোমিটার। এখানে উল্লেখ্য, এ বিশ্ব ছোট বড় বিশটি প্লেট নিয়ে গঠিত, অবশ্য সংখ্যা নিয়ে মতভেদ আছে। আর এ প্লেটের ওঠা নামা বা ঘর্ষণে প্রকৃতিসহ ভূতাত্ত্বিক দিক দিয়ে বিরাট পরিবর্তন হয়ে থাকে এবং সেই আঙ্গিকে আজ থেকে প্রায় চার কোটি বছর আগে ভারতীয় প্লেট ও এশিয়ান প্লেটের মধ্যে ভীষণ এক সংঘর্ষের ফলে হিমালয়ের সৃষ্টি। এ সৃষ্টির পিছনে অনেক অভিমত থাকলেও সর্বজন স্বীকৃত অভিমত হলো- ক্রিটেসিয়াস-প্রাক টারশিয়ারি যুগে সিন্ধু-সাংপো সন্ধিবলয়কে কেন্দ্র করে সেনোজোয়িক যুগে ভারতীয় প্লেট ও এশিয়ান প্লেটের মধ্যে সংঘর্ষের ফলশ্রুতিতে সর্বশ্রেষ্ঠ ও সর্বোচ্চ পর্বতমালার সৃষ্টি। আর এ সম্পর্কে ব্যাপক অনুসন্ধান উনবিংশ শতাব্দীর শেষের দিকে শুরু হলেও, পর্বতমালাটি সম্পর্কে প্রাপ্ত নির্ভরযোগ্য তথ্যের অধিকাংশই পাওয়া যায় ১৯৫০ সালের পর। যাহোক, হিমালয় পর্বতমালা বিশ্বের সর্বোচ্চ অথচ স্বল্প বয়সী। এটি কোন একক শ্রেণিভুক্ত পর্বতমালা নয়। এটি প্রায় সমান্তরাল ধারায় লম্বা ও দূরত্ব নিয়ে স্থাপিত। এর কোথাও দুটি ধারা একই সাথে মিশে গেছে। আবার কোথাও মাত্র একটি ধারা। অবশ্য এরই মধ্যে ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে অসংখ্য উপত্যকা, অধিত্যকা; আর বালিয়াড়ি ও সমভূমি। মজার ব্যাপার হলো, ছোট পাহাড়ের ভিত ধরে উচ্চ থেকে আরও উচ্চে উঠে গেছে এ হিমালয়ের শ্রেণি। আর তার অভ্রবেদী বেশ কয়েকটি শৃঙ্গ আছে, যেগুলোর মধ্যে রয়েছে সুবিখ্যাত মাউন্ট এভারেস্ট (৮,৮৪৮মি.) মাউন্ট K2 (৮,৬১০মি), কাঞ্চনজঙ্ঘা (৮৫৮৫মি.) ইত্যাদি। এর মধ্যে কিছু পর্বতমালার গতিধারা প্রধান হিমালয় বলয়ের অনুপ্রস্থ বা আড়াআড়ি, এগুলো হচ্ছে আসাম, মনিপুর, আরাকান, ইয়োমা, পার্বত্য চট্টগ্রাম, পেগু, ইয়োমা রেঞ্জ ইত্যাদি। আর এখানেই শেষ নয়, এই হিমালয় মধ্য এশীয় পর্বত পৃথিবীর চাঁদ বলে অভিহিত পামীর মালভূমি থেকে উত্থিত হয়ে বিভিন্ন দিকে ছড়িয়ে গেছে। এতদ্ব্যতীত ভৌগোলিক দিক দিয়ে নদী-নালার আওতায় যদি বিবেচনা করি তাহলে দেখি, হিমালয় পর্বত পাকিস্তানের গিলগিটে সিন্ধু নদী থেকে শুরু করে ভারত, তিব্বত, নেপাল, পূর্ব ভারত ও ভুটান হয়ে দক্ষিণ-পূর্ব তিব্বতে ব্রহ্মপুত্র নদের দক্ষিণাঞ্চলীয় বাঁক পর্যন্ত বিপুল স্থলভাগ জুড়ে রয়েছে এবং এর সূত্র ধরে গুরুত্বপূর্ণ কিছু নদী, যেমন—সিন্ধু, শতদ্রু, কালি, তিস্তা ও ব্রহ্মপুত্র আড়াআড়িভাবে হিমালয়ের বুক চিরে ছুটে চলেছে সমুদ্রের দিকে। এদিকে সিন্ধু ও শতদ্রু নদীর মধ্যবর্তী হিমালয়ের অংশবিশেষ পাঞ্জাব ও কাশ্মীর হিমালয়’ নামে পরিচিত (৫৬৩ কিঃ মিঃ)। তাছাড়া শতদ্রু ও কালি নদীর মধ্যবর্তী ধরে পরবর্তী অংশটি ‘কুমায়ুন হিমালয়’ (৩২২কিঃ মিঃ)। এতদ্ব্যতীত কালি ও তিস্তা নদীর মধ্যবর্তী তৃতীয় অংশটি ‘নেপাল হিমালয়’ নামে পরিচিত। এদিকে তিস্তা ও ব্রহ্মপুত্রের মধ্যবর্তী চতুর্থ অংশটির নাম ‘আসাম হিমালয়’ নামে (৭২৪কিঃ মিঃ) অভিহিত। যাহোক, ভূতাত্ত্বিক দিক দিয়ে হিমালয় পর্বতমালাকে যদি বিন্যাস করি, তাহলে দেখা যায় যে, নিম্ন হিমালয়ের উচ্চতা ১৫০০ থেকে ৩০০০ মিটার, আবার উচ্চ হিমালযের উচ্চতা ৩০০০ থেকে ৮০০০ মিটার। এদিকে সিন্ধু-জেইনবো সন্ধি বলয় ও আন্তঃহিমালয় কয়টি ভাগে ভাগ। তাছাড়া উচ্চ হিমালয়ে ৮০০০ মিটারের ঊর্ধ্বে বেশ কয়েকটি বরফাচ্ছাদিত শৃঙ্গ রয়েছে, যেমন এভারেস্ট, অন্নপূর্ণা, মানাসলু, ইত্যাদি। এবার আসুন প্রতিপাদ্য বিষয় এভারেস্ট সম্পর্কে কিছু কাহিনি ভিত্তিক কথা বলি, যা সঙ্গতকারণেই জানা দরকার। উল্লেখ্য যে, সমগ্র ভারতে বৃটিশ শাসনের প্রথম দিকে ইংল্যান্ড থেকে আগত ভৌগোলিক দিক দিয়ে অনুসঞ্চিচ্ছু মনের অধিকারী বৃটিশ সার্ভেয়ার জেনারেল স্যার জর্জ এভারেস্ট ভারতের উত্তর-পূর্বে অবস্থিত বিশাল এলাকা সম্বলিত পাহাড়-পর্বত অঞ্চলগুলোর উপর জীবনের ঝুঁকি নিয়ে ব্যাপক সার্ভে শুরু করেন। এক পর্যায়ে জেনারেল এভারেস্ট হিমালয়ের সবচেয়ে উচ্চ শৃঙ্গের অবস্থান নির্ণয় করেন এবং সেই যুগে এত সুযোগ-সুবিধা ছিল না। তথাপিও মহাবিপদ জেনেও জীবন তুচ্ছ করে পরিমাপ করতে সমর্থ হন। যদিও এ বন্ধুর পথে বেশ কিছু সহকর্মীকে জীবন দিতে হয়েছিল। যাহোক, সেই সূত্র ধরে, ১৮৬৫ সালে রয়েল জিওগ্রাফিক্যাল সোসাইটি কর্তৃক এ শৃঙ্গের নাম তাঁর নামানুসারে ‘এভারেস্ট’ রাখা হয়। যদিও সার্ভেয়ার জেনারেল অ্যান্ডু ওয়াহ ১৮৪৭ সালে প্রথম এই শৃঙ্গের নাম দিয়েছিলেন ‘পিক বি’। সাধারণত এটিকে তিব্বতিরা ভক্তিসহকারে ডাকে চমোলাংগামা বা অবনীর মা দেবী বলে। আর নেপালীরা ডাকে সাগর মাথা তথা গগনের ললাট হিসেবে। এখানে উল্লেখ্য, যে সকল বিদেশিরা এভারেস্ট জয় করেছেন, তাদের ক্ষেত্রে শেরপাদের ভূমিকা প্রণিধানযোগ্য। আর তিব্বতি ভাষায় ‘শেরপা এর অর্থ ‘পূর্বের মানুষ’। ১৯৫৪ সালে সমুদ্র পৃষ্ঠ থেকে এভারেস্টের উচ্চতা ছিল ৮৮৪৮ মিটার অর্থাত্ ২৯ হাজার ২৯ ফুট। ১৯৯৯ সালের জরিপে দেখা যায় তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২৯ হাজার ৩৫ ফুট। সেই হিসেবে বর্তমানে এভারেস্টের উচ্চতা প্রায় ২৯ হাজার ৩৭ ফুট। আর এভারেস্ট নির্ণয়ের পর থেকে এটিকে স্পর্শ করার জন্যে অনেক দুঃসাহসী মানব-মানবীর মনে অদম্য নেশা চেপে বসে। সাধারণত এভারেস্টে ছোট বড় চৌদ্দটি পথ ও দিক ধরে ওঠা যায়। তবে মূলত অধিক ব্যবহূত প্রধান পথ দুটি। প্রথমটি হচ্ছে নেপালের দিক দিয়ে, আর দ্বিতীয়টি হলো তিব্বতের দিক থেকে। তিব্বতের দিকের পথ নেপালের তুলনায় সহজ। সেখানে বেজ ক্যাম্প পর্যন্ত গাড়িতে যাওয়া যায়। তবে নেপালের দিকটা, বহুল পরিচিত ও বিখ্যাত। কেননা এই পথ ধরেই তেনজিং নরগে ও হিলারি এডমন্ড প্রথম উঠেছিলেন। তাঁরা ১৯৫৩ সালের ২৯ মে প্রথম পৃথিবীর সর্বোচ্চ গিরিশৃঙ্গ মাউন্ট এভারেস্টে আরোহণ করেন। উল্লেখ্য যে, হিমালয়ে অভিযানে দু’টি উপযোগী সময় অর্থাত্ মৌসুম: একটি প্রি মনসুন (এপ্রিল-মে), অন্যটি পোস্ট-মনসুন (সেপ্টেম্বর-অক্টোবর)। সেই থেকে যতদূর জানা যায়, এ যাবত্ ৩১৪৩ জন আরোহী প্রায় ৫১০১ বার এভারেস্টের চূড়ায় উঠেছেন। এর মধ্যে নারী আরোহী মাত্র ৮৫ জন। আর ১৯৭৫ সালে ১৬মে জাপানের জুনকো তাবেই বিশ্বের প্রথম নারী, যিনি এভারেস্ট জয় করেন। সবচেয়ে বেশি অর্থাত্ ২১ বার উঠেছেন আপা শেরপা। এদিকে লাকপা গেলু নামে এক শেরপা মাত্র স্বল্প সময়ে অর্থাত্ ১০ ঘণ্টা ৪৬ মিনিট এই চূড়ায় উঠেন। তাছাড়া ৮০ বছরের বয়োঃবৃদ্ধ ইউচিরো মিউরা নামের এক জাপানী এই পর্বত শৃঙ্গে উঠার গৌরব অর্জন করেছেন। আর বাংলাদেশের প্রথম বাংলাদেশি হিসেবে মুসা ইব্রাহিম এভারেস্ট জয় করেন। তাছাড়া প্রথম নারী নিশাত মজুমদার যখন চূড়ায় উঠে স্বদেশীয় পতাকা উড়ান, ঠিক তার দুই ঘণ্টা আগে ৭৩ বছর বয়সী জাপানী অকুতোভয় নারী তামায়ি ওয়াতানাবে দ্বিতীয়বারের মতো এভারেস্ট জয় করেন। এদিকে নিশাতের পর মাত্র সাতদিনের মাথায় বাংলাদেশের দ্বিতীয় নারী হিসেবে ওয়াসফিয়া নাজরীন হিমালয়ের এভারেস্ট চূড়া জয় করেন। বাংলাদেশি নাগরিক কর্তৃক এভারেস্ট জয় করার গৌরব অর্জন করে মাত্র পাঁচ জন। অবশ্য এর পিছনে বি.এম.টি.সি’র (বাংলাদেশ মাউন্টেনিয়ারিং অ্যান্ড ট্রেকিং ক্লাব) ইতিবাচক ভূমিকা ভুলবার নয়। যাহোক, তার মধ্যে মুসা ইব্রাহিম, মুহিত (২ বার), নিশাত, নাজরীন এবং সজল খালেদ। কিন্তু বিজয়ান্তে সজল খালেদ ১০০০ ফুট নামার পর খুব অস্থিরতা বোধ করেন এবং অতীব দুঃখের বিষয় ঠিক এর দুই মিনিট পর চিরতরে বিদায় নেন। এই হিমালয় পর্বতমালা যদি না থাকতো তাহলে আমাদের যে কি হতো তা ভাবাই যায় না। কেননা সুজলা-সুফলা বলে আমরা বাংলাদেশ নিয়ে যে বড়াইও করি, তার পেছনে রয়েছে ছোট-বড় মিলে প্রায় সাতশ’ নদ-নদী। আর প্রায় সব নদীগুলোর উত্স এই হিমালয়। এদিকে বর্ষাকালে প্রকৃতির অসামান্য অবদান হিসেবে নদীগুলোর মাধ্যমে বাহিত পলি মাটিসহ পানির প্রবাহ জমি উর্বর করে তোলে। তাছাড়া শুষ্ক মৌসুমে যখন বৃষ্টি থাকে না, তখনও এই পর্বতমালার মাথায় জমাট বাঁধা বরফ গলে কিছুটা কম হলেও নদীগুলোর নাব্যতা বা পানি প্রবাহ সমন্বয় করে আমাদের বাঁচিয়ে রেখেছে। একবার ভাবুন দেখি, হিমালয় না থাকলে আমাদের কি হতো?