শিক্ষকের কথা

‘ভালোবাসি প্রজাপতি’

আপডেট : ২৪ সেপ্টেম্বর ২০১৩, ১৮:৪২
প্রজাপতি। রঙে মাখা এক অপূর্ব সৃষ্টি। নান্দনিকতার ক্ষেত্রে প্রজাপতির রয়েছে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা। শুধু তাই নয় প্রজাপতির প্রধান কাজ হলো ফুলের পরাগায়ণে সাহায্য করা। আর এর মাধ্যমে উদ্ভিদকূল বীজ উত্পাদন করে বংশবিস্তার করতে সক্ষম হয়। এছাড়া ব্যবহূত হয় খাদ্য শৃংখলেও। কিন্তু প্রকৃতি ধ্বংস, বনভোজন, চলচ্চিত্রের চিত্র ধারণ, দর্শনার্থীদের সৃষ্ট শব্দ দূষণ ইত্যাদি প্রতিনিয়ত প্রজাপতির জীবনকে বিপন্ন করে তুলছে। অপরপক্ষে বনভূমি উজাড় করার চলমান প্রক্রিয়াতে প্রকৃতির অপরূপ অলংকার প্রজাপতিকূল আজ অস্তিত্ব সংকটে। কথাগুলো বলছিলেন জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণীবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ও স্বনামধন্য প্রজাপতি গবেষক ড. মনোয়ার হোসেন তুহিন। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে মনোয়ার হোসেন তুহিন কেবল একজন প্রজাপতির গবেষকই নন বরং নিজেই হয়ে উঠেছেন একটা বর্ণিল প্রজাপতি। দিনভর ফুলে ফুলে উড়ে বেড়ানো প্রজাপতিদের পিছু পিছু ঘুরে বেড়ান তিনি। যেন এক উন্মাদনায় আক্রান্ত সর্বক্ষণ। আর এ উন্মাদনায় মুগ্ধ হয়ে ক্যাম্পাসের শিক্ষকরা মনোয়ার হোসেন তুহিনকে ডাকেন ‘প্রজাপতি’ নামে। ‘আকাশে উড়লে প্রজাপতি, প্রকৃতি পায় নতুন গতি’ প্রতিপাদ্য নিয়ে জীব-বৈচিত্র্য ও প্রাকৃতিক সৌন্দর্য রক্ষায় সচেতনতা তৈরির লক্ষ্যে মনোয়ার হোসেন প্রতিবছর আয়োজন করেন ‘প্রজাপতি মেলা’। বাংলাদেশে প্রথমবারের মতো ২০১০ সাল থেকে ধারাবাহিকভাবে এই প্রাণীবিজ্ঞানী ‘প্রজাপতি মেলা’ আয়োজন করে প্রজাপতির প্রতি মানুষের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছেন। প্রতি বছর সাধারণত ডিসেম্বরের প্রথম সপ্তাহে এ মেলার আয়োজন করা হয়ে থাকে। মেলায় জাল দিয়ে ঘিরে প্রদর্শনী স্টল তৈরি করা হয়। ফুলের ওপর খেলা করে সাত রঙের প্রজাপতি। লাল, নীল, হলুদ, বেগুনিসহ নানা রঙের প্রজাপতির রঙিন পাখা মেলে ওড়াউড়ি রং ছড়ায় আকাশে। রঙের জাদুতে মোহিত হয় দর্শনার্থীরা। এছাড়াও শিশু-কিশোরদের প্রকৃতি ও প্রজাপতিপ্রেমী করে তুলতে প্রজাপতি নিয়ে নির্মিত ডকুমেন্টারি প্রদর্শনী, চিত্রাঙ্কন প্রতিযোগিতা, প্রজাপতি দেখা, প্রজাপতির ছবি প্রদর্শনী প্রতিযোগিতা, প্রজাপতি বিষয়ক বারোয়ারি বিতর্ক প্রতিযোগিতাসহ নানা আয়োজন করা হয় মেলায়। ড. মনোয়ার হোসেন তুহিন ১৬ বছরের নিরলস সাধনায় এখানে গড়ে তুলেছেন ‘প্রজাপতি বাগান’। বিশ্ববিদ্যালয়ের বোটানিক্যাল গার্ডেনের বাঁশঝাড়, ফুলবাগান, ঝোঁপ-জঙ্গল, নাগেশ্বর গাছের সারি, সবুজ নরম ঘাসের প্রান্তর সব মিলিয়ে ৩শ’ একর জায়গা জুড়ে অবস্থিত এ ‘বাটারফ্লাই হাউস’। এখানকার মনোরম প্রাকৃতিক পরিবেশের কারণে প্রজাপতিরাও আপন করে নিয়েছে বাগানটিকে। সবুজ বাঁশঝাড় আর নরম ঘাসের ডগায় দিনভর চলে তাদের ওড়াউড়ি। আপন মনে তারা ফুলে ফুলে ঘুরে বেড়ায়, মধু খায়। অনুসন্ধানী গবেষক মনোয়ার হোসেন বিলুপ্তপ্রায় প্রজাতির সংরক্ষণে এখানে গড়ে তুলেছেন প্রজাপতির ‘কৃত্রিম প্রজনন কেন্দ্র’। প্রাকৃতিক ও কৃত্রিম উপায়ের সংমিশ্রণে নতুন প্রজাপতির প্রজনন করা হয় এখানে। কিছুদিন পরিচর্যার পর বাগানে ছেড়ে দেয়া হয় নতুন প্রজাতির প্রজাপতি। এভাবেই জীববৈচিত্র্য রক্ষায় অসামান্য অবদান রেখে চলেছেন বিশিষ্ট প্রজাপতি গবেষক ও প্রাণীবিজ্ঞানী অধ্যাপক মনোয়ার হোসেন।