বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে নানা অনিয়ম, মন্ত্রণালয় নীরব

আপডেট : ২৪ সেপ্টেম্বর ২০১৩, ২২:২০
বেশ কয়েকটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের বিরুদ্ধে সার্টিফিকেট বিক্রিসহ নানা অভিযোগ থাকলেও এর কোন ব্যবস্থা নিতে পারেনি মন্ত্রণালয়। শুধু তাই নয়, বিচার বিভাগীয় তদন্ত কমিশন গঠন করেও অভিযুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়ের বিরুদ্ধে কোন ব্যবস্থা নেয়া হয়নি। বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর অব্যবস্থাপনা ক্রমশ বৃদ্ধি পেলেও মন্ত্রণালয় নিরব ভূমিকা পালন করছে। চিঠি আদান প্রদানের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকছে, কোন চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত দিচ্ছে না। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের ওপর শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের নিয়ন্ত্রণ নেই, মন্ত্রণালয়ের কর্মযজ্ঞ পুরোটাই লোক দেখানো। বর্তমান সরকারের সময় তিন দফায় অনুমোদন দেয়ার পর এখন বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৭৮ এ। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বিদ্যমান নিয়ম অনুযায়ী বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের মাধ্যমে বিশ্ববিদ্যালয় তদারকি ও নিয়ন্ত্রণ করার দায়িত্ব শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের। কিন্তু নিয়ন্ত্রণের নামে মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট অনুবিভাগের কর্মকাণ্ডই প্রশ্নবিদ্ধ। চিঠিপত্র আদান প্রদানের মধ্যেই যেন তারা ব্যস্ত থাকেন। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, কোন্ বিশ্ববিদ্যালয়ে কী পড়ানো হচ্ছে বা কোন ক্লাস হচ্ছে কী না, অনুমোদনের বাইরে কোন বিভাগ পড়ানো হচ্ছে কী না, যোগ্য শিক্ষক বা কোন শিক্ষকা আছে কী না এ বিষয়গুলোও তদারকি করা প্রয়োজন। বিশ্ববিদ্যালয় অনুমোদন দিয়ে মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব শেষ নয়। শিক্ষার্থীদের স্বার্থে শিক্ষার মান, অবকাঠামো সুবিধাদি সবকিছুই তদারকি করা প্রয়োজন। কিন্তু এ বিষয়ে ইউজিসি বা মন্ত্রণালয় কিছুই করছে না। ফলে শিক্ষার্থীরা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, শিক্ষা মন্ত্রণালয় চাইলে প্রতিটি বিশ্ববিদ্যালয় তাদের নিয়ন্ত্রণে আনতে পারে। কিন্তু করছে না। মন্ত্রণালয় এবং ইউজিসির একাধিক কর্মকর্তা এগুলো জিইয়ে রাখছেন। এতে তাদের লাভ হলো- বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর পক্ষ থেকে অবৈধ সুবিধা আদায়। ইউজিসির দুই-একজন কর্মকর্তা আছেন যিনি আইন না মানা বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে গিয়ে নিজস্ব আত্মীয়-স্বজনকে চাকরি দেয়ার কাজে ব্যস্ত থাকেন। কেউ কেউ আর্থিক সুবিধাও নিয়ে থাকেন। বিশ্ববিদ্যালয়ের বিদ্যমান গ্রুপগুলোর উভয় পক্ষের সাথেই তারা গোপনে সম্পর্ক রাখেন। বিশ্ববিদ্যালয়গুলোও ইউজিসির এই কর্মকর্তাদের অনুরোধ রাখতে পেরে ধন্য হয়। ইউজিসি কোন বিশ্ববিদ্যালয়ের বিরুদ্ধে কী সিদ্ধান্ত নিতে যাচ্ছে তা আগে ভাগেই ওই বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর কাছে পৌঁছে দিচ্ছেন তারা। দারুল ইহসান বিশ্ববিদ্যালয়ের বিরুদ্ধে নিয়ম অনুযায়ী কোন ব্যবস্থা নিতে না পারায় ২০১০ সালে বিচার বিভাগীয় তদন্ত কমিশন গঠন করা হয়। ওই কমিশন প্রতিবেদনও জমা দিয়েছে। কিন্তু বছর পেরিয়ে গেলেও কমিশনের সুপারিশ বাস্তবায়ন করছে না মন্ত্রণালয়। শুধু সিদ্ধান্ত নেয়ার বিষয়ে একের পর এক সভা করে যাচ্ছে মন্ত্রণালয়। মন্ত্রণালয়ের একটি সূত্র জানিয়েছে, রাজনৈতিক ছত্রছায়ায় এই বিশ্ববিদ্যালয় একাধিক শাখা ক্যাম্পাস পরিচালনা করছে। বিদ্যমান চারটি পৃথক ট্রাস্টি বোর্ডেই রয়েছে সরকার দলীয় নেতা-কর্মীরা। একটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের মালিক বলেন, কিছু বিশ্ববিদ্যালয় টাকার বিনিময়ে সার্টিফিকেট বিক্রি করছে। গোয়েন্দা সংস্থার মাধ্যমে অনুসন্ধান শেষে বিশ্ববিদ্যালয়ের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া যায়। কিন্তু সরকার তা করছে না। ইতিমধ্যে অনেক প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে অবৈধ ক্যাম্পাস পরিচালনা, নিজস্ব ক্যাম্পাসে না যাওয়াসহ নানা ধরনের অনিয়মের অভিযোগ রয়েছে। মন্ত্রণালয় এদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে পারে, কিন্তু নিচ্ছে না। মঞ্জুরি কমিশনে একজন সদস্য ও দুই তিনজন কর্মকর্তা রয়েছেন ৭৮টি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের কার্যক্রম পরিচালনার জন্য। তারা রুটিন অনুযায়ী কিছু চিঠিপত্রের জবাব দেয়া ছাড়া আর কোন কাজ করছেন না। অবশ্য এ ক্ষেত্রে ইউজিসি বিদ্যমান আইনের দুর্বলতার কথা বলছেন। তারা বলছেন, বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের বিরুদ্ধে কোন ব্যবস্থা নেয়ার ক্ষমতা তাদের নেই। এটিকে উচ্চ শিক্ষা কমিশন করে ক্ষমতা দিতে হবে। তবেই বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় নিয়ন্ত্রণ সম্ভব। মন্ত্রণালয়ের একাধিক কর্মকর্তা বলেন, দারুল ইহসানসহ বেশ কয়েকটি বিশ্ববিদ্যালয়ে মালিকের মধ্যে দ্বন্দ্ব রয়েছে। মন্ত্রণালয় চাইলে বিবদমান গ্রুপগুলোর সাথে বৈঠক করে সমস্যা সমাধান করতে পারে। তা না করে সমস্যা জিইয়ে রাখছে। অভিযোগ রয়েছে, প্রয়োজনীয় তদন্ত না করে এক পক্ষকে বৈধ আবার অন্য পক্ষকে অবৈধ বলা হচ্ছে। ইউজিসির সচিব ড. মো: খালেদ বলেন, ইউজিসিকে উচ্চ শিক্ষা কমিশন করা হলে এ প্রতিষ্ঠানটির কাজের পরিধি বাড়বে। বিদ্যামান বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় আইন অনুযায়ী ইউজিসি বিশ্ববিদ্যালয় নিয়ন্ত্রণ করার ক্ষমতা পাবে। মন্ত্রণালয়ের মুখাপেক্ষী হয়ে থাকতে হবে না, সমস্যা সমাধান করা সম্ভব হবে। দেশে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের যাত্রা শুরু হয় ১৯৯২ সালে। এরপর বিগত চারদলীয় জোট সরকারের সময় পর্যন্ত মোট বিশ্ববিদ্যালয় ছিল ৫৪টি। এর মধ্যে সনদ বাণিজ্যের দায়ে দুটি বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ করে দেয়া হয়েছিল। বর্তমান সরকারের আমলে আরও ২৪টি বিশ্ববিদ্যালয়ের অনুমোদন দেয়া হয়েছে।