দেশের মিঠা পানির মাছের অন্যতম উত্স সিলেটের হাওরগুলো থেকে বিলুপ্ত হয়ে যাচ্ছে প্রায় ৪৬ প্রজাতির মাছ। জলাশয় ভরাট, অপরিকল্পিত বাঁধ নির্মান, অতিরিক্ত কীটনাশকের ব্যবহার ও অবাধ মত্স্য নিধন এই বিলুপ্তির অন্যতম কারণ বলে মনে করছেন মত্স্য বিজ্ঞানীরা। ভরা বৈশাখে যেখানে ডিমওয়ালা মাছে হাওর, পুকুর, জলাশয় কিলবিল করার কথা, সেখানে মাছের দেখা নেই। বাজারে মাছের জন্য হাহকার। ‘হাওরে এক যুগ আগেও প্রায় ১০৭ প্রজাতির মাছ পাওয়া যেতো। এখন তা যেন তা গল্প’— এমন মন্তব্য মত্স্যজীবি সহ মত্স্য কর্মকর্তাদের।
এদিকে ভেজাল মত্স্য ও প্রাণীজ খাদ্যের যথেচ্ছ ব্যবহারে বিভিন্ন হাওরে জৈব নিরাপত্তাও হুমকির সম্মুখিন। অপরিকল্পিতভাবে উত্পাদিত ভেজাল খাদ্য ব্যবহারের ফলে প্রাকৃতিক উেসর মত্স্য সম্পদেও ক্ষতিকারক ব্যাকটেরিয়া ও ভারী ধাতুর উপস্থিতিতে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন বিজ্ঞানীরা। সিলেট কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষা মন্ত্রনালয়ের অধীনে “বেনবেইজ” এর অর্থায়নে মত্স্য প্রযুক্তি ও মান নিয়ন্ত্রন বিভাগ এ বাস্তবায়নাধিন “ব্যাকটেরিয়লজিক্যাল অ্যান্ড ক্যামিকেল এনালাইসিস অব ইন্ডিয়ান মেজর কার্পস অব হাকালুকি হাওর ইন সিলেট রিজিয়ন” শীর্ষক প্রকল্পের উদ্যোগে বৃহস্পতিবার দিন ব্যাপী এ সংক্রান্ত এক সেমিনার অনুষ্ঠিত হয়। সেমিনারে প্রধান অতিথির বক্তব্যে সিকৃবি‘র ভিসি প্রফেসর ড. মো: মতিয়ার রহমান বলেন, এখুনি এসব বিষয়ে পদক্ষেপ না নিলে পরবর্তীতে পরিস্থিতি ভয়াবহ হবে।
উন্মুক্ত আলোচনায় বক্তারা বলেন, ভেজাল খাদ্য দ্রব্য ব্যবহারের ফলে হাকালুকি হাওরের ইন্ডিয়ান মেজর কার্প অর্থাত্ রুই, মৃগেল ও কালি বাউশ মাছের ব্যাকটিরিয়াল ও রাসায়নিক পরীক্ষায় দেখা গেছে- ক্ষতিকারক ব্যাকটেরিয়া ই-কোলাই, সালমোনেলা এবং ভিব্রিয়স্পেসিস এর উপস্থিতির পাশাপাশি ভারী ধাতু সীসার উপস্থিতি গ্রহণযোগ্য মাত্রার চেয়ে অনেক বেশি। এটি নিরাপদ খাদ্যের জন্য হুমকি স্বরূপ। নিরাপদ মত্স্য সম্পদ রক্ষার স্বার্থে সকল পর্যায়ে সম্মিলিত প্রচেষ্টা গ্রহণ করতে হবে।
সিলেট বিভাগীয় মত্স্য অধিদপ্তরের সূত্র অনুযায়ী, হাকালুকি, টাংগুয়া, দেখার হাওর, শনির হাওরসহ সিলেট বিভাগের হাওরগুলো দেশের মত্স্য সমপদের অন্যতম আঁঁধার। দেশের চাহিদার একটি বৃহত্ অংশের মাছ এই হাওরগুলো থেকে আহরণ করা হয়ে থাকে। কয়েকবছর আগে মত্স্য অধিদফতরের সহায়তায় পরিবেশ অধিদফতরের উপকূলীয় ও জলাভূমি প্রকল্প জরিপ নামে একটি জরিপ চালানো হয়। বেসরকারী উন্নয়ন সংস্থা এনসিআরএস, আইডিয়া ও প্রচেষ্টা এই জরিপ কার্যক্রম বাস্তবায়ন করে। জরিপে দেখা গেছে সিলেটের হাওরগুলোর ১০৭ প্রজাতির মাছের মধ্যে ৪৬ প্রজাতিই বিলুপ্তর পথে। জরিপের বিলুপ্ত প্রায় মাছের প্রজাতিকে তিনটি ভাগে ভাগ করা হয়। এগুলো হচ্ছে, মহাবিপন্ন, সঙ্কটাপন্ন ও বিপন্ন প্রজাতি। এরমধ্যে মহাবিপন্ন প্রজাতি হচ্ছে- টাটকিনি, ঘারুয়া, বাঘাইড়, রিটা, রাণী, পাঙ্গাস, বামোশ, নাফতানি, চিতল, একথুটি ও চাকা। সঙ্কটাপন্ন প্রজাতির মাছ হচ্ছে-বাচা, ছেপচেলা, ঢেলা, বাঁশপাতা, কুঁচে, নাপতে কই, বাতাসিয়া টেংরা, ফলি ও গুজিআইড়। এবং বিপন্ন প্রজাতির মাছের মধ্যে রয়েছে- গুলশা, গনিয়া, দাড়কিনা, আইড়, পাবদা, বড়বাইম, গজার, তারাবাইম, তিতপুঁটি, নামা চান্দা ও কালিবাউশ।
