বিশ্বনেতাদের উদ্দেশে প্রধানমন্ত্রী

২০১৫ পরবর্তী উন্নয়ন বিষয়ে সর্বসম্মত সিদ্ধান্তে আসুন

আপডেট : ২৫ সেপ্টেম্বর ২০১৩, ২২:৫০
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা টেকসই উন্নয়নে পরবর্তী উন্নয়ন এজেন্ডা এবং জলবায়ু নীতি নির্ধারণের জন্য বিশ্ব নেতাদের প্রতি আহ্বান জানিয়ে বলেছেন, বিশ্ব নেতৃবৃন্দকে জলবায়ু পরিবর্তন রোধের দ্বারা বিশ্বের টেকসই উন্নয়ন বজায় রাখতে ২০১৫ পরবর্তী উন্নয়ন কর্মসূচি এবং ২০২০ সালের পরেও একটি আইনী কাঠামোর বিষয়ে সম্মত সিদ্ধান্ত নিতে অবশ্যই দূরদর্শিতার স্বাক্ষর রাখতে হবে। গতকাল মঙ্গলবার নিউইয়র্কে জাতিসংঘের সদর দপ্তরে ‘লিডার্স ডায়ালগ: হাই লেভেল পলিটিক্যাল ফোরাম-ফ্রম ভিশন টু অ্যাকশন’ শীর্ষক আলোচনা সভায় প্রধানমন্ত্রী এসব কথা বলেন। জাতিসংঘ মহাসচিব বান কি মুন, ইউএনডিপির প্রশাসক হেলেন কার্ক এবং বিশ্বব্যাংকের প্রেসিডেন্ট জিম ইয়ং কিমও এ সভায় বক্তব্য রাখেন। এর আগে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৬৮ তম অধিবেশনের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে যোগদান করেন। জাতিসংঘ সাধারণ অধিবেশনের উন্নয়ন বিতর্ক শুরুর এ উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে এসেছিলেন প্রেসিডেন্ট ওবামা। নর্থ লন বিল্ডিংয়ে সাধারণ অধিবেশনের যে অস্থায়ী কক্ষ এবার সাজানো হয়েছে তাতে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার আসনটির ঠিক সামনেই যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্টের আসন। সাধারণ অধিবেশন কক্ষেই দেখা হয়ে গেলো এ দুই নেতার। প্রথম সুযোগেই প্রেসিডেন্ট ওবামা শেখ হাসিনাকে বললেন, ‘ইওর সান ইজ ভেরি স্মার্ট, অ্যান্ড ইন্টেলিজেন্ট।’ কেনো এ কথাটি বারাক ওবামা বললেন তা জানতে চাননি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। আর ওবামাও বিষয়টির বিস্তারিত বলেননি। এ দুজনই স্বভাবসুলভ মিষ্টি হাসলেন। পরে প্রধানমন্ত্রী ‘অসমাপ্ত কার্য সম্পাদন: এমডিজির অগ্রগতি ত্বরান্বিতকরণ’ শীর্ষক উচ্চ পর্যায়ের অধিবেশনে (ট্যাকলিং দ্যা আনফিনিশড এজেন্ডা এক্সিলারেটিং দ্যা এমডিজি প্রোগ্রেস) মূল বক্তব্য উপস্থাপন করেন। বিশ্ব ব্যাংক ও ইউএনডিপির উদ্যোগে আয়োজিত এ অধিবেশনে প্রধানমন্ত্রী সহস্রাব্দ উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (এমডিজি) অর্জনে উন্নয়ন সহযোগীদের প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের আহবান জানিয়ে ২০১৫ পরবর্তী টেকসই উন্নয়ন এর জন্য নতুন, বাস্তবসম্মত এবং দায়িত্বশীল বিশ্ব অংশিদারিত্বের প্রয়োজনীয়তার কথা তুলে ধরেন। পরে প্রধানমন্ত্রী কাতারের আমীর শেখ তামিম বিন হামাদ আল থানী এবং চীনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ওয়াং ই’র সঙ্গে বৈঠক করেন। চীন বিনা শুল্কে তাদের বাজারে বাংলাদেশি পণ্যের প্রবেশাধিকারের ঘোষণা এবং বাংলাদেশ, ভারত ও মায়ানমারের সঙ্গে অর্থনৈতিক করিডোর বাস্তবায়নে ইতিবাচক মনোভাব জানায়। জাতিসংঘের সদর দপ্তরে ‘লিডার্স ডায়ালগ: হাই লেভেল পলিটিক্যাল ফোরাম-ফ্রম ভিশন টু অ্যাকশন’ শীর্ষক আলোচনা সভায় শেখ হাসিনা আরো বলেন, টেকসই বিশ্বের টেকসই উন্নয়নের অভিন্ন লক্ষ্য অর্জনে বিশ্ব নেতাদের দূরদর্শী নেতৃত্ব ও আন্তরিকতার পরিচয় দিতে হবে। তিনি বলেন, বাংলাদেশে টেকসই উন্নয়নের তিন স্তম্ভ-অর্থনৈতিক, সামাজিক ও পরিবেশের ওপর গুরুত্ব দেয়া হয়ে থাকে। বিশেষ করে জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে এই টেকসই উন্নয়ন বাংলাদেশের জাতীয় অস্তিত্বের জন্য অপরিহার্য। প্রধানমন্ত্রী বলেন, বাংলাদেশ জলবায়ু পরিবর্তনের বৈরী প্রভাবের অগ্রভাগে রয়েছে। বৈশ্বিক উষ্ণতা বাংলাদেশের জন্য প্রধানতম চ্যালেঞ্জ। বাংলাদেশ এমনিতেই এক ঘনবসতিপূর্ণ অঞ্চল। এক ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রা বাড়লে সমুদ্রের উচ্চতা এক মিটার বেড়ে যাবে। এতে দেশটির এক-পঞ্চমাংশ তলিয়ে যাবে এবং ৩ কোটি মানুষ জলবায়ুর বিরূপ প্রভাবে উদ্বাস্ত হবে। তাদের জীবনে নেমে আসবে দুর্বিষহ অবস্থা। তিনি বলেন, এসব চ্যালেঞ্জের মুখে গভীর উদ্বেগের কারণে বাংলাদেশ টেকসই উন্নয়নে ওপেন ওয়ার্কিং গ্রুপে সদা সক্রিয় রয়েছে। শেখ হাসিনা বলেন, এই ফোরামকে টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যসমূহ বাস্তবায়নে স্বল্পোন্নত, অতি স্বল্পোন্নত ও এসআইডিএস-এর বিশেষ প্রয়োজনীয়তাকে স্বীকৃতি দেয়া উচিত। তিনি বলেন, আমাদের সকল সিদ্ধান্তের লক্ষ্য হতে হবে একটি টেকসই বিশ্ব। জাতিসংঘ সদর দপ্তরে আয়োজিত এমডিজি’র অগ্রগতি বিষয়ক অধিবেশনে (সাইড ইভেন্ট) প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা জলবায়ু ইস্যু এবং সামাজিক ও অর্থনৈতিক নিরাপত্তা গড়ে তোলার ওপর গুরুত্বারোপ করেন। এমডিজি অর্জনে তাঁর সরকারের বিভিন্ন কর্মসূচি ও এক্ষেত্রে অগ্রগতি তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ইতিমধ্যে বাংলাদেশ দারিদ্র্য বিমোচন, লিঙ্গ সমতা, শিশু মৃত্যুহার ও বাল্য বিয়ে হ্রাসসহ কয়েকটি ক্ষেত্রে অগ্রগতি লাভ করেছে। প্রধানমন্ত্রী ২০১৫ পরবর্তী উন্নয়ন লক্ষ্য নির্ধারণে উন্নয়ন সহযোগীদের সহযোগিতা কামনা করে বলেন, এমডিজি অর্জনে এখন পর্যন্ত যতটুকু অগ্রগতি হয়েছে তা অব্যাহত রাখতে বিশ্ব ব্যাংক ও উন্নয়ন সহযোগীদের অব্যাহত সহযোগিতা কামনা করছি। কাতারের আমীরের সঙ্গে বৈঠক এর আগে জাতিসংঘে কাতারের স্থায়ী মিশনে কাতারের আমীর শেখ তামিম বিন হামাদ আল থানির সঙ্গে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বৈঠক হয়। বৈঠকে প্রধানমন্ত্রী অন্যান্য প্রকল্পের সাথে বাংলাদেশে কাতারের ১ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুত্ কেন্দ্র নির্মাণের পরিকল্পনা দ্রুত বাস্তবায়নের অনুরোধ জানান। কাতারের আমির বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীকে বলেন যে, বিদ্যুত্ কেন্দ্রসহ অন্যান্য প্রকল্পগুলো চূড়ান্ত করতে তাঁর দেশের একটি উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধিদল শিগগিরই বাংলাদেশ সফর করবে। চীনা পররাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে বৈঠক অপরদিকে জাতিসংঘ সদর দপ্তরের সন্মেলন কক্ষে প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে বৈঠকে চীনা পররাষ্ট্রমন্ত্রী ওয়াং ই বিনা শুল্কে বাংলাদেশি পণ্য চীনের বাজারে প্রবেশ ও অর্থনৈতিক করিডোর তৈরির ঘোষণা দিয়ে বলেন, অর্থনৈতিক করিডোরের বিষয়টি চূড়ান্ত করার জন্য দ্রুত চীনা প্রতিনিধিদল বাংলাদেশ সফর করবে। এর মাধ্যমে বাংলাদেশের সঙ্গে চীনের বাণিজ্য ভারসাম্যহীনতা অনেকটা দূর হতে পারে। বৈঠকে প্রধানমন্ত্রী বলেন, চীনের সঙ্গে বাংলাদেশের দীর্ঘ দিনের বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক রয়েছে। বাংলাদেশ ও চীন উভয়ে এ অঞ্চলের জনগণের উন্নয়নে একসঙ্গে কাজ করতে পারে। আলোচনায় বাংলাদেশের নির্বাচন প্রসঙ্গও উঠে আসে। এ সময় প্রধানমন্ত্রী বলেন, নির্বাচনের মাধ্যমে গণতন্ত্র আরো শক্তিশালী হবে। এদিকে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ২১ ফেব্রুয়ারিকে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে ঘোষণা করতে চলতি বছর জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদে বাংলাদেশের উত্থাপিত একটি প্রস্তাবে ৬৮তম সাধারণ পরিষদের সভাপতি অ্যাম্বাসেডর জোহান ডব্লিউ এ্যাস-এর সমর্থন কামনা করেছেন। প্রধানমন্ত্রী জাতিসংঘ সদর দফতরে মঙ্গলবার সন্ধ্যায় সাধারণ পরিষদের সভাপতির সাথে এক বৈঠকে তাকে এ বিষয়ে অনুরোধ জানান। জাতিসংঘের শান্তিরক্ষা কার্যক্রমে বিশ্ব শান্তিতে বাংলাদেশ যেনো আরো অধিক দায়িত্ব পালন করতে পারে এ জন্য এর প্রশাসনিক কাঠামোয় বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্ব বাড়াতে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের সভাপতির সমর্থন কামনা করেন প্রধানমন্ত্রী। তিনি সামপ্রতিক সময়ে জাতিসংঘে বাংলাদেশের বিভিন্ন প্রস্তাব গ্রহণে সমর্থনের জন্য অ্যাম্বাসেডর জোহানকে ধন্যবাদ জানান। এ প্রসঙ্গে তিনি বাংলাদেশের উত্থাপিত ‘জনগণের ক্ষমতায়ন ও উন্নয়ন মডেল’, ‘অটিজম স্পেকট্রাম ডিসঅর্ডার’ ও ‘শান্তির সংস্কৃতি’র মতো প্রস্তাবগুলো গ্রহণের কথা উল্লেখ করেন। প্রধানমন্ত্রীর কন্যা সায়মা হোসেন পুতুল, পররাষ্ট্রমন্ত্রী ডা. দীপু মনি, প্রধানমন্ত্রীর মিডিয়া উপদেষ্টা ইকবাল সোবহান চৌধুরী, অ্যাম্বাসেডর অ্যাট লার্জ এম জিয়াউদ্দিন, জাতিসংঘে বাংলাদেশের স্থায়ী প্রতিনিধি ড. এ কে আবদুল মোমেন, আওয়ামী লীগের উপদেষ্টামন্ডলীর সদস্য আমির হোসেন আমু, তোফায়েল আহমেদ, ছাত্রলীগের সভাপতি এইচএম বদিউজ্জামান সোহাগ, সাধারণ সম্পাদক সিদ্দিকী নাজমুল আলম প্রমুখ বৈঠকগুলোতে উপস্থিত ছিলেন।