ইমেজ সংকটের আশংকা তৈরি পোশাক শিল্পে

আপডেট : ২৫ সেপ্টেম্বর ২০১৩, ২২:৫১
আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে আবারো নেতিবাচক খবর হিসেবে জায়গা করে নিয়েছে বাংলাদেশের গার্মেন্টস খাত। গত কয়েকদিন ধরে মজুরি বাড়ানোর জন্য শ্রমিকদের আন্দোলন ও সহিংসতা বিশ্বের নেতৃস্থানীয় সকল গণমাধ্যমে এসেছে। সেখানে আবারো সামনে আসছে বাংলাদেশের গার্মেন্টস শ্রমিকদের সবচেয়ে কম মজুরি পাওয়ার বিষয়টি। এই আলোচনায় নতুন মাত্রা যোগ করেছে বিবিসির একটি নিবন্ধ। সেখানে উল্লেখ করা হয়, একটি কারখানায় শ্রমিকদের ১৯ ঘণ্টা কাজ করানো হয়। কারখানাটির মূল ফটক তালাবন্ধ ছিল। প্রতিবেদনের মাধ্যমে বাংলাদেশের অন্যান্য পোশাক কারখানায়ও এমন চিত্র রয়েছে বলে ইঙ্গিত করা হয়। কম মজুরি পাওয়ায় শ্রমিকদের স্বাভাবিকের চাইতে অনেক বেশি সময় ধরে কাজ করতে হয়। আবার কোন কোন কারখানায় জোর করে তাদের বেশি সময় কাজ করতে বাধ্য করা হয় বলেও অভিযোগ। এছাড়া রয়টার্স, নিউইয়র্ক টাইমস, ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল, আল-জাজিরা, ব্লুমবার্গ, দ্য গার্ডিয়ানসহ বেশিরভাগ নেতৃস্থানীয় গণমাধ্যমে সম্প্রতিক শ্রমিক অসন্তোষের বিষয়টি ফলাও করে প্রচার করা হয়। ‘তাজরীন’ ও ‘রানা প্লাজার’ পর এসব কারণে গার্মেন্টস খাত আবারো ইমেজ সংকটে পড়বে বলে মনে করেন অর্থনীতিবিদ ও সংশ্লিষ্টরা। তারা মনে করেন, শ্রমিকদের এই অসন্তোষ বা সহিংসতা দীর্ঘায়িত হতে দেয়া যাবে না। যত দ্রুত সম্ভব একটি গ্রহণযোগ্য মজুরি কাঠামো ঘোষণা করে তাদের শান্ত করতে হবে। বেসরকারি গবেষণা সংস্থা সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) অতিরিক্ত গবেষণা পরিচালক ড. খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম গতকাল ইত্তেফাককে বলেন, শ্রমিকদের এই অসন্তোষ দীর্ঘায়িত হলে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে নতুন করে ইমেজ সংকটে পড়বে এই খাত। এর আগে তাজরীন ও রানা প্লাজা দুর্ঘটনার পর হারানো ইমেজ পুনরুদ্ধারে ইউরোপ ও আমেরিকার ক্রেতাদের সহায়তায় চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছিল বাংলাদেশ। যত দ্রুত সম্ভব এই অসন্তোষ কমিয়ে আনতে হবে। এ জন্য প্রয়োজনে মজুরি বোর্ডের পরবর্তী ২১ আক্টোবরের বৈঠক এগিয়ে আনা যেতে পারে। সেখানে মালিকপক্ষ মজুরির বিষয়ে একটি গ্রহণযোগ্য প্রস্তাব দিতে পারেন। কারণ মালিকপক্ষের প্রস্তাব নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে। প্রসঙ্গত, মজুরি বোর্ডে শ্রমিকদের ন্যূনতম মজুরি ৮ হাজার ১১৪ টাকা করার প্রস্তাব দেয়া হয়েছে। অন্যদিকে মালিকদের প্রস্তাব ছিল বর্তমান ৩ হাজার টাকা থেকে ৬০০ টাকা বাড়িয়ে ৩ হাজার ৬শ টাকা করা। এ নিয়ে গত পাঁচ দিন ধরে গার্মেন্টস খাতে শ্রমিক অসন্তোষের জেরে শত শত কারখানা বন্ধ রাখতে হয়েছে। তৈরি পোশাক মালিকদের সংগঠন বিজিএমইএ-এর সাবেক সভাপতি আব্দুস সালাম মুর্শেদীও চলমান শ্রমিক অসন্তোষে এ খাতের ভাবমূর্তি সংকটের আশঙ্কা করছেন। গতকাল ‘ইত্তেফাক’কে তিনি বলেন, চলমান ঘটনায় আমাদের ইমেজের প্রচণ্ড ক্ষতি হচ্ছে। এর প্রভাব পোশাক রপ্তানিতে পড়বে বলেও তার আশংকা। তিনি বলেন, ‘এসব কারণ এবং রাজনৈতিক অস্থিরতাকে মাথায় রেখে আন্তর্জাতিক ক্রেতারা ইতিমধ্যে ক্রয় আদেশ কমাতে শুরু করেছে। আমার ক্রেতারাও অর্ডার কমিয়ে দিয়েছে। তারা (ক্রেতারা) ভাবছে, আমরা সময়মতো অর্ডার সরবরাহ করতে পারবো না। তারা আমাদের উপর আস্থা রাখতে পারছেন না। কারণ, এ বিষয়ে তাদের অতীত অভিজ্ঞতা রয়েছে।’ তিনি বলেন, ইতিমধ্যে রপ্তানিতে গতি মন্থরতা শুরু হয়েছে। আগস্ট মাসে তৈরি পোশাক রপ্তানি বেড়েছে মাত্র এই থেকে দুই শতাংশ। অথচ এর আগের মাসগুলোতে তা গড়ে ১৫ শতাংশ করে বেড়েছিল। আন্তর্জাতিক শ্রমিক অধিকার সংগঠন ‘ইন্ডাস্ট্রি অল’ এর বাংলাদেশ কাউন্সিলের মহাসচিব রায় রমেশচন্দ্র মনে করেন, শ্রমিকদের ন্যূনতম মজুরি যথাযথভাবে না বাড়ানো হলে এই খাত নতুন করে আবারো ইমেজ সংকটে পড়বে। তিনি মনে করেন, এর ফলে যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে স্থগিত হওয়া জিএসপি (অগ্রাধিকারমূলক বাণিজ্য সুবিধা) সুবিধা ফেরত পাওয়া সম্ভব নাও হতে পারে। উল্টো ইউরোপের বাজারের বিদ্যমান জিএসপি সুবিধাও হাতছাড়া হয়ে যেতে পারে। দ্রুত মজুরি কাঠামো বাস্তবায়নের তাগিদ চলমান শ্রমিক অসন্তোষ নিরসনে দ্রুত মজুরি কাঠামো ঘোষণা করা প্রয়োজন বলে মনে করেন শ্রমিক নেতৃত্ব এমনকি মালিকপক্ষও। আব্দুস সালাম মুর্শেদী মনে করেন, মজুরি কাঠামো নির্ধারিত সময়ের আগে ঘোষণা করলে ভালো হবে। ইতিমধ্যে শ্রম মন্ত্রণালয়ে ত্রিপক্ষীয় সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, মজুরি বোর্ডের কাছে এ বিষয়ে অনুরোধ জানানোর কথা বলা হয়েছে। মজুরি বোর্ডের সদস্য ও শ্রমিক নেতা সিরাজুল ইসলাম রনিও মনে করেন, দ্রুত মজুরি কাঠামো ঘোষণা হলে তা অসন্তোষ নিরসনের ক্ষেত্রে সহায়ক হবে। গতকাল ইত্তেফাককে তিনি বলেন, আইনি জটিলতার কারণে ২১ তারিখের সভা এগিয়ে আনার সুযোগ কম। তবে ওই তারিখের সভায় উভয় পক্ষই একটি সিদ্ধান্তে পৌঁছতে পারবো বলে আশা করি। এরপর আগামী নভেম্বরের প্রথম সপ্তাহ নাগাদ এটি চূড়ান্ত করা সম্ভব হবে বলেও তিনি আশা প্রকাশ করেন। ২১ অক্টোবরের আগে কম্বোডিয়া, ভিয়েতনাম সফর এতে অন্তরায় হবে না বলেও মনে করেন তিনি।