হজ্ব্ব পরিপূর্ণ জীবনপ্রণালী ইসলামের পাঁচটি খুঁটির (Foundation) অন্যতম। এ ফরয ইবাদত সামর্থ্যবান মুমিনদের (পুরুষ ও মহিলা) দ্রুত আদায় করা উচিত। হজ্ব্ব পালনের মাধ্যমে একদিকে যেমন আল্লাহর আদেশ পালিত হয় তেমনিভাবে অন্যদিকে ব্যক্তির (বিভিন্ন দিক থেকে) উন্নয়নও হয়। হজ্ব্ব মুসলিম বিশ্বকে সব ভেদাভেদ ভুলে (ওয়া‘তাসিমু বি হাবলিল্লা-হি জামি‘আ) ঐক্যবদ্ধ ও শক্তিশালী মহাজাতিতে পরিণত হতে খুবই সাহায্য করে। সামর্থ্যবান মুমিনদের জীবনে একবার হজ্ব্ব করা ফরয। হজ্ব্ব একমাত্র ইবাদত যা সব মুসলিম একই সময়ে, একত্রে আদায় করে। হজ্ব্বসহ অন্যসব ইবাদত গ্রহণযোগ্য হওয়ার জন্য বিশুদ্ধ বিশ্বাস, খালেস নিয়ত ও বিশুদ্ধ পদ্ধতি জরুরি। অতএব এ ব্যাপারে সবাইকে সতর্ক হতে হবে। বিশ্ববিখ্যাত কবি ড. আল্লামা ইকবাল বলেন—‘এ জাতির লাভ একটি, ক্ষতিও একটি, সবার নবী একজনই, ধর্ম এক, ঈমানও এক, পবিত্র হেরেম একটি, আল্লাহও এক, কুরআনও এক, কত উত্তম হতো যদি মুসলমানও এক হতো।’ হজ্ব্ব্ব একটি আরবী শব্দ। এর অর্থ সংকল্প করা, ইচ্ছা করা ইত্যাদি। পরিভাষায়, মহান আল্লাহর সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে নির্দিষ্ট সময়ে নির্দিষ্ট [রসূল (স.) দেখানো] পদ্ধতিতে কাবা ও এর সংশ্লিষ্ট স্থানে নির্দিষ্ট ইবাদত সম্পাদন করা। উমরাহও একটি আরবী পরিভাষা। এর অর্থ পরিদর্শন করা। ইবাদতের উদ্দেশ্যে কাবা পরিদর্শন করা। পরিভাষায়, আল্লাহর সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে বিশেষ [রসূল (স.) দেখানো] পদ্ধতিতে কাবা তওয়াফ, সাফা-মারওয়া সাঈ এবং মাথা মুণ্ডন করা বা মাথার চুল ছোট করার মাধ্যমে ইবাদত সম্পাদন করা। হজ্বের অপরিহার্যতা সম্পর্কে মহান আল্লাহ বলেন, ‘মানুষের মধ্যে যার সেখানে (কাবা) যাওয়ার সামর্থ্য রয়েছে আল্লাহর উদ্দেশ্যে সে ঘরের হজ্ব্ব করা তার অবশ্য কর্তব্য’ (সূরাহ আলে ইমরান, ৯৭)। ‘তোমরা আল্লাহর উদ্দেশ্যে হজ্ব্ব ও উমরাহ করো’ (সূরাহ বাকারাহ, ১৯৩)। ‘জনগণের মধ্যে হজ্বের ঘোষণা দাও, তারা তোমার কাছে আসবে পায়ে হেঁটে ও সর্বপ্রকার কৃশকায় উটের পিঠে’ (আল হজ্ব্ব, ২৭)। ‘হজ্বের সময় নির্দিষ্ট কয়েক মাস (শাওয়াল, যিলকদ ও যিলহজ্ব্ব এর প্রথম ১০দিন)। অতএব যে এ মাসগুলোতে হজ্বের সিদ্ধান্ত নেয় সে যেন অশ্লীলতা, পাপাচার ও কলহ হতে দূরে থাকে’ (বাকারাহ, ১৯৭)। রসূল (স.) বলেন, ‘ইসলাম ৫টি স্তম্ভের উপর প্রতিষ্ঠিত। ১. এ সাক্ষ্য দেয়া যে, আল্লাহ ছাড়া কোন উপাস্য নেই এবং আরও সাক্ষ্য দেয়া মুহাম্মাদ (স.) তাঁর রসূল ২. নামায প্রতিষ্ঠা করা ৩. যাকাত প্রদান করা ৪. রমযানের রোযা রাখা এবং ৫. আল্লাহর ঘরের হজ্ব্ব করা’ (বুখারী, মুসলিম)। আবু হুরায়রা রা. বলেন, রসূল (স.) আমাদের উদ্দেশ্যে ভাষণ দিলেন। তিনি বললেন, ‘হে লোকজন! নিশ্চয় আল্লাহ তোমাদের উপর হজ্ব্ব ফরয করেছেন। অতএব তোমরা হজ্ব্ব করো। এক ব্যক্তি বললো, হে আল্লাহর রসূল! এটা প্রতিবছর? তিনি নীরব থাকলেন। তিনবার এ কথা জিজ্ঞেস করার পর নবীজি বললেন, হ্যাঁ বললে তা (প্রতিবছরের জন্য) বাধ্যতামূলক হয়ে যেত। তোমরা তা পালন করতে পারতে না’ (মুসলিম)। রসূল (স.) বলেন, ‘যে ব্যক্তি আল্লাহর উদ্দেশ্যে হজ্ব্ব করে এবং (তখন) স্ত্রী সম্ভোগ ও অন্যায় আচরণ করে না সে তার জন্মদিনের ন্যায় (নিষ্পাপ) হয়ে ফিরে আসে।’ (বুখারী) ‘আল্লাহর দরবারে (ত্রুটিহীন) হজ্বের প্রতিদান অবশ্যই জান্নাত’ (বুখারী)। ‘তোমরা একত্রে পরপর হজ্ব্ব ও উমরাহ করো। কারণ হজ্ব্ব ও উমরাহ দারিদ্র্য ও পাপ দূর করে যেমন হাঁপরের আগুন লোহা ও সোনা-রূপার ময়লা দূর করে’ (তিরমিযী)। ‘যে ব্যক্তি হজ্ব্ব ও উমরাহর নিয়ত করেছে সে যেন তা অবিলম্বে করে। কারণ মানুষ কখনো অসুস্থ হয়, কখনো প্রয়োজনীয় জিনিস বিলুপ্ত হয় এবং কখনো অপরিহার্য প্রয়োজন এসে যায়’ (আবু দাউদ)। ‘হজ্ব্ব ও উমরাহ পালনকারীরা দাওয়াতি যাত্রীদল (আল্লাহর মেহমান)। তারা যদি আল্লাহর কাছে দো‘আ করে তা আল্লাহ কবুল করেন এবং যদি ক্ষমা চায় তাহলে তিনি তাদের ক্ষমা করেন’ (ইবন মাজাহ)। ‘নিশ্চয় রমযানের উমরাহ একটি হজ্বের সমান’ (বুখারী)।
