হজ্ব নতুন জীবনের উন্মেষ ঘটায়

আপডেট : ২৬ সেপ্টেম্বর ২০১৩, ১৭:৫৩
আমি হজ্বে গিয়েছিলাম ২০০২ সালে। সে সময় আমার মন-মানসিকতায় চিন্তায়-চেতনায় শয়নে-স্বপনে জাগরণে প্রতি মুহূর্তে এক অনাবিল আনন্দের হিল্লোল প্রবাহিত হচ্ছিল। অন্তর আত্মায় ঢেউ খেলে যাচ্ছিল রসূল প্রেমের উত্তাল তরঙ্গমালা। হূদয়ে বয়ে যাচ্ছিল বেহেশিত আবহের শেফালী শুভ্র প্রভাতী প্রশান্তির সমীরণ। আমি ব্যাকুল হয়ে অপেক্ষার প্রহর গুণছিলাম। সারাজীবন যে রাব্বুল আলামীনের পথে চলেছি সেই প্রভু পরোয়ার দেগারের পবিত্র ঘরের তাওয়াফ করবো। সারা জীবন যে নবীর প্রেমে মশগুল থেকে তাঁর সুন্নাহ মোতাবেক দৈনন্দিন জীবন যাপনে সাধ্য-সাধনা করেছি, যাঁর নাম এ হূদয়ে প্রতি মুহূর্তে ধ্বনিত প্রতিধ্বনিত ও গুঞ্জরিত হয়। সেই প্রিয় নবীজীর পদচারনার ভূমি, তাঁর স্মৃতিবিজড়িত স্থান, তাঁর পবিত্র রওজা মোবারকে যাবো, তাঁকে ছালাম জানাবো। তিনি আমার মত অধমের ছালামের জবাব দেবেন। এটা ভাবতেই আমার হূদয়ের বাগানে রসূল প্রেমের যে বৃক্ষ পত্র পল্লবে ছেয়ে গিয়েছে। তা ফুলে ফলে সুশোভিত করে তুলছিল। প্রতিদিন চলতাম, ফিরতাম, নামাজ পড়তাম আর ভাবতাম, যে কাবা ঘর আল্লাহ সুবহানাহুওয়াতালার আরশে আজীমের সরাসরি নিচে। যে কাবার আঙ্গিনা সকল নবী রসূলের পদচারনায় মুখরিত হয়েছে। সেজদায় ধন্য হয়েছে। সেই স্থানে আমার মত নগণ্য মানুষের পা পড়বে, সেজদায় মস্তক লুটিয়ে পড়বে, এটা ভাবতেই আমার শরীরে এক অজানা শিহরণ জেগে উঠতো। অবশেষে আমাদের ফ্লাইটের দিন এলো। আমরা আল্লাহর নাম নিয়ে রওয়ানা হলাম। নির্দিষ্ট সময়ে পবিত্র ভূমি সৌদি আরবে পৌঁছলাম। তারপর যখন সর্বপ্রথম স্বচক্ষে কাবাঘরকে দেখলাম তখন চোখের পানি ধরে রাখতে পারিনি। এরপর কাবা ঘরে নামাজ পড়লাম। মাকামে ইব্রাহিমে নামাজ পড়লাম। এরপর হজ্বের দিন সমাগত হলো। আমারা মিনার সেই ঐতিহাসিক প্রান্তরে গেলাম, যেখানে মুসলিম জাতির পিতা হযরত ইব্রাহিম (আ.) তাঁর প্রাণপ্রিয় পুত্র ইসমাইল (আ.)কে কুরবানী করতে সচেষ্ট হয়েছিলেন। সেখানে সারা দিন সারারাত থেকে পরের দিন ভোরবেলা আরাফায় এলাম। সেখানে খুত্বা শুনলাম। জোহর-আসর এক সঙ্গে নামাজ পড়লাম। তারপর সন্ধ্যায় মুজদালেফায় পৌঁছলাম। সারারাত সেখানে অবস্থান করে ভোরে আবার মিনায় গেলাম। সেখানে শয়তানকে কংকর নিক্ষেপ করলাম। মাথামুণ্ডন করলাম। তারপর কাবায় তাওয়াফ করতে এলাম। কালো পাথরে চুম্বন করলাম। জাবালে নূর, জাবালে সওর, জাবালে আবু কুবাইস, রসূলুল্লাহ (স.) এর বাড়ী, ওয়াদিয়ে মুহাসসার গজবের জায়গা, হযরত আবু বকর (রা.) এর বাড়ী পরিদর্শন করলাম। সবশেষে মদীনায় রওয়ানা হলাম। মদীনার শান্ত শীতল আবহাওয়া হূদয় কাড়লো। যেদিন দূর থেকে প্রথম মসজিদে নববীর মাঝে রসূল (স.) এর পবিত্র রওজা মোবারক দৃষ্টিগোচর হলো। মন যেন এক অজানা প্রশান্তিতে ভরে গেল। নবীজীর প্রতি যে ভালোবাসা তা যেন উথলে উঠলো। ঐতো আমাদের প্রিয় নবীজীর রওজা! ঐতো আমাদের প্রিয় নবী, প্রিয় রসূল (স.) ঘুমিয়ে আছেন। রওজার কাছে গেলাম। রসূল (স.) কে ছালাম জানালাম। তখন দুচোখ বেয়ে আনন্দ অশ্রু গড়িয়ে পড়ছিল। দ্বীনের দাওয়াতে কত নির্যাতনের শিকার হয়েছেন তিনি। তায়েফে রক্তেরঞ্জিত হয়েছেন, ওহুদে দাঁত মোবারক শহীদ হয়েছে-জখম হয়েছেন। কাফেরদের কত অত্যাচার সহ্য করেছেন অথচ এক মুহূর্তের জন্যও বদদোয়া করেননি। কত বড় রহমতের দরিয়া, দয়ার সাগর তিনি ছিলেন। এসব চিন্তায় চিন্তায় আমার শরীর তোলপাড় হয়ে যাচ্ছিল। আমি আবেগাপ্লুত হয়ে পড়ছিলাম। যে নবী (স.) ছাড়া কেয়ামতের কঠিন দিনে আমার জন্য কোনো সুপারিশকারি নেই। যিনি আমাকে তাঁর উম্মত হিসেবে গ্রহণ না করলে আমার মুক্তির কোনো রাস্তা নেই। সেই প্রিয় নবীজীর প্রতি দুরূদ ছালাম পেশ করলাম। রিয়াজুল জান্নায় নামাজ পড়লাম। মসজীদে নববীতে ৮ দিনে ৪০ ওয়াক্ত নামাজ পড়লাম। তারপর মসজিদে জুমআ, মসজিদে কুব্বা, বদরের প্রান্তর ওহুদের প্রান্তরসহ বিভিন্ন দর্শনীয় স্থান পরিদর্শন করলাম। সবশেষে যখন বিদায়ের দিন এলো, মন তখন ভারাক্রান্ত হয়ে পড়লো। তারপর চলে এলাম। কিন্তু মনটা পড়ে রয়েছে আজো সেখানে, যেখানে চিরনিদ্রায় শায়িত রয়েছেন আখেরী নবী সায়্যেদুল মুরসালিন হযরত মুহাম্মদ (স.)। তাই বারবার মন চায় আবারো চলে যাই রসূলের সোনার মক্কা ও মদীনায়। অনুলিখন :আব্দুল্লাহ আল মাসুদ