চলতি প্রিমিয়ার লিগের দলবদল হয়েছে যে ‘প্লেয়ার বাই চয়েস’ পদ্ধতিতে, সেটাকে অনেকে আবাহনী কর্মকর্তাদের আবিষ্কার বলে অভিহিত করতে পছন্দ করেন। নিন্দুকদের অভিযোগ সত্যি হলে দেশের অন্যতম ঐতিহ্যবাহী ক্লাব আবাহনী লিমিটেড এখন সেই পদ্ধতির মাশুল দিতে ব্যস্ত!
লিগের প্রথম চার ম্যাচে গতকাল তৃতীয় হারের মুখ দেখেছে আবাহনী! তাও আবার লিগে নবাগত কলাবাগান অ্যাকাডেমির কাছে পরাজয়। গতকাল বিকেএসপির তিন নম্বর মাঠে ৮ উইকেটের বিশাল ব্যবধানে হেরেছে আকাশী-নীল জার্সির আবাহনী।
আবাহনীর এই দুর্দশার দিনে বড় ধাক্কা খেয়েছে দারুণ গতিতে ছুটতে থাকা মোহামেডানও। শেখ জামালের বিপক্ষে খর্বশক্তির দল হিসাবে মাঠে নামা মোহামেডানের পরাজয়টা এমন কিছু বিস্ময়কর নয়। কিন্তু দলটি এবারের লিগে নিজেদের প্রথম হারের মুখ দেখল ২৩৯ রানের পর্বতসমান ব্যবধানে। অধিনায়ক মাশরাফি ও ইনফর্ম দুই বিদেশির অনুপস্থিতিতে মোহামেডান অলআউট হল ৬৭ রানে!
গতকাল দিনের একমাত্র স্বাভাবিক ফল এসেছে ফতুল্লায়। অ্যাঞ্জোলো ম্যাথুসের অলরাউন্ড পারফরম্যান্সে ব্রাদার্স ইউনিয়ন এখানে ৮ উইকেটে হারিয়েছে খেলাঘর ক্রীড়াচক্রকে।
চলছে আবাহনীর পরাজয়-যাত্রা
দেশি খেলোয়াড় সংগ্রহে শুরুতেই এতোটাই পিছিয়ে ছিল আবাহনী যে, এবার তাদের বড় দল বলে স্বীকার করাটাই কষ্ট ছিল। আগেও দু-একবার আবাহনী এমন খর্ব শক্তির দল করে কখনো বিদেশিদের দাপটে, কখনো এক-দুজন পারফরমারের জোরে, লিগের প্রতিযোগিতায় টিকে ছিল। এবার কোনো ওষুধেই কাজ হচ্ছে না।
দেশিরা তো বটেই; বিদেশিরাও আবাহনীকে টানতে পারছেন না। ফলে একটার পর একটা দুর্বল দলের কাছেও হেরে চলেছে তারা। গতকাল শিকার হয়েছে আবাহনী কলাবাগানের দ্বিতীয় দল অ্যাকাডেমির কাছে।
বিকেএসপিতে বৃষ্টিবিঘ্নিত ম্যাচে টসে হেরে ব্যাট করতে যায় আবাহনী। ৩৪ ওভারের ম্যাচে ওপেনার ও অধিনায়ক শাহরিয়ার নাফীস চেষ্টা করেছিলেন একটা ভালো শুরু এনে দেয়ার। কিন্তু ৮৯ রানে ৪ উইকেট হারিয়ে ধুঁকতে শুরু করে দলটি। এরপর দারুণ ফর্মে থাকা মোসাদ্দেক ও শ্রীলঙ্কান কানডাম্বি ৮২ রানের জুটি করে দলকে ১৭১ রান পর্যন্ত নিয়ে যান। ফলে রানরেটও নিতান্ত খারাপ হয়নি।
কলাবাগান অ্যাকাডেমির সামনে ৩৪ ওভারে ১৮৯ রানের লক্ষ্য দাঁড়ায়; প্রায় ওভারপ্রতি ৬ রান করে তুলতে হত তাদের। এই লক্ষ্যটাকেই খুব সহজ বানিয়ে দেন ওপেনার মিজানুর ও তিন নম্বরে নামা হ্যামিলটন মাসাকাদজা। ১৫ রানেই এক উইকেট হারানো অ্যাকাডেমিকে তৃতীয় উইকেটে ১৬৬ রান যোগ করে দেন এই দুজন। তাতেই কার্যত ম্যাচ বেরিয়ে আসে। মিজানুর ৯৪ বলে ৭টি চার ও ২টি ছক্কায় সাজানো ইনিংস খেলে সেঞ্চুরি থেকে ৯ রান দূরে আউট হয়ে ফেরেন। তবে মাসাকাদজা ৮৫ রানে অপরাজিতই থাকেন।
শেখ জামালের একপেশে জয়
এই রাউন্ডের আগ পর্যন্ত মোহামেডানই এককভাবে এবারের ঢাকা লিগে শীর্ষ দল ছিল। বিপরীতে শেখ জামাল এক ম্যাচ হারলেও তারকার ঝলকানিতে পূর্ণ দলটি। ফলে গতকাল মিরপুরে এই দুই দলের হাড্ডাহাড্ডি লড়াই আশা করছিলেন অনেকে।
কিন্তু মোহামেডানে মাশরাফি বিন মুর্তজা, মোহাম্মদ নবী ও তিলকরত্নে দিলশানের অনুপস্থিতি ম্যাচ শুরুর আগেই লড়াইয়ের সম্ভাবনা কমিয়ে দেয়। তারপরও এমন ফলাফল কেউ কল্পনা করেননি।
আগে ব্যাট করতে নেমে শেখ জামাল ৩০৬ রানের বিশাল পুঁজি গড়ে। তাদের প্রথম পাঁচ ব্যাটসম্যানের প্রত্যেকে বড় স্কোর করে গেছেন। এর মধ্যে আফগানিস্তানের গুলাবদিন নাইবের ৫৪ বলে ৬টি চার ও ৭টি ছক্কায় সাজানো ৯৩ রানের ইনিংসই শেখ জামালকে বিশাল রানের চূড়ায় পৌঁছে দেয়। মোহামেডানের শ্রীলঙ্কান ‘রহস্য স্পিনার’ অজন্তা মেন্ডিস ৩ উইকেট নিয়েও খুব ভূমিকা রাখতে পারেননি।
মিরপুরের ব্যাটিং সহায়ক উইকেটে এই রানও পাড়ি দেয়া অসম্ভব ছিল না। কিন্তু দফায় দফায় বৃষ্টিতে বাধা পেতে থাকা ম্যাচে যেন ব্যাটিংই করতে ভুলে গেলেন মোহামেডানের ব্যাটসম্যানরা। ফলে ২২.৪ ওভারে ৬৭ রানে অলআউট তারা! এলটন চিগুম্বুরা ১৩ রানে ৪ উইকেট নিয়ে কার্যত শেষ করে দেন মোহামেডানকে।
এগিয়ে চলেছে ব্রাদার্স ইউনিয়ন
লিগে নিজের প্রথম ম্যাচে ধাক্কা খাওয়ার পর গত তিন রাউন্ডে অনেক সুসংহত চেহারায় এসে দাঁড়িয়েছে ব্রাদার্স ইউনিয়ন। প্রতি ম্যাচেই তাদের তারকারা কেউ না কেউ পারফরম করছেন। গতকাল যেমন ব্যাটে-বলে জয়ের নায়ক হয়ে দাঁড়ালেন অ্যাঞ্জোলো ম্যাথুস।
খেলাঘরকে আগে ব্যাটে মাত্র ১০২ রানে অলআউট করে দেয়ায় প্রধান ভূমিকা রাখলেন ম্যাথুস; ১৭ রানে নিলেন ৩ উইকেট। জবাব দিতে নেমে মাত্র ২ উইকেট হারিয়ে লক্ষ্যে পৌঁছে যায় ব্রাদার্স। সেখানেও অপরাজিত ৫১ রান করে ম্যাচসেরা শ্রীলঙ্কান অলরাউন্ডার।
সংক্ষিপ্ত স্কোর
আবাহনী-কলাবাগান অ্যাকাডেমি
আবাহনী লিমিটেড: ৩৪ ওভারে ১৮৮/৬ (মোসাদ্দেক ৬২, কানডাম্বি ৫৩, নাফীস ২৬; দেওয়ান সাব্বির ৩/৪৭, শরিফউল্লাহ ২/৩৪, অপু ১/৩০)।
কলাবাগান অ্যাকাডেমি: ৩০.৫ ওভারে ১৮৯/২ (মিজানুর ৯১, মাসাকাদজা ৮৫*; আল আমিন ১/৩২, নাবিল ১/৩৪)।
ফল: কলাবাগান ৮ উইকেটে জয়ী।
ম্যান অব দ্য ম্যাচ: মিজানুর রহমান।
শেখ জামাল—মোহামেডান
শেখ জামাল: ৫০ ওভারে ৩০৬/৭ (গুলবাদিন ৯৩*, মুনাবীরা ৫১, মুশফিক ৫০, জুনায়েদ ৪৭, জহুরুল ৩৩, বাশার ২২; অজন্তা মেন্ডিস ৩/৫৫)।
মোহামেডান: ২২.২ ওভারে ৬৭/১০ (সামসুর রহমান ২২; চিগুম্বুরা ৪/১৪, সানি ২/৪)।
ফল: শেখ জামাল ২৩৯ রানে জয়ী।
ম্যান অব দ্য ম্যাচ: গুলাবাদিন নাইব।
খেলাঘর-ব্রাদার্স
খেলাঘর: ৩৩.৪ ওভারে ১০২/১০ (ভ্যানডর্ট ৩৫, ইফতেখার ২২; ম্যাথুস ৩/১৭, সেনানায়েকে ২/১২, সানজামুল ২/২৫)।
ব্রাদার্স ইউনিয়ন: ২৪.৫ ওভারে ১০৩/২ (ম্যাথুস ৫১*, তামিম ২১; রিপন ১/৩)।
ফল: ব্রাদার্স ইউনিয়ন ৮ উইকেটে জয়ী।
ম্যান অব দ্য ম্যাচ: অ্যাঞ্জোলো ম্যাথুস।
