সমপ্রতি গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয় সমাজসেবা অধিদপ্তরের মাধ্যমে দেশে প্রতিবন্ধী ব্যক্তি শনাক্তকরণ জরিপ শুরু করেছে। এই জরিপ বাংলাদেশে প্রতিবন্ধী ব্যক্তির সংখ্যা, আর্থ-সামাজিক অবস্থাসহ তাদের বিস্তারিত তথ্য জানতে সহায়তা করবে। কারণ এখনো পর্যন্ত বাংলাদেশে প্রতিবন্ধী বিষয়ে “মোট জনসংখ্যার ১০% প্রতিবন্ধী ব্যক্তি” বিশ্বস্বাস্থ্য সংস্থার এই গড়সমীক্ষা ছাড়া আর কোনো জাতীয় তথ্য নেই। কিন্তু এই গড় তথ্য কোনো একটি দেশের প্রতিবন্ধীদের বাস্তব চিত্র তুলে ধরে না। ফলে বাংলাদেশে প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের উন্নয়নে কর্মরত বেসরকারি উন্নয়ন সংগঠনগুলো নিজেদের এলাকাভিত্তিক জরিপ করে তাদের কর্মকাণ্ড পরিচালনা করছে। ১৯৯৬ সালে নেত্রকোণা জেলার বেসরকারি প্রতিবন্ধী সংগঠন ‘পল্লী প্রতিবন্ধী উন্নয়ন সংস্থা’র জরিপে জেলার ৫.৪% ব্যক্তিকে প্রতিবন্ধী হিসেবে শনাক্ত করা হয়। বাংলাদেশের বেসরকারি স্বেচ্ছাসেবী প্রতিবন্ধী সংগঠনগুলোর সমন্বয়কারী সংস্থা ‘জাতীয় প্রতিবন্ধী ফোরাম’, ঢাকা ২০০৫ সালে এক জরিপে ৫.৬% ব্যক্তিকে প্রতিবন্ধী হিসেবে শনাক্ত করে। ২০১১ সালে গৃহ গণনা ও আদমশুমারি অনুযায়ী ১.৪% ব্যক্তিকে প্রতিবন্ধী হিসেবে শনাক্ত করা হয়। অর্থাত্ দেখা যায় বিভিন্ন ব্যক্তি, প্রতিষ্ঠান ও গবেষণা সংস্থা ভিন্ন ভিন্ন ধরনের জরিপ তথ্য ব্যবহার করে প্রতিবন্ধীদের সংখ্যা নিরূপণ করছে। কিন্তু দেশে প্রতিবন্ধীদের বিষয়ে জাতীয় কোনো একক তথ্য নেই। আশা করছি সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের এই জরিপ থেকে জাতীয় একটি তথ্য পাওয়া যাবে।
প্রতিবন্ধী শনাক্তকরণ জরিপ যে কোনো ধরনের জরিপ থেকে একটু ভিন্নমাত্রায় ও পদ্ধতিতে কয়েকটি ধাপে সম্পাদন করতে হয়। এক্ষেত্রে প্রথম ধাপের কাজ হবে বৃহত্তর জনগোষ্ঠীতে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা প্রতিবন্ধী ব্যক্তিকে খুঁজে বের করে একটি তালিকা তৈরি করা। অতঃপর দ্বিতীয় ধাপের কাজ হবে কোনো নির্ভরযোগ্য ও বৈজ্ঞানিক অভীক্ষা বা স্কেল প্রয়োগ করে এই তালিকা থেকে প্রতিবন্ধী ব্যক্তির ধরন, প্রতিবন্ধিতার মাত্রা, বৈশিষ্ট্য, প্রতিবন্ধী হওয়ার সম্ভাব্য কারণ ইত্যাদি শনাক্তকরণ এবং সেইসঙ্গে প্রতিবন্ধী ব্যক্তির পুনর্বাসন, চিকিত্সা, শিক্ষা, প্রশিক্ষণ, আইনগত অধিকারসহ আর্থ-সামাজিক অবস্থা ইত্যাদি চিহ্নিত করা। এই দ্বিতীয় ধাপের কাজ বাস্তবায়নে থাকবে প্রতিবন্ধিতা বিষয়ে প্রশিক্ষিত ডাক্তার, মনোবিজ্ঞানী, ফিজিওথেরাপিস্ট, স্পিচথেরাপিস্ট, অকুপেশন-থেরাপিস্ট, ইএনটিস্ট, বিশেষ শিক্ষক, পিতা-মাতা ও সমাজকর্মীসহ একদল দক্ষ কর্মী; যাঁদের সহায়তায় কোনো ব্যক্তির প্রতিবন্ধিতা চূড়ান্তভাবে চিহ্নিত হবে। যদিও আমাদের দেশের মতো একটি উন্নয়নশীল দেশের পক্ষে এধরনের বিরাট কর্মীবাহিনী তৈরি করে জরিপ করা একটি চ্যালেঞ্জিং বিষয়। তবে এ ক্ষেত্রে প্রতিবন্ধিতা বিষয়ে মাল্টিফোল স্কিল-এর প্রশিক্ষিত লোক দ্বারাও এই ধাপটি সম্পাদন করা যায়। দ্বিতীয় ধাপের কাজের শেষে প্রতিবন্ধী ব্যক্তির শ্রেণি, ধরন ও মাত্রা অনুযায়ী চূড়ান্ত তালিকা তৈরি করতে হবে।
প্রতিবন্ধী ব্যক্তি শনাক্তকরণ জরিপে প্রথমে ‘প্রতিবন্ধী ব্যক্তি’ কাকে বলে, সে বিষষে একটি আইনগত ও বস্তুনিষ্ঠ বিজ্ঞানসম্মত ধারণা থাকা প্রয়োজন। ‘প্রতিবন্ধী কল্যাণ আইন ২০০১’ অনুযায়ী ‘প্রতিবন্ধী’ অর্থ এমন ব্যক্তি যিনি ক) জন্মগতভাবে বা রোগাক্রান্ত হয়ে বা দুর্ঘটনায় আহত হয়ে বা অপচিকিত্সায় বা অন্য কোনো কারণে দৈহিকভাবে বিকলাঙ্গ বা মানসিকভাবে ভারসাম্যহীন এবং খ) উক্তরূপ বৈকল্য বা ভারসাম্যহীনতার ফলে অ) স্থায়ীভাবে আংশিক বা সম্পূর্ণ কর্মহীনতা এবং আ) স্বাভাবিক জীবনযাপনে অক্ষম। ২০০৭ সালে প্রকাশিত জাতিসংঘের প্রতিবন্ধী ব্যক্তিবর্গের অধিকার সনদ এবং ঐচ্ছিক প্রতিপালনীয় বিধানে বলা হয় ‘প্রতিবন্ধী ব্যক্তিবর্গ হলেন তাঁরা যাঁদের দীর্ঘমেয়াদী শারীরিক, মানসিক, বুদ্ধি বা ইন্দ্রিয়গত অসুবিধা রয়েছে যা নানান প্রতিবন্ধকতার সঙ্গে মিলেমিশে সমাজে অন্যদের সঙ্গে সমতার ভিত্তিতে তাদের পূর্ণ ও কার্যকর অংশগ্রহণে বিঘ্ন ঘটায়।’ একটি উদাহরণ দিয়ে বিষয়টি পরিষ্কার করা যেতে পারে। যেমন ধরুন আমি একটি প্রতিষ্ঠানে চাকরি করি, কিছুদিন ধরে আমার চোখে দেখতে সমস্যা হচ্ছে। কাছের জিনিসটিও চোখে ভালো দেখতে পাচ্ছি না। দেখার ক্ষেত্রে এই প্রতিবন্ধকতাকে চিকিত্সাবিজ্ঞানের ভাষায় বলা হয় ইম্পয়ারম্যান্ট বা দুর্বল করা, ক্ষতি করা। আমি ডাক্তারের কাছে গেলাম, ডাক্তার ভালো করে চোখ পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে দেখলেন, আমার দেখার ক্ষেত্রে যে প্রবিন্ধকতাটি তৈরি হয়েছে সেটি চিকিত্সাবিজ্ঞানের বাইরে চলে গেছে এবং এর কোনো চিকিত্সা দেশে-বিদেশে কোথায়ও নেই। আমার চোখের এই সমস্যাটি আর আগের মতো ভালো হবে না। আর এই চিকিত্সা অযোগ্য স্থায়ী সমস্যাটিকে বলা হয় ডিজঅ্যাবিলিটি বা প্রতিবন্ধিতা আর আমি ব্যক্তিটি হলাম ডিজঅ্যাবল বা প্রতিবন্ধী। আমি প্রতিবন্ধী হলাম বলে সামাজিকভাবে যদি কোনো কাজে বাধাগ্রস্ত হই বা প্রতিবন্ধিতার জন্য আমি আমার চাকরি হারাই তখন আমাকে বলা হবে হ্যান্ডিকেপ বা চাপিয়ে দেওয়া বাধা। অর্থাত্ প্রতিবন্ধিতা হলো ব্যক্তির একটি স্থায়ী কর্মক্ষমতার বাধা এবং যা চিকিত্সা অযোগ্য। আর যদি বিষয়টি চিকিত্সাযোগ্য হয় তাহলে ব্যক্তিটি হবেন রোগী। কাজেই জরিপে আমরা রোগীদের শনাক্ত করবো না— আমরা চিকিত্সা অযোগ্য প্রতিবন্ধীদের শনাক্ত করবো।
হয়তো সরকার সেই দৃষ্টিকোণ থেকে ধাপগুলো অতিক্রম করে জরিপ কাজটি সম্পাদন করছেন। তারপরও জরিপে কিছু ভুল-ত্রুটির সম্ভাবনা রয়েছে। যেমন প্রতিবন্ধী শনাক্তকরণ জরিপ ফরম ২০১৩-এর ‘খ’ অংশের ৪৬ নম্বর ক্রমিকে দশ ধরনের প্রতিবন্ধী ব্যক্তির কথা উল্লেখ রয়েছে। কিন্তু সেখানে সেকশন ৩-এর দৃষ্টি প্রতিবন্ধী শনাক্তকরণে তিনটি প্রশ্ন করা হয়েছে— ১) চোখে দেখতে অসুবিধা হয় কিনা? ২) চশমা থাকা সত্ত্বেও চোখে দেখতে অসুবিধা হয় কিনা? ৩) অন্যদের তুলনায় দিনে বা রাতে দেখতে অসুবিধা হয় কিনা? কিন্তু প্রতিবন্ধী কল্যাণ আইন ২০০১-এর ধারা (২)(ক) অনুযায়ী অ) ‘এক চোখে দৃষ্টি নাই’ তারাও দৃষ্টি প্রতিবন্ধী। কিন্তু মাঠ তথ্য ফরমে যেহেতু এক চোখের দৃষ্টি প্রতিবন্ধীদের বৈশিষ্ট্যের এই ধারাটি উল্লেখ নেই সেজন্য জরিপে একচোখ বিশিষ্ট দৃষ্টি প্রতিবন্ধীরা মাঠ পর্যায়েই বাদ পড়বে। এছাড়া এখনো পর্যন্ত শনাক্তকৃত কিছু অদৃশ্য প্রতিবন্ধিতা যেমন অটিজম, বুদ্ধি প্রতিবন্ধিতা, আচরণ সমস্যাগ্রস্ত ব্যক্তি, শিখন প্রতিবন্ধী ব্যক্তি প্রমুখ প্রতিবন্ধীর মাঠ জরিপে বাদ পড়ার সম্ভাবনা রয়েছে। তাদের পাগল মনে করে বাদ দিতে পারে বা পাগলদের বুদ্ধি প্রতিবন্ধী বা অটিজম বলে উল্লেখ করতে পারে। কিন্তু পাগল বা মানসিক অসুস্থতা একটি রোগ এবং এটি চিকিত্সাযোগ্য— সুতরাং তারা প্রতিবন্ধী নয়। আবার আমাদের দেশে বুদ্ধি প্রতিবন্ধিতাসহ অন্যান্য অদৃশ্য প্রতিবন্ধিতা শনাক্তকরণে কোনো নির্ভরযোগ্য পদ্ধতি বা স্কেল তৈরি হয়নি এবং ঐ জরিপেও সকল জনসাধারণের ওপর আইকিউ টেস্ট বা আচরণ পরিমাপ করা হবে না। ফলে বুদ্ধি প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের সহজ সরল মানুষ মনে করে জরিপ থেকে বাদ দেবার সম্ভাবনা রয়েছে। কারণ স্বল্প মাত্রার একজন বুদ্ধি প্রতিবন্ধী ব্যক্তি স্বাভাবিক বুদ্ধির দশ-এগার বছরের একজন সাধারণ শিশুর মতো আচরণ করে, তাদের মাঠপর্যায়ে চিহ্নিত করার মতো কতটা প্রশিক্ষণ দিয়ে তথ্য সংগ্রহ করা হচ্ছে সেটাই চিন্তার বিষয়। কাজেই স্বল্পমাত্রার বুদ্ধি প্রতিবন্ধীসহ সবধরনের স্বল্পমাত্রার প্রতিবন্ধীর মাঠ তথ্য থেকে বাদ পড়ার সম্ভাবনা রয়েছে। শুধু ইতিপূর্বে যাঁরা পরিবার বা কোনো প্রতিবন্ধী সংগঠন দ্বারা মধ্যম ও গুরুতর মাত্রার প্রতিবন্ধী হিসেবে চিহ্নিত শুধু তাঁরাই জরিপে আসবেন। বাকিদের চিহ্নিত করার মতো কোনো ব্যবস্থা ঐ জরিপে দেখা যাচ্ছে না।
জাতীয় ভোটার তালিকা বা জাতীয় আদম শুমারির মতো প্রতিবন্ধী জরিপ নিয়ে তেমন কোনো প্রচারণা নেই। ফলে অনেকেই জানেন না যে দেশে প্রতিবন্ধী শনাক্তকরণ জরিপ চলছে। প্রতিবন্ধী জনগোষ্ঠীর একটি বড় অংশ এখনো কুসংস্কার, অন্ধ বিশ্বাস, ভ্রান্ত ধারণা, অশিক্ষায় নিমজ্জিত। অনেকে লোকলজ্জার ভয়ে প্রিয় সন্তাটিকে লুকিয়ে রাখেন। অথচ জরিপে অন্তর্ভুক্ত না হলে ঐসমস্ত প্রতিবন্ধী ব্যক্তি অসচ্ছল প্রতিবন্ধী ভাতা, শিক্ষা উপবৃত্তি, সুদমুক্ত ঋণ, সরকারি চাকরিতে কোটা, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ভর্তি, আয়কর রেয়াত, বিভিন্ন দপ্তরে সুদমুক্ত ঋণ, পরিবহনে বিশেষ আসন ও রেয়াতি হারে ভাড়া দেওয়ার সুযোগ, সরকারি হাসপাতালে চিকিত্সা সহায়তা, প্রশিক্ষণে ভর্তি কোটা, আবাসিক কোটা, সরকারি চাকরিতে বয়স সীমা শিথিল এবং প্রস্তাবিত প্রতিবন্ধী সুরক্ষা আইনে নানা সুযোগ-সুবিধা থেকে বঞ্চিত হবেন। পরবর্তীকালে এলাকায় যে কোনো উন্নয়ন কর্মসূচি জরিপকৃত প্রতিবন্ধীদের সংখ্যার ওপর ভিত্তি করে বণ্টন করা হবে। কাজেই দেশের সকল প্রতিবন্ধীর জরিপ তালিকায় অন্তর্ভুক্ত হওয়া খুব জরুরি।
নেত্রকোনা
