জলের বন রাতারগুল

আপডেট : ২৭ সেপ্টেম্বর ২০১৩, ২২:০৬
জলের মধ্যে নিন্মাঙ্গ ডুবিয়ে হাত ধরাধরি করে দাঁড়িয়ে আছে সারি সারি গাছ। গাছের কালো কালো ডালপালা আর সবুজ পত্র-পল্লব ভেদ করে মাঝে মধ্যে ঢুকে পড়ছে সূর্যের আলো। কাঁচের মত মসৃণ নিথর জলে গাছের ডালপালার প্রতিবিম্ব যেন এক নৈসর্গিক সৌন্দর্যে বিভোর করে তোলে মন। সিলেটের গোয়াইনঘাট উপজেলায় অবস্থিত দেশের একমাত্র প্রাকৃতিক জলাবন রাতারগুল ভ্রমণে গেলে এমনই অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হতে হয়। সারাবিশ্বে এরকম মাত্র ২২টি জলাবন রয়েছে। কিন্ত এ বনভূমিকে বন্যপ্রাণীদের অভয়ারণ্য ও সংরক্ষিত বন হিসাবে ঘোষণা করা হলেও এটি সংরক্ষণে নেই কোনো চেষ্টা। গাছচোর আর পর্যটকদের উপদ্রবসহ নানা কারণে এখানকার জীববৈচিত্র্য এখন হুমকির মুখে। তাই রাতারগুল জলাবন রক্ষায় সমন্বিত উদ্যোগ নেয়ার আহবান জানিয়েছেন অর্থমন্ত্রীসহ দেশের পরিবেশবাদীরা। এজন্য ১২ দফা দাবিও জানিয়েছেন তারা। এলাকাবাসী জানান, সংরক্ষিত বনাঞ্চল হলেও রাতারগুলের বিষয়ে উদাসীন বন বিভাগসহ সংশ্লিষ্টরা। যেন কোন দায়ই নেই কারো। তাই ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে এর জীববৈচিত্র্য। পর্যটকদের স্বেচ্ছাচারি মনোভাব, বনের ভেতর মাইক বাজানো, বিস্কুট-চিপসের প্যাকেট, পানির খালি বোতল যত্রতত্র ফেলে রাখা বনের জন্য ক্ষতিকর হয়ে উঠেছে। বনবিভাগের সৃজন করা মূল্যবান জালিবেত ধ্বংসরও আশংকা করেছেন পরিবেশবিদরা। পরিবেশ বিশেষজ্ঞ ও খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক একে ফজলুল হক আশংকা প্রকাশ করে বলেন, রাতারগুলে বন বিভাগ জালিবেতের যে প্লানটেশন করেছে তা ওই বনের মৌলিকত্ব ধ্বংস করে দেবে। বন রক্ষার্থে জালিবেত লাগানো হলেও বাস্তবে জালিবেতের কারণে অন্যান্য গাছের বংশবৃদ্ধি ব্যাহত হতে পারে। এক সময় পুরো বন মৃতপ্রায় হয়ে পড়তে পারে বলে তিনি আশংকা প্রকাশ করেন। জানা গেছে, এই বনের বৈশিষ্ট্য প্রকৃতির সাথে নাকি এর রূপ বদলায়। বর্ষায় এক রকম। হেমন্তে অন্যরকম। ‘রাতারগুলের মোহনীয় সৌন্দর্য একবার দেখলে সেটা আর ভোলা যাবে না’—এই মন্তব্য করে সিলেট অঞ্চলের সহকারী বন সংরক্ষক পরিমল চন্দ্র পাল বলেন, ‘বনের একেক সময় একেক রূপ আমি দেখেছি।’ তিনি জানান, জালিবেত, কদম, হিজল, মূর্তাসহ নানা জাতের গাছে সমৃদ্ধ এই বন। রাতারগুল পৃথিবীর খুব অল্প কিছু মিঠা পানির জলাবনের মধ্যে একটি। গলা বা কোমর পর্যন্ত পানিতে ডুবা হিজল, করচ গাছ পেরিয়ে বনের কিছু দূরে ঢুকার পরই এক নির্জনতা গ্রাস করে। চোখে পড়ে অপরূপ প্রাকৃতিক সৌন্দর্য। এক সময় অজগর, গুইসাপ, গোখরা, জলধুড়া, মেছোবাঘ, কাঠবিড়ালি, বানর, ভোঁদড়, বনবিড়াল, বেজি, শিয়ালসহ নানা প্রজাতির বণ্য প্রাণী ঘুরতো সারাক্ষণ। ঘুঘু, চড়ুই, পানকৌড়ি, চিল, সাদা বক, কানা বক, মাছরাঙ্গা, টিয়া, বুলবুলি, চিল, বালি হাঁসসহ নানা প্রজাতির পাখি উড়ে বেড়াতো গাছে গাছে। কিন্তু এখন আর তেমন দেখা মেলে না। সংশ্লিষ্টরা জানান, বিশেষায়িত এই বনের ভিতরে ঢুকে নিয়ম মানছে না কেউ। পর্যটকদের ইঞ্জিন চালিত নৌকার শব্দে বন্য প্রাণীরা ভয়ে পালাচ্ছে। অথচ এখানের বৈশিষ্ট্যই-নিরবতা। এমনভাবে কথা বলতে বা চলতে হবে যেন বনের ঘুম না ভাঙ্গে। কিন্তু হরহামেশা এই বনের ভিতর পর্যটকরা হৈ-চৈ করে থাকেন, ফলে বনের অস্তিত্বই এখন সংকটে পড়েছে। বন বিভাগের নথিপত্রে দেখা গেছে, তিন হাজার তিনশ’ একুশ একর জায়গা জুড়ে বিস্তৃত প্রাকৃতিকভাবে বেড়ে ওঠা এ বনভূমিকে ১৯৫২ সালে সংরক্ষিত বন ঘোষণা করে বন বিভাগ। সরকারি একটি বিট অফিস থাকলেও সেখানে মাত্র একজন বিট অফিসার ও দুইজন বনরক্ষী রয়েছেন। ফলে প্রায়ই গাছ চোরের দল বন থেকে বিভিন্ন গাছ কেটে নিয়ে যায়। বিভাগীয় বন কর্মকর্তা আবুল বাশার মিয়া বলেন, রাতারগুলকে সরকারিভাবে ‘সোয়াম্প (জলাবন) ফরেস্ট’ হিসাবে ঘোষণা না করা হলেও একে ‘ন্যাশনাল ফরেস্ট’ করার জোর পদক্ষেপ চলছে। সেজন্য সাড়ে ৫ কোটি টাকার একটা বাজেট সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে পাঠানো হয়েছে। তিনি আরো বলেন, এখানে কো-ম্যানেজমেন্ট সিস্টেম চালু করতে হবে। প্রশাসনের পাশাপাশি স্থানীয় জনগণকে কাজে লাগাতে হবে। তাদের বোঝাতে হবে এ বন তাদের এবং রক্ষা করতে হবে তাদেরই। শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশবাদী সংগঠন গ্রিন এক্সপো’র সভাপতি অনিমেষ ঘোষ ও সিলেট কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণী অধিকার বিষয়ক সংগঠন ‘প্রাধিকার’র সাধারণ সম্পাদক জয় প্রকাশ বলেন, দিন দিন রাতারগুলের পরিবেশ দূষিত হয়ে যাচ্ছে। বিনষ্ট হচ্ছে প্রাকৃতিক ভারসাম্য। তারা জানান, কোন বনকে অভয়ারণ্য ঘোষণা করলে, প্রথমেই একে ‘বাফার জোন’ এবং ‘কোর জোন’ এ দুই ভাগে ভাগ করতে হবে। ‘বাফার জোনে’ ট্যুরিস্টদের প্রবেশাধিকার থাকবে। একটা নির্দিষ্ট ট্রেইল বা রাস্তা দিয়ে তারা চলাচল করতে পারবে। আর ‘কোর জোনে’ কর্তৃপক্ষের বিশেষ অনুমতি ছাড়া প্রবেশ করা যাবে না। বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলনের (বাপা) সহ-সভাপতি সুলতানা কামাল সম্প্রতি রাতারগুল সোয়াম্প ফরেস্ট পরিদর্শন শেষে বলেছেন, রাতারগুলের উন্নয়নে সমন্বিত ও সঠিক পরিকল্পনা প্রয়োজন। পরিকল্পনা বাস্তবায়নে পরিবেশ ও বন বিশেষজ্ঞের পাশাপাশি স্থানীয় জনগণকেও সম্পৃক্ত করতে হবে। রাতারগুল রক্ষায় সমন্বিত উদ্যোগ নেয়ার আহবান জানিয়েছেন অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিতও। গত ২৪ সেপ্টেম্বর সিলেট উপশহরে বাপা ও ইউকে বাংলাদেশ এডুকেশন ট্রাস্ট-এর যৌথ আয়োজনে ‘রাতারগুল: জলাবনের ভবিষ্যত্ সুরক্ষা’ শীর্ষক আলোচনা সভায় তিনি বক্তৃতা করেন। সভায় অর্থমন্ত্রী রাতারগুল জলাবনের পরিবেশ রক্ষায় ইঞ্জিন চালিত নৌকা নিয়ে বনের মধ্যে পর্যটকদের প্রবেশে নিষেধাজ্ঞা জারি এবং শাবিপ্রবি’র পরিবেশ বিভাগ, সরকারের বনবিভাগ, সিলেট কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়, স্থানীয় প্রশাসন ও পরিবেশবাদীদের নিয়ে আলোচনার মাধ্যমে গৃহিত উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নের নির্দেশ দেন। একই সাথে বন সংরক্ষণ ও নিরাপত্তায় কমিউনিটি পুলিশিং-এর ব্যবস্থা করা এবং এ বিষয়ক একটি জাতীয় সেমিনার আয়োজনেরও আহবান জানান মন্ত্রী। অনুষ্ঠানে রাতারগুল রক্ষায় ১২ দফা দাবি উত্থাপন করা হয়। এর মধ্যে রয়েছে রাতারগুল জলাবন সুরক্ষায় করণীয় নির্ধারণে বিশেষজ্ঞদের অংশগ্রহণে একটি জাতীয় সেমিনার আয়োজন, বনবিভাগ থেকে আলাদা করে সংরক্ষিত অঞ্চল ঘোষণা, সীমানা চিহ্নিতকরণের মাধ্যমে বনের প্রকৃত আয়তন পরিমাপ, বনের দখলিকৃত জায়গা উদ্ধার করে ‘বাফার জোন’ তৈরি, বনের ‘কোর জোন’ সম্পূর্ণভাবে সংরক্ষিত রাখা, সর্বসাধারণের প্রবেশে নিষেধাজ্ঞা আরোপ, সারা বছর বনে জল থাকার ব্যবস্থা করা, বর্ষাকালে পর্যটকদের জন্য নির্দিষ্ট সংখ্যক নৌযান রাখা, বনের উপর নির্ভরশীল স্থানীয়দের বনরক্ষায় সম্পৃক্ত করা, পর্যটনের নামে অপরিকল্পিত স্থাপনা নির্মাণ প্রতিরোধ, সামাজিক বনায়নের নামে বনের ‘বাফার জোনে’ ক্ষতিকর কোন উদ্ভিদ রোপণ না করা এবং মাছ ধরা বন্ধে কঠোর নজরদারি বাড়ানো। এদিকে রাতারগুল গ্রামবাসী এই বন টিকিয়ে রাখতে সিলেট জেলা প্রশাসকের মাধ্যমে বন ও পরিবেশ মন্ত্রী বরাবর গত মাসে স্মারকলিপি দিয়েছে বলে জানা গেছে।