নির্বাচনকালীন তত্ত্বাবধায়ক সরকার ইস্যুতে সরকার ও বিরোধী জোটের পরস্পরবিরোধী অবস্থানের ফলে আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচন নিয়ে সৃষ্ট অনিশ্চয়তা দেশের বিনিয়োগ পরিস্থিতিকে স্থবির করে তুলেছে। কার্যত শিল্প ও অন্যান্য উত্পাদনশীল খাতে নতুন বিনিয়োগ আসছে না। বিশ্লেষকরা বলছেন, এমনিতেই নানা কারণে দেশের অর্থনীতি এক দুর্যোগপূর্ণ সময় অতিক্রম করছে। তার উপর নির্বাচনী অনিশ্চয়তা পরিস্থিতিকে জটিল করে তুলছে।
বর্তমানে গ্যাস ও বিদ্যুত্ সংকটে শিল্প ও অন্যান্য খাতে ব্যাহত হচ্ছে উত্পাদন। শেয়ারবাজারের ক্ষতিগ্রস্ত বিনিয়োগকারীদের জন্যও সরকার তেমন কিছু করতে পারেনি। সর্বশেষ বিষয় হিসেবে যোগ হয়েছে শ্রমিক অসন্তোষ। সার্বিক পরিস্থিতিতে শেষ সময়ে এসে সরকারের নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী নতুন চাকরির ব্যবস্থা করাও মুশকিল হয়ে পড়েছে। উন্নয়ন ভাবুকরা বলছেন, পুরো পরিস্থিতির জন্য সরকারের অর্থনৈতিক অব্যবস্থাপনা ও নীতিনির্ধারকদের অদূরদর্শিতাই দায়ী।
সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলেছে, জাতীয় নির্বাচনের আগে কী ভাবে নতুন বিনিয়োগ টেনে অর্থনীতিকে চাঙ্গা করা যায়, তা নিয়ে সরকারের সংশ্লিষ্ট মন্ত্রী কিংবা আমলাদের কোন উদযোগই চোখে পড়ছে না। বিশেষজ্ঞরা বলেন, অর্থমন্ত্রীতো ঘোষণাই দিয়েছেন তিনি আর মন্ত্রী হবেন না। কাজেই কাজের প্রতি তার আন্তরিকতার ঘাটতি হতে পারে। একইভাবে অন্যান্য সংস্থাগুলোও সঠিকভাবে কাজ করছে না। মুদ্রানীতি কঠোর করার নামে যেভাবে বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবাহ কমিয়ে ফেলা হয়েছে, আবার সুদের হার বাড়িয়ে দিয়ে ঋণকে অতিমাত্রায় ‘দামি’ করে তুলেছে তাতে বিনিয়োগকারী নিরুত্সাহিত হওয়াই স্বাভাবিক।
ব্যবসায়ী-শিল্পপতিরাতো আরো একধাপ এগিয়েই বললেন, নতুন চাকরি তো দূরের কথা, পরিস্থিতি আরও খারাপ হলে কর্মী ছাঁটাইয়ের পথেও যেতে হবে। ইতিমধ্যে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে কর্মী ছাঁটাইও হচ্ছে। যেহেতু বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে কর্মী নিয়োগ কিংবা ছাঁটাইয়ের কোন নিয়মিত তথ্য প্রদান করতে হয় না, সেকারণে বিষয়টি অনেকেরই নজর এড়িয়ে যাচ্ছে।
সূত্রমতে, রেমিটেন্স প্রবাহ না থাকলে অর্থনীতি আরো আগেই ভেঙে পড়তো। রফতানি খাতও অর্থনীতিকে টিকিয়ে রেখেছে। কিন্তু শেষ সময়ে এসে রফতানি খাতেও যে ধ্বংসলীলা প্রত্যক্ষ করছে জাতি, তাতে দেশের ইমেজ সংকট বাড়বে এবং রফতানিতে নেতিবাচক প্রভাব পড়বে বলেও মন্তব্য করেছেন বাংলাদেশ এক্সপোর্টার্স এসোসিয়েশনের সভাপতি সালাম মুর্শেদী। গার্মেন্টস কারখানা মালিকরা বলেন, যেসব গার্মেন্টস কারখানা সমৃদ্ধ এবং নিয়মিত বেতনভাতা পরিশোধ করা হয় সেগুলোতেই বেশি আক্রমণ হচ্ছে।
বিজিএমইএ নেতৃবৃন্দও মনে করছেন, দেশে গার্মেন্টস শিল্পের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র সামপ্রতি অস্থিরতার মূল কারণ। এদিকে, সুযোগ বুঝে গার্মেন্টস ছাড়া অন্যান্য শিল্প-কারখানায়ও হামলা-উস্কানি দেয়া হচ্ছে। যা শিল্পপতি মহলকে গভীর উদ্বেগের মুখে ফেলেছে।
উদ্যোক্তাদের মতে, সামগ্রিকভাবে বর্তমান যে পরিস্থিতি তার ধাক্কা লেগেছে গাড়ি থেকে শুরু করে বিমান, শিল্পের চাকা থেকে সার, বাজার সব ক্ষেত্রেই। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নিয়মের কারণে আমদানি করা পণ্যের খরচও বেড়ে গেছে। এ রকম পরিস্থিতিতে নতুন বিনিয়োগ এবং শিল্পে উত্পাদনের গতি কমে আসায় কর্মসংস্থানে নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে।
কিন্তু কীভাবে পরিস্থিতি শোধরাবে? এমন প্রশ্নের জবাবে অর্থনীতিবিদ ড. মুহম্মদ মাহবুব আলী বলেন, বিনিয়োগ বৃদ্ধি, সুদের হারের লাগাম টেনে ধরতে দীর্ঘমেয়াদি পদক্ষেপ নিতে হবে। শুধু বেসরকারি খাতে ঋণ কমিয়ে মূল্যস্ফীতি কমানোর উপায় খুঁজলে চলবে না। আমাদের এখানে কর্মসংস্থানকেই বড় করে দেখতে হবে। মানবসম্পদ উন্নয়নের দিকটি বরাবরই অবহেলিত রয়ে যাচ্ছে। মানবসম্পদ মন্ত্রণালয় করে যোগ্য লোককে দায়িত্ব দিলে এই মানবসম্পদই বদলে দিতে পারবে আমাদের অর্থনীতির চেহারা।
