দায়ীদের শাস্তি না হওয়ায় স্বস্তি ফেরেনি বৌদ্ধ সমাজে

আপডেট : ২৮ সেপ্টেম্বর ২০১৩, ২২:২৩
‘যখন এক বছর আগের কথা চিন্তা করি, খুব কষ্ট পাই। যখন নবনির্মিত বিহারের সামনে দাঁড়াই, বেশ স্বস্তি পাই, মনের ক্ষতও অনেক শুকিয়ে যায়। কিন্তু রাস্তায় বের হয়ে যখন দেখি সেই রাতের হামলাকারীরা প্রকাশ্যে ঘুরছে, তখন সেই কালো রাতের স্মৃতিচিহ্ন মনের ভেতরে আবারও দগদগ করে জ্বলে ওঠে।’ গত বছরের ২৯ সেপ্টেম্বরের রাতের হামলার পর বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে জানতে চাইলে একথা বলেন, বৌদ্ধ সমাজের নেত্রী ও রামু কলেজের শিক্ষক ববিতা বড়ুয়া। গত ২৯ সেপ্টেম্বর রাতে উগ্রপন্থীরা ১২টি বিহারসহ ববিতা বড়ুয়ার বাড়িও পুড়িয়ে দিয়েছিল। এসময় আতংকিত বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বীরা প্রতিবেশীদের বাড়িতে এবং ধানক্ষেতে আশ্রয় নেন। ববিতা বড়ুয়া বলেন, সেই দিনের হামলার পর মাননীয় প্রধানমন্ত্রী বৌদ্ধ সমাজের প্রায় সব দাবি-দাওয়া পূরণ করেছেন। এতে বৌদ্ধ সমাজ খুবই খুশি। তবে হামলাকারীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি না হওয়ায় বৌদ্ধ সমাজে এখনও স্বস্তি ফিরেনি। গত বছরের ২৯ সেপ্টেম্বর গভীর রাতে রামুর বৌদ্ধ পল্লীতে হামলা চালায় একদল উগ্রপন্থী। পরদিন উখিয়া ও টেকনাফেও ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঘটে। ঘটনার পর থেকে বৌদ্ধ পল্লীতে সেনাবাহিনী মোতায়েন রয়েছে। এ ঘটনায় সরকারের পক্ষ থেকে একটি চার সদস্য বিশিষ্ট তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়। এ কমিটি উত্তম বড়ুয়াসহ ২০৫ জনকে অভিযুক্ত করে তদন্ত প্রতিবেদন দাখিল করে। পরে উচ্চ আদালতের নির্দেশে আরেকটি বিচার বিভাগীয় কমিটি গঠন করা হয়। বিচার বিভাগীয় তদন্তেও চার শতাধিক ব্যক্তিকে অভিযুক্ত করা হয়। প্রশাসনিক তদন্ত কমিটির সদস্য ও কক্সবাজারের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার বাবুল আক্তার জানান, এসব ঘটনায় পুলিশের পক্ষ থেকে বাদী হয়ে ১৩টি এবং পাবলিকের পক্ষ থেকে বাদী হয়ে ৬টিসহ মোট ১৯টি মামলা রুজু করা হয়। এর মধ্যে রামু থানায় দায়ের করা হয় ৮টি, কক্সবাজার সদর থানায় ২টি, টেকনাফে ২টি ও উখিয়া থানায় ৭টি মামলা। এসব মামলায় এজাহারনামীয় ৩৭৫ জন এবং সন্দিগ্ধ ১৪ হাজার ৮০৭ জনসহ মোট ১৫ হাজার ১৮২ জনকে আসামি করা হয়। এরমধ্যে এজাহারনামীয় ১৮৭ জন এবং ‘তদন্তে প্রাপ্ত’ ৩৩৯ জনকে গ্রেফতার করা হয়। গ্রেফতারকৃতদের মধ্যে ২৩ জন আসামি আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছে। তিনি আরো জানান, দায়েরকৃত মামলার মধ্যে চলতি মাসের প্রথম দিকে ৩৬৪ জনকে অভিযুক্ত করে ৭টি মামলার চার্জশিট দেয়া হয়েছে। এর মধ্যে গ্রেফতার হয়েছে ১৯৩ জন এবং পলাতক রয়েছে ১৭১ জন। অতিরিক্ত পুলিশ সুপার জানান, আরো ৫টি মামলার চার্জশিট আদালতে দাখিলের জন্য চূড়ান্ত করা হয়েছে। বাকি মামলার চার্জশিটও শীঘ্রই দেয়া হবে। এদিকে পুড়িয়ে দেয়া বৌদ্ধ বিহার ও বসতবাড়ি সরকারি উদ্যোগে এবং সেনাবাহিনীর তত্ত্বাবধানে মাত্র ১১ মাসের মধ্যেই দৃষ্টিনন্দন স্থাপত্যে পুনর্নির্মাণ করে দেয়া হয়েছে। মাত্র এক বছরের মাথায় সেই ধ্বংসস্তূপের উপর মাথা তুলে দাঁড়ালো বৌদ্ধ বিহারগুলো। ক্ষতিগ্রস্ত বসতঘরের ক্ষতচিহ্নও আর নেই। আধুনিক স্থাপত্যশৈলীতে নির্মিত এ বিহারগুলো এখন সারা দেশের বৌদ্ধদের তীর্থস্থানে পরিণত হয়েছে। পর্যটকদের জন্যও এই স্থাপনাগুলো এখন আকর্ষণীয় গন্তব্য হয়ে উঠেছে। বৌদ্ধ বিহার পুনর্নির্মাণের দায়িত্বপ্রাপ্ত সেনাবাহিনীর ১৭ প্রকৌশল ব্যাটালিয়নের অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্ণেল জুলফিকার রহমান জানান, বৌদ্ধ ধর্মীয় স্থাপত্য অনুসরণ করে বিহারগুলো দ্রুততম সময়ে পুনর্নির্মাণ করে দিয়েছে। এতে ২০ কোটি টাকা খরচ হয়েছে। রামু চৌমুহনী স্টেশন থেকে বৌদ্ধ মন্দির সড়ক ধরে আধা কিলোমিটার গেলেই চোখে পড়ে রামু কেন্দ ীয় সীমা বিহার। গত বছরের ২৯ সেপ্টেম্বর দুর্বৃত্তরা হামলা চালিয়ে পুড়িয়ে দিয়েছে বিহারটি। এখন সেই ধ্বংসস্তূপের উপর তৈরি করা হয়েছে তিনতলা সুরম্য ভবন। একইভাবে সেদিন দুর্বৃত্তরা পুড়িয়ে দিয়েছিল উত্তর মিঠাছড়ির ‘বিমুক্তি বিদর্শন ভাবনা কেন্দ ’। যেখানে আগে থেকেই তৈরি করা ছিল ১শ’ ফুট দীর্ঘ গৌতম বুদ্ধের সিংহ শয্যা দৃষ্টিনন্দন বুদ্ধমূর্তি। সেইরাতে চেষ্টা করেও দুর্বৃত্তরা এ মূর্তিটির বড় কোন ক্ষতিসাধন করতে পারেনি। ক্ষত-বিক্ষত সেই ধ্বংসস্তূপের উপর কোটি টাকা ব্যয় করে তৈরি করা হয়েছে দৃষ্টিনন্দন দোতলা পাকা বিহার। আরও প্রায় ৩০ লাখ টাকা ব্যয়ে বিহারের আঙ্গিনাকে সাজানো হয়েছে আধুনিক সুযোগ-সুবিধায়। বর্তমানে এটি রামুর সবচেয়ে আকর্ষণীয় স্থান। এছাড়াও রামু মৈত্রী বিহার, লাল চিং, সাদা চিং ও অপর্ণা চরণ চিং, চেরাংঘাটা উসাইসেন বৌদ্ধ বিহার বা বড় ক্যাং, জাদীপাড়া আর্য বংশ বৌদ্ধ বিহার, উখিয়ারঘোনা জেতবন বিহার, উত্তর মিঠাছড়ি প্রজ্ঞামিত্র বন বিহার, চাকমারকুল অজন্তা বৌদ্ধ বিহারসহ ক্ষতিগ্রস্ত সবকটি বিহার তৈরি করা হয়েছে দৃষ্টিনন্দনভাবে। ৩ সেপ্টেম্বর প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা নবনির্মিত এসব বৌদ্ধ বিহারের আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করেন। রামু কেন্দ্রীয় সীমা বিহারের অধ্যক্ষ পন্ডিত সত্যপ্রিয় মহাথের বলেন, খুব দ্রুত সময়ের মধ্যে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী তার প্রতিশ্রুতির বাস্তবায়ন করেছেন। তার নির্দেশে সেনাবাহিনী অল্প সময়ে গড়ে তুলেছে দৃষ্টিনন্দন বৌদ্ধ বিহার। এখন নবনির্মিত সব বৌদ্ধ বিহারে নিয়মিত পূজা-প্রার্থনা শুরু হয়েছে। এখন আমরা বিহারগুলোর স্থায়ী নিরাপত্তা এবং উপযুক্ত পরিচর্যা ও রক্ষণাবেক্ষণের নিশ্চয়তা চাই। রামু উপজেলা কেন্দ ীয় বৌদ্ধ ঐক্য ও কল্যাণ পরিষদের সভাপতি প্রবীর বড়ুয়া ও সাধারণ সম্পাদক তরুণ বড়ুয়া জানান, হামলার পর খুব স্বল্প সময়ের মধ্যে সেনাবাহিনী ধ্বংসস্তূপের উপর গড়ে তুলেছে দৃষ্টিনন্দন বৌদ্ধ বিহার। যা এখন সারা দেশের বৌদ্ধ সমপ্রদায়ের জন্য তীর্থস্থানে পরিণত হয়েছে। পর্যটকদের কাছেও বিহারগুলো এখন বাড়তি আকর্ষণ। তারা ক্ষোভের সাথে জানালেন, হামলার এক বছর পার হলেও হামলাকারীদের মধ্যে যারা সামনের সারিতে ছিল এদের অনেকেই এখনো প্রকাশ্যে ঘুরছে। আইনের আওতায় আসেনি। প্রকৃত অপরাধীরা যদি পার পেয়ে যায় তাহলে এ ধরনের ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঘটতে পারে, যে কারণে বৌদ্ধ সমপ্রদায়ের মাঝে আস্থার সংকট কাটছে না। কক্সবাজার জেলা বুদ্ধিস্ট ফেডারেশনের সাধারণ সম্পাদক বংকিম বড়ুয়া বলেন, ঘটনার পর গঠিত স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের তদন্ত কমিটির প্রতিবেদনেও ২০৫ জন এবং চট্টগ্রামের দায়রা জজ আবদুল কুদ্দুস মিয়ার নেতৃত্বে গঠিত বিচার বিভাগীয় তদন্ত কমিটির প্রতিবেদনে ২৯৮ জনকে অভিযুক্ত করা হয়। এগুলোসহ পুলিশের মামলায় অভিযুক্তদের অনেকেই প্রকাশ্যে ঘুরলেও পুলিশ এদের ধরছে না। এমনকি আমরা শুনছি, প্রথমসারির অভিযুক্তদের অনেককে চার্জশিট থেকেও বাদ দেয়া হচ্ছে। তিনি আরো বলেন, বিচার বিভাগীয় তদন্ত কমিটির কাছে বৌদ্ধদের অনেকেই সাক্ষ্য দিয়েছে। কিন্তু পরবর্তীতে সাক্ষীদের জবানবন্দিসহ প্রতিবেদন অভিযুক্তদের হাতে চলে আসায় নতুন করে হুমকির মুখে পড়ে বৌদ্ধরা। ফলে ভয়ে এখন আর কেউ সাক্ষ্য দিতে আগ্রহী হচ্ছে না। অন্যদিকে রামুর বৌদ্ধপল্লীতে হামলার এক বছর পূর্তি উপলক্ষে আজ বিভিন্ন সংগঠনের পক্ষ থেকে অনুষ্ঠানমালার আয়োজন করা হয়েছে। কর্মসূচির মধ্যে রয়েছে আজ রবিবার ভোরে বুদ্ধপূজা, শান্তি শোভাযাত্রা, স্মরণসভা, আলোচনা সভা, সমবেত প্রার্থনা ইত্যাদি। উখিয়া (কক্সবাজার) সংবাদদাতা জানান, গ্রেফতারকৃত আসামির অধিকাংশই ইতিমধ্যে জামিনে মুক্ত হয়ে বেরিয়ে এসেছে। পশ্চিম মরিচ্যা দীপাংকুর বৌদ্ধ বিহার পরিচালনা কমিটির সভাপতি বাবু লাল বড়ুয়ার কাছে জানতে চাইলে তিনি বলেন, মূল আসামিরা ধরা-ছোঁয়ার বাইরে থাকলেও আপাতত পরিবেশ শান্ত রয়েছে। তিনি বলেন, সেদিনের সেই ভয়াল তাণ্ডবের স্মৃতি মনে পড়লে অন্তরাত্মা শিউরে উঠে। এ ধরনের ঘটনা যাতে পুনরাবৃত্তি না হয় সেজন্য এলাকায় একটি সামপ্রদায়িক সমপ্রীতির সৌহার্দ্যপূর্ণ পরিবেশ সৃষ্টির কামনা করে উক্ত বৌদ্ধ মন্দির নির্মাণ করে দেয়ার জন্য প্রধানমন্ত্রীকে ধন্যবাদ জানান।