যুদ্ধাপরাধীদের বিচারে বিশ্ব সম্প্রদায়ের সর্বাত্মক সমর্থন কামনা করেছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৬৮তম অধিবেশনে দেয়া ভাষণে তিনি এ কামনা করেন। প্রধানমন্ত্রী বলেন, যুদ্ধাপরাধের বিচারের মধ্য দিয়ে বাঙালি জাতি গ্লানিমুক্ত হবে। তিনি বলেন, যুদ্ধাপরাধীর বিচারের জন্য সরকার ১৯৭৩ সালের আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল আইনের আওতায় দুটি ট্রাইব্যুনাল গঠন করেছে এবং বিচার পরিচালনায় সর্বোচ্চ মান নিশ্চিত করা হয়েছে।
স্থানীয় সময় শুক্রবার বেলা ৪টা ১০ মিনিটে (বাংলাদেশ সময় শুক্রবার দিবাগত রাত ২টা ১০ মিনিট) দেয়া ভাষণে শেখ হাসিনা তার সরকারের সাফল্য বিশেষ করে ডিজিটাল প্রযুক্তির দ্রুত প্রসার, আর্থ সামাজিক ও অর্থনৈতিক উন্নয়ন, নারীর ক্ষমতায়ন, শিক্ষা বিস্তার, সুবিধাবঞ্চিত জনগণের ক্ষমতায়ন, সন্ত্রাসবাদ নির্মূলে কঠোর পদক্ষেপ গ্রহণ, বিশ্বশান্তি প্রতিষ্ঠায় অঙ্গীকার এবং এমডিজি’র সাথে তাল মিলিয়ে জাতীয় কর্মকৌশল প্রণয়ন করে রূপকল্প ২০২১ বাস্তবায়নসহ গুরুত্বপূর্ণ বিষয় তুলে ধরেন। প্রতি বছরের মত প্রধানমন্ত্রী এবারো বাংলায় ভাষণ দেন এবং তিনি বাংলাকে জাতিসংঘের দাপ্তরিক ভাষা হিসাবে ঘোষণার জোরালো দাবি জানান।
প্রধানমন্ত্রীর ভাষণের সময় আওয়ামী লীগের উপদেষ্টামণ্ডলীর সদস্য আমির হোসেন আমু ও তোফায়েল আহমেদ, ওয়ার্কার্স পার্টির সভাপতি রাশেদ খান মেনন, পররাষ্ট্রমন্ত্রী দীপু মনি, প্রধানমন্ত্রী পুত্র সজিব ওয়াজেদ জয়, জাতিসংঘে বাংলাদেশের স্থায়ী প্রতিনিধি এ কে আব্দুল মোমেন প্রমুখ অধিবেশন কক্ষে উপস্থিত ছিলেন।
নয় পৃষ্ঠার লিখিত ভাষণের শুরুতে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা জাতিসংঘের প্রধান হিসেবে মহাসচিব বান কি-মুনকে তাঁর প্রজ্ঞা, বলিষ্ঠ পদক্ষেপ ও সফলতা অর্জনের জন্য ধন্যবাদ জানান। এছাড়া তিনি ১৯৭৪ সালে তার পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জাতিসংঘে দেয়া ভাষণের কথা স্মরণ করেন।
শেখ হাসিনা বলেন, নিত্যনতুন প্রযুক্তি উন্নয়নকে ত্বরান্বিত করতে যেমন অবদান রাখছে, তেমনি দ্বন্দ্বও সৃষ্টি করছে। এ পরিস্থিতিতে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে বিশ্বের অরক্ষিত, বঞ্চিত ও পশ্চাত্পদ জাতি-গোষ্ঠী। এ প্রসঙ্গে তিনি ১৯৭৪ সালে জাতিসংঘে বঙ্গবন্ধুর দেয়া ভাষণের কথা উল্লেখ করে বলেন, তিনি (বঙ্গবন্ধু) সেদিন এই মঞ্চে দাঁড়িয়েই ক্ষুধা, দারিদ্র্য ও যুদ্ধমুক্ত নতুন বিশ্বব্যবস্থা গড়ে তোলার আহবান জানিয়েছিলেন। তিনি বলেন, “বঙ্গবন্ধুর সেই লক্ষ্য অর্জনে অবদান রাখতে পেরে তাঁর কন্যা হিসেবে আমি গর্বিত। ২০০০ সালে ‘সহস্রাব্দ ঘোষণা’ গ্রহণের সময় বিশ্ব নেতৃবৃন্দের সাথে আমি উপস্থিত ছিলাম। ২০১০ সালে এমডিজি অগ্রগতি পর্যালোচনায়ও আমি উপস্থিত ছিলাম। আর এবার এমডিজি থেকে ২০১৫-পরবর্তী উন্নয়ন এজেন্ডায় উত্তরণেও আমি অংশগ্রহণ করতে পারছি।”
প্রধানমন্ত্রী বলেন, আর্থ-সামাজিক ও পরিবেশগত লক্ষ্য এবং এগুলো অর্জনে প্রয়োজনীয় সম্পদের উল্লেখ করে বাংলাদেশ ২০১৫-পরবর্তী উন্নয়ন এজেন্ডা জাতিসংঘে উপস্থাপন করেছে। তিনি বলেন, এমডিজি’র সঙ্গে তাল মিলিয়ে জাতীয় কর্মকৌশল প্রণয়ন করে রূপকল্প ২০২১ বাস্তবায়নের মাধ্যমে বাংলাদেশকে মধ্যম আয়ের দেশে পরিণত করাই আমাদের লক্ষ্য।
শেখ হাসিনা বলেন, “বাংলাদেশকে এখন ‘অর্থনৈতিক উন্নয়নের মডেল’ এবং ‘দক্ষিণ এশিয়ার মানবাহক’ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। এসব অর্জনের স্বীকৃতি হিসেবে বাংলাদেশ এমডিজি অ্যাওয়ার্ড, সাউথ-সাউথ অ্যাওয়ার্ড, গ্লোবাল ডাইভারসিটি অ্যাওয়ার্ড এবং এফএও ফুড অ্যাওয়ার্ড ২০১৩ লাভ করেছে। জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৬৬তম অধিবেশনে আমার উত্থাপিত ও সর্বসম্মতিক্রমে গৃহীত ‘জনগণের ক্ষমতায়ন ও উন্নয়ন মডেল’-এ বর্ণিত নীতিমালা বাস্তবায়নের ফলে এই গৌরব অর্জন সম্ভব হয়েছে।”
তিনি বলেন, দেশে ডিজিটাল প্রযুক্তির দ্রুত প্রসার ঘটছে। স্থানীয় সরকারের নিম্নতম স্তর হিসেবে দেশের প্রতিটি ইউনিয়নে ডিজিটাল সুবিধা-সমৃদ্ধ ইউনিয়ন তথ্য ও সেবা কেন্দ্র চালু করা হয়েছে। দেশে ১০ কোটির বেশি মোবাইল সিম ব্যবহূত হচ্ছে।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, নতুন শিক্ষানীতি অনুযায়ী দেশে মেয়েদের জন্য উচ্চ মাধ্যমিক স্তর পর্যন্ত শিক্ষাকে অবৈতনিক করা হয়েছে। ১ কোটি ১৯ লাখ শিক্ষার্থী মাসিক উপবৃত্তি পাচ্ছে। মাধ্যমিক পর্যন্ত সব শিক্ষার্থীকে বিনামূল্যে পাঠ্যবই দেয়া হচ্ছে। তিনি বলেন, সম্ভবত বাংলাদেশই একমাত্র দেশ যেখানে প্রধানমন্ত্রী, স্পিকার, সংসদ উপনেতা এবং বিরোধী দলীয় নেতা নারী।
শেখ হাসিনা বলেন, সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনি কর্মসূচি, ভিজিডি, ভিজিএফ, আশ্রয়ণ প্রকল্প, বয়স্ক ভাতা, বিধবা ভাতা, দুঃস্থ মহিলা ভাতা, মাতৃত্বকালীন ভাতা, প্রতিবন্ধী ভাতা, অস্বচ্ছল মুক্তিযোদ্ধা ভাতা এবং “একটি বাড়ি, একটি খামার” কর্মসূচি গ্রামীণ মানুষের খাদ্য ও পুষ্টি নিরাপত্তা প্রদানে যথেষ্ট ফলপ্রসূ হয়েছে।
তিনি বলেন, সুবিধাবঞ্চিত ও প্রতিবন্ধীদের আত্মকর্মসংস্থানের জন্য শিক্ষাদান, দক্ষতা উন্নয়ন এবং সুদবিহীন ঋণ দেয়া হচ্ছে। অটিজমসহ মানসিক প্রতিবন্ধীদের কল্যাণে বিশ্ব সচেতনতা সৃষ্টির লক্ষ্যে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৬৭তম অধিবেশনে উত্থাপিত বাংলাদেশের প্রস্তাবটি গৃহীত হয়েছে।
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেন, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে বাংলাদেশকে বৈশ্বিক উষ্ণায়ন ও সমুদ্রের পানির স্তর বেড়ে যাওয়ার অভিঘাত মোকাবেলা করতে হচ্ছে। সমুদ্রের পানির স্তর ১ মিটার বাড়লে বাংলাদেশের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ পানিতে তলিয়ে যাবে। এর ফলে প্রায় ৩ কোটি মানুষ বাস্তুহারা হবে এবং অন্য কোথাও আশ্রয় নিতে বাধ্য হবে। জলবায়ুজনিত অভিবাসীদের সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও অর্থনৈতিক পুনর্বাসন নিশ্চিত করা বিশ্বের দায়িত্ব। এ লক্ষ্যে একটি আইনী কাঠামো তৈরির জন্য প্রধানমন্ত্রী জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৬৪তম অধিবেশনে দেয়া তার আহ্বান পুনর্ব্যক্ত করেন।
প্রধানমন্ত্রী বায়ান্নর ভাষা আন্দোলন এবং একাত্তরের মহান মুক্তিযুদ্ধের বীর শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে বলেন, ইউনেস্কো ১৯৯৯ সালে ২১ ফেব্রুয়ারিকে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে ঘোষণা করে। একইভাবে ২১ ফেব্রুয়ারিকে ‘আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস’ হিসেবে ঘোষণা করতে জাতিসংঘকে আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, ‘আমাদের এ প্রত্যাশা চলতি অধিবেশনে প্রস্তাব আকারে উত্থাপন করার পরিকল্পনা নিয়েছি। শান্তি, সংস্কৃতি ও উন্নয়নের বাহন হিসেবে বিশ্বব্যাপী মাতৃভাষাগুলো সুরক্ষা করতে এ প্রস্তাব অনুমোদনের জন্য সকলের প্রতি আহ্বান জানাচ্ছি।’
২০০১ থেকে ২০০৬ সাল পর্যন্ত বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারের মদদে জঙ্গিগোষ্ঠীর দেশজুড়ে বোমা ও গ্রেনেড হামলা, ২০০৪ সালের ২১ আগস্ট আওয়ামী লীগের সমাবেশে তাকে হত্যার উদ্দেশ্যে চালানো গ্রেনেড হামলার কথা উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘এই স্বাধীনতাবিরোধী চক্রই ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট আমার বাবা জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান এবং আমাদের পরিবারের ১৮ জন সদস্যকে নৃশংসভাবে হত্যা করে। আমার ছোট বোন শেখ রেহানা ও আমি তখন বিদেশে থাকায় দুজন বেঁচে যাই।’ তিনি বলেন, তার সরকার সন্ত্রাসবাদ নির্মূলে কঠোর পদক্ষেপ নিয়েছে। নির্বাচন কমিশন, দুর্নীতি দমন কমিশন, মানবাধিকার ও তথ্য কমিশনকে শক্তিশালী করা হয়েছে।
শেখ হাসিনা বলেন, বিগত পৌনে পাঁচ বছরে জাতীয় সংসদের উপ-নির্বাচন, সিটি কর্পোরেশন থেকে শুরু করে যত নির্বাচন হয়েছে, তার কোথাও কোনো অভিযোগ উঠেনি। এর মাধ্যমে প্রমাণ হয়েছে যে নির্বাচন কমিশন অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষভাবে নির্বাচন অনুষ্ঠানে সক্ষম।
তিনি বলেন, ‘বিশ্বের সকল দেশের সাথে সুসম্পর্ক রক্ষার মাধ্যমে আমরা শান্তিকে স্থায়ী রূপ দিতে চাই।’ বাংলাদেশ জাতিসংঘ শান্তি মিশনে সর্বোচ্চ সংখ্যক সৈন্য প্রেরণকারী ও জাতিসংঘ পিস বিল্ডিং মিশনে নির্বাচিত ভাইস চেয়ারম্যান উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে তার সরকারই (১৯৯৬-২০০১ মেয়াদে) প্রথম ব্যাপকভিত্তিক পারমাণবিক পরীক্ষা নিষিদ্ধকরণ চুক্তি এবং মানব-বিধ্বংসী মাইন নিষিদ্ধকরণ চুক্তি অনুসমর্থন করে। বর্তমান মেয়াদেও এ অঞ্চলে তার সরকার প্রথম অস্ত্র বাণিজ্য চুক্তি স্বাক্ষর করতে যাচ্ছে।
শেখ হাসিনা বলেন, ২০১৫-পরবর্তী সময়ে শান্তি ও উন্নয়নের জন্য সাংস্কৃতিক অভিব্যক্তি, আন্তঃবিশ্বাস ও আন্তঃসাংস্কৃতিক সংলাপকে উত্সাহিত করা জরুরি। তাই ২০১৫-পরবর্তী উন্নয়ন এজেন্ডায় সংস্কৃতিকে অন্তর্ভুক্ত করতে তার দেয়া উচ্চ পর্যায়ে সংলাপ প্রস্তাব সমর্থনের জন্য তিনি বিশ্ব নেতাদের প্রতি আহ্বান জানান।
প্রধানমন্ত্রী স্বল্পোন্নত দেশগুলোকে ওডিএ হিসেবে শূন্য দশমিক দুই শতাংশ দেয়ার অঙ্গীকার বাস্তবায়নের আহ্বান জানান। তিনি স্বল্পোন্নত দেশগুলোর পণ্য অন্যান্য দেশের বাজারে শুল্কমুক্ত ও কোটামুক্তভাবে প্রবেশের সুযোগ দেয়ারও আহ্বান জানান। তিনি বলেন, ব্রেটন উডস্ ইনস্টিটিউশনস ও আন্তর্জাতিক আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোতে মতপ্রকাশে সমান অধিকার এবং জিএটিএস অনুযায়ী বিশ্বব্যাপী শ্রমিকদের অবাধ যাতায়াতের নিশ্চয়তা দিতে হবে।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, বিশ্বায়নের কিছু অনন্য সমস্যা আছে যেগুলো মাঝে-মধ্যেই শান্তির প্রতি হুমকি হয়ে দেখা দেয়। এ ধরনের হুমকি মোকাবেলায় ন্যায়ভিত্তিক নীতি গ্রহণের বিকল্প নেই।
