দেশের বৃহত্তম ওষুধের পাইকারি বাজার পুরনো ঢাকার মিটফোর্ড থেকেই রাজধানীসহ সারাদেশে সিংহভাগ ওষুধ সরবরাহ করা হয়ে থাকে। এ বাজারে নকল, ভেজাল, নিম্নমান ও নিষিদ্ধ ওষুধের জন্য প্রসিদ্ধ। শুধু তাই নয়, সরকারি হাসপাতালে সরবরাহকৃত জীবন রক্ষাকারী ওষুধ সামগ্রী চোরাই পথে মিটফোর্ডে বিক্রি হয়ে থাকে। মিটফোর্ডের ৯টি মার্কেটে গতকাল শনিবার মোবাইল কোর্টের টানা ৮ ঘণ্টার অভিযানে ৫ কোটি টাকার ওষুধ জব্দ করা হয়। এসময় নকল, ভেজাল, মেয়াদ উত্তীর্ণ, চোরাই ও নিষিদ্ধ ওষুধ ব্যবসার সাথে জড়িত থাকার অভিযোগে ১০৩ জন ওষুধ ব্যবসায়ীকে আসামি করে ৭৭টি মামলা দায়ের করা হয়।
মিটফোর্ড ও বাবুবাজারের অভিযান চালানো ৯টি ওষুধের মার্কেট হচ্ছে, ভাণ্ডারি, ডিসিসি, নায়লা, খান, আমীর, আলী, আমীন, নূরপুরী ও আলিফ লাম মিম। গতকাল একটানা ৮ ঘণ্টা ঐ ৯টি মার্কেটে মোবাইল কোর্টের অভিযান চলে। র্যাব সাদা পোশাকে গিয়ে ৯টি মার্কেটের গেটে দাঁড়ালে এবং গেট বন্ধ করার প্রস্তুতি নিলে ব্যবসায়ীদের মধ্যে ক্ষোভ ও উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে। মুহূর্তে পোশাকধারী র্যাব সদস্যরা ৯টি মার্কেট ঘেরাও করে ফেলে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে নেয়। ৯টি মার্কেট থেকে প্রায় ৫ কোটি টাকার নকল, ভেজাল, মেয়াদ উত্তীর্ণ, চোরাই ও নিষিদ্ধ ওষুধ জব্দ করে মোবাইল কোর্ট। ২৮টি ওষুধের দোকান সিলগালা করে দেয়। জড়িত ১০৩ জন ওষুধ ব্যবসায়ীকে আসামি করে ৭৭টি মামলা দায়ের করা হয়। ১ কোটি ২৫ লাখ ৫০ হাজার টাকা জরিমানা করে মোবাইল কোর্ট। এদের মধ্যে ২০ জন ওষুধ ব্যবসায়ী প্রত্যেককে এক বছর করে কারাদণ্ড দেয়া হয়। বাকি ৮৩ জনকে জরিমানা করে মোবাইল কোর্ট।
একটি চক্র দীর্ঘদিন ধরে নামিদামি কোম্পানির ওষুধ নকল ও ভেজাল ওষুধ তৈরি করে হুবহু লেভেল ও মোড়ক লাগিয়ে ঐ মার্কেটে বিক্রি করে আসছে। ঐ সকল মার্কেটে চোরাই পথে আসা নিষিদ্ধ ওষুধ পাইকারী বিক্রি হচ্ছে বহুদিন ধরে। মিটফোর্ড ও বাবু বাজারে ভেজাল ও নিম্নমানের ওষুধের দুর্গে বিগত দিনে অভিযান চালানো দুঃসাধ্য ছিল। ওষুধ প্রশাসন অধিদফতর ও আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর এক শ্রেণির কর্মকর্তা ভেজাল, নিম্নমান, মেয়াদ উত্তীর্ণ, চোরাই ও নিষিদ্ধ ওষুধ প্রকাশ্যে বিক্রি করতে উত্সাহ যোগাচ্ছিলেন। ঐ সব দুই নম্বরি ওষুধ ব্যবসায়ীর কাছ থেকে কর্মকর্তারা নিয়মিত মাসোহারা পেয়ে আসছিলেন। গতকাল র্যাব-১০ এর নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট ফরহাদ হোসেনের নেতৃত্বে সকাল ১০টা থেকে একটানা সন্ধ্যা ৬টা পর্যন্ত মিটফোর্ড ও বাবু বাজারে ৯টি মার্কেটে অভিযান চালিয়ে বিপুল পরিমাণ চোরাই, নিষিদ্ধ, নকল ও ভেজাল ওষুধ জব্দ করতে সক্ষম হয়। অভিযানকালে ব্যবসায়ী ও র্যাব সদস্যদের মাঝে মৃদু সংঘর্ষ হয়। ঐ ঘটনায় একজন র্যাব সদস্য আহত হয়েছেন। পরে ওষুধ ব্যবসায়ীদের সংগঠন বাংলাদেশ কেমিস্ট অ্যান্ড ড্রাগিস্ট সমিতির নেতৃবৃন্দ ও র্যাব কর্মকর্তাদের হস্তক্ষেপে পরিস্থিতি শান্ত হয়।
দুযোগপূর্ণ এলাকায় প্রধানমন্ত্রীর অগ্রাধিকার প্রকল্পের আওতায় উত্পাদিত ওষুধ সামগ্রী জরুরি ভিত্তিতে সরবরাহ করা হয়ে থাকে। সেই প্রকল্পের ওষুধও বিক্রি হচ্ছে মিটফোর্ডের বাজারে। মোবাইল কোর্ট প্রধানমন্ত্রীর অগ্রাধিকার প্রকল্পের ওষুধ জব্দ করেন। অভিযানকালে ওষুধ প্রশাসন অধিদফতরের মহাপরিচালক মেজর জেনারেল জাহাঙ্গীর হোসেন মল্লিক ও র্যাব-১০ এর পরিচালক (সিও) লে. কর্নেল ইমরান ইবনে এ রউফসহ অন্যান্য র্যাব কর্মকর্তা উপস্থিত ছিলেন।
কর্মকর্তারা জানান, জীবন রক্ষাকারী ওষুধের মার্কেটে এটা স্মরণকালের বৃহত্ অভিযান। এর ফলে নকল, ভেজাল, মেয়াদউত্তীর্ণ, চোরাই ও নিষিদ্ধ ওষুধ পাচার এবং নিয়ন্ত্রণে চলে আসবে। এ অভিযান অব্যাহত থাকবে বলে কর্মকর্তারা আশাবাদ ব্যক্ত করেন।
এর আগে গত এপ্রিল মাসে একই মোবাইল কোর্ট মিটফোর্ডে সর্দার, তাজ ও মোহাম্মদীয়া মার্কেটে অভিযান চালিয়েছিল।
