নারীর হাতে যখন গাড়ির স্টিয়ারিং

আপডেট : ২৯ সেপ্টেম্বর ২০১৩, ১৯:২৭
রিতা সরকার। বয়স আনুমানিক ৩০ বছর। ২০০৫ সালে রাজধানীর রায়েরবাজার পাঠশালা গলিতে এক বাড়িতে টিউশনি করতেন। ঐ বাড়ির গৃহকর্তা কেয়ার বাংলাদেশ নামে একটি বেসরকারি সংস্থার পদস্থ কর্মকর্তা। তিনি রিতাকে জানালেন যে, কেয়ার বাংলাদেশ নারীদের গাড়িচালক হিসাবে প্রশিক্ষণ দিবে। রিতা যথারীতি আবেদন করেন কেয়ার বাংলাদেশে। ৬ মাস গাড়ি চালনার প্রশিক্ষণ শেষে তিনি বিআরটিএ (বাংলাদেশ রোড ট্রান্সপোর্ট অথরিটি) থেকে হালকা গাড়ি চালানোর লাইসেন্স পেলেন। ২০০৬ সালের মে মাসে তিনি কেয়ার বাংলাদেশে গাড়িচালক হিসাবে যোগ দিলেন। কেয়ার বাংলাদেশ টাঙ্গাইল শাখায় তার পোষ্টিং হলো। ঐ অফিসে থাকা অবস্থায় তিনি অফিসের কাজে টাঙ্গাইলের বাইরে বিভিন্ন জেলায় গাড়ি চালাতেন। প্রথমের দিকে মহাসড়কে তার গাড়ি চালনা দেখে অনেক পুরুষ গাড়ি চালক এমনকি পথচারীরা একটু আশ্চর্য হতেন। অনেকেই নিজের কাছে প্রশ্ন করেন, মহিলা আবার গাড়ি চালক? বিষয়টি রিতা যথেষ্ট উপভোগ করতেন। ২০১২ সালে তিনি ব্র্যাক ড্রাইভিং স্কুলে ট্রেনিং অব ইন্সট্রাক্টর (টিওআই) প্রশিক্ষণ নেন। ৩৫ দিনের এই প্রশিক্ষণ শেষে তিনি একজন প্রশিক্ষকের সনদ পান। তার দক্ষতার কারণেই ব্র্যাক কর্তৃপক্ষ তাকে ড্রাইভিং স্কুলে প্রশিক্ষক হিসাবে নিয়োগ দেয়। এখন রিতা সরকার ব্র্যাক ড্রাইভিং স্কুলে মহিলা গাড়ি চালকদের প্রশিক্ষণ দিচ্ছেন। একজন গাড়িচালক এরপর প্রশিক্ষক- সবমিলিয়ে এ ধরনের জীবিকা বেছে নেয়ার পেছনে রিতা সরকার জানান, তিনি গাড়ি চালক ও প্রশিক্ষক হওয়ার পর তার সংসারে অর্থনৈতিক সচ্ছলতা ফিরে এসেছে। সংসারে তার মা প্রভা সরকার খুবই খুশি। মেয়ে রোজগার করে সংসার চালাচ্ছে-এর চেয়ে আর আনন্দের কী হতে পারে। রিতার বাবা কৃষ্ণ সরকার ১৯৯৯ সালে মারা যান। ঐ সময় রিতার বয়স ছিল মাত্র ১৫ বছর। তার মা অথৈ সাগরে পড়ে যান। ছোট সন্তানদের নিয়ে তিনি কোথায় যাবেন। এক পর্যায়ে রিতার পড়াশুনাও বন্ধ হয়ে গেলো। রায়েরবাজারে বিভিন্ন বাড়িতে ছোট বাচ্চাদের পড়াশুনা দিতে শুরু করলেন। এ দিয়েই রিতাদের সংসার চলত। ভাই-বোনদের মধ্যে সবার বড় হওয়ায় সংসারের হাল ধরতে হয় তাকে। মহিলা গাড়িচালক হিসাবে চাকরিতে যোগ দেয়ার পর রিতার সংসারে স্বাবলম্বী ফিরে আসে। তার মেজো বোন অঞ্জনা সরকার গাড়ি চালনার প্রশিক্ষণ নিয়ে এখন ব্র্যাকে গাড়ি চালক হিসাবে যোগ দিয়েছেন। ছোট ভাই মানিক সরকার মোহাম্মদপুরে মোটর মেকানিক হিসাবে কর্মরত। সবার ছোট বোন সুবর্ণ সরকারের কলেজে পড়াশুনার খরচ দিচ্ছেন রিতা সরকার। সড়কে মহিলা গাড়িচালক হিসাবে কতখানি নিরাপদ-এমন প্রশ্নের জবাবে রিতা সরকার বলেন, রাস্তায় যখন একজন মহিলা গাড়ি চালায়, তখন সে সব সময় সতর্ক থাকে। যদিও গাড়ি চালনার বিষয়টি নারী-পুরুষ ক্ষেত্রে সতর্কতা অবলম্বন করতে হয়, এরপরও তার ধারণা যে নারীরা একটু বেশি সতর্ক। তার ৫/৬ বছরের গাড়ি চালনার ইতিহাসে একটিও দুর্ঘটনার ঘটনা ঘটেনি। এ ব্যাপারে ব্র্যাকের রোড সেফটি প্রোগ্রামের ব্যবস্থাপক একেএম খায়রুজ্জামান বলেন, গবেষণায় দেখা গেছে, এখন পর্যন্ত রাস্তায় গাড়ি চালনার ক্ষেত্রে নারী গাড়ি চালকদের দুর্ঘটনার ঘটনা পুরুষদের চেয়ে অনেক কম। যদিও বাংলাদেশে নারী গাড়ি চালকের সংখ্যা অনেক কম। তারপরও এখনও অনেক নারী গাড়ি চালনাকে পেশা হিসাবে বেছে নিচ্ছেন। ইন্টারনেট থেকে ইন্ডিয়ান টাইমসের প্রাপ্ত তথ্যে জানা গেছে, ভারতের রাজধানী নয়াদিল্লির ট্রাফিক পুলিশ বিভাগ একটি জরিপ করেছে। এ জরিপের তথ্য অনুযায়ী নারীরা শুধু ভালো চালকই নয়, যত বেশিসংখ্যক নারী স্টিয়ারিং হুইল ধরছে ততই দুর্ঘটনার হার কমে আসছে। গত কয়েক বছরে দিল্লিতে পেশাদার নারী গাড়ি চালকের সংখ্যা বাড়ছে। তারপরও দিল্লিতে দুর্ঘটনাগুলোর মধ্যে মাত্র ২ শতাংশেরও কম দুর্ঘটনা নারী গাড়ি চালকরা ঘটিয়ে থাকেন। উত্তরার আশকোনায় অবস্থিত ব্র্যাক ড্রাইভিং স্কুলের প্রশিক্ষক মতিউর রহমান জানান, বেসিক ড্রাইভিং ট্রেনিং, ইন্সট্রাক্টর ট্রেনিং ও সুরক্ষা এই তিনটি কোর্স চালু রয়েছে। এদের মধ্যে বেসিক ড্রাইভিং ট্রেনিংয়ে গাড়ি চালক তৈরির জন্য ৫ মাস প্রশিক্ষণ দেয়া হয়। ইন্সট্রাক্টর তৈরির জন্য ৩৫ দিনের প্রশিক্ষণ এবং সুরক্ষা কোর্সে সারাদেশের বাস ও ট্রাক চালকদের দক্ষ গাড়ি চালক হিসাবে গড়ে তোলার জন্য ১২ দিনের প্রশিক্ষণ দেয়া হয়। এদের মধ্যে মহিলাদের গাড়ি চালনার প্রশিক্ষণের ক্ষেত্রে কোন টাকা নেয়া হয় না। এ পর্যন্ত ব্র্যাক ড্রাইভিং স্কুল থেকে প্রশিক্ষণ নিয়ে ৭০ জন মহিলা গাড়ি চালক তৈরি হয়েছে। এদের মধ্যে প্রশিক্ষণ নেয়া জেরিন ও জহুরা জানান, তারা প্রশিক্ষণ নিয়ে গাড়ি চালক হয়েছেন। বিআরটিএ থেকে গাড়ি চালনার লাইসেন্সও পেয়েছেন। এখন কোন প্রতিষ্ঠানে তারা চাকরি খুঁজছেন।