লিরার খুব মন খারাপ। ছাদে একা দাঁড়িয়ে আছে। আজকে ওর ক্লাস পরীক্ষার খাতা দিয়েছে, ও খুব কম মার্কস পেয়েছে। সর্বোচ্চ উঠেছে বিশে আঠেরো। আর গতবার ক্লাসে প্রথম হয়েও ও পেয়েছে বারো। এবার ক্লাস ফোরেও ও যদি প্রথম না হয় তাহলে মা আর বাবা মিলে যে কী করবে সে কথা ভাবলেও ওর ভয় লাগছে। লিরা কোথাও খেলতে যেতে পারে না, শুধু পড়া আর পড়া। ওর মা-বাবার একটাই কথা, পরীক্ষায় প্রথম হতে হবে, যতই কোচিং করতে হোক। বড় হয়ে ওকে ডাক্তার হতে হবে। মাঝে মাঝে তাই ওর বাড়ি ছেড়ে পালিয়ে যেতে ইচ্ছে করে। রাস্তার পথশিশুদের মত ঘুরে বেড়াতে ইচ্ছে করে। ওদের কি মজা, স্কুল করতে হয় না।
এভাবে পারিবারিক চাপ শিশুদের জীবনে সব আনন্দ-দুঃখ কেড়ে নেয়। অভিভাবকদের সাথে ভীতিজনক সম্পর্ক শিশুদের বিকাশের পথে এক ভয়াবহ বাধা। তাদের জীবনে অস্বাভাবিক বিকাশের কারণে মানসিকতার বিকাশ পরিপূর্ণ হয় না। ভবিষ্যত্ জীবনে ব্যর্থতা সে মেনে নিতে পারে না। বিপদে সঠিক পথ বাছাইয়ের ক্ষমতা তার মধ্যে তৈরি হয় না। শিশুদের সাথে বাবা-মায়ের দূরত্বপূর্ণ সম্পর্ক, অজান্তে শিশুকে বিপদের পথে ঠেলে দেয়, যেমনটি আমরা দেখছিলাম লিনার ক্ষেত্রে।
শিশুর মন-মানসিকতা বিকাশ প্রসঙ্গে কথা হচ্ছিল ব্যাংকার রাশেদ ও তার স্ত্রী মিসেস সোনিয়ার সাথে। তাদের একমাত্র কন্যা মিতু। মিতু এবার ক্লাস সেভেনে উঠবে। রাশেদ সাহেব বলছিলেন, মিতুকে খেলনা কিনে দেয়া, ছুটিতে বেড়াতে নিয়ে যাওয়ার সর্বোচ্চ চেষ্টা তিনি করেন, তবু কাজ শেষে যথেষ্ট সময় দিতে পারেন না। তার বন্ধু-বান্ধব বা সমস্যা এসব সম্পর্কে মিতুর সাথে কথা না হলেও তার মায়ের কাছ থেকে জানেন। তবু তিনি মনে করেন যে, তিনি যদি আরও বেশি সময় দিতে পারতেন তবে ভাল হত। যা তাদের মধ্যকার সম্পর্কের দূরত্ব আরও কমাত। মিসেস সোনিয়ার কাছে তার টিনএজার সন্তানের কথা জানতে চাইলে তিনি বলেন, তিনি শিক্ষকতা করেন, তারপরও সন্তানের সাথে তার সম্পর্ক যথেষ্ট কাছের। প্রথম প্রথম যখন ওর বয়স ১২, সে যখন বড়দের মত ব্যবহার শুরু করে, তিনি বেশ অবাক হন। পরে বোঝেন এ বয়সে তাদের আর ছোট মনে করা যাবে না। বড় হিসাবে গণ্য করতে হবে এবং বড়দের মত করে গল্প করতে হবে, তবেই তাদের মনের কাছাকাছি যাওয়া যাবে ও বিপদে রক্ষা করা যাবে। তার সব সমস্যার কথা আমার কাছে বলবে, আমার পরামর্শ ও রক্ষা করবে। আমরা আমাদের একমাত্র মেয়েকে পড়াশোনার ব্যাপারে কোন চাপ দেই না। কেননা দেখা যায়, অতিরিক্ত চাপ তাদের জীবনের সবচেয়ে আনন্দময় সময়কে বিষাক্ত করে তোলে। তবে পড়ার ও জানার প্রয়োজনীয়তা নিয়ে পরিবারের সবাই মিলে আলোচনা করি। তিনি মনে করেন, সন্তানের কাছাকাছি যাবার জন্য পারিবারিক আলোচনা খুব গুরুত্বপূর্ণ।
ছোটবেলা থেকেই মানুষের মনের বিকাশ ঘটতে থাকে। অনেক সময় শিশুর নানা প্রশ্ন, অজানাকে জানার চেষ্টার প্রবণতায় বাবা-মা বিরক্তিসুলভ মনোভাব প্রকাশ করে থাকে। যা শিশুকে চির অজ্ঞতার পথে ঠেলে দেয়। শিশুর জানতে চাওয়ার প্রবণতাকে সবসময় উত্সাহিত করতে হবে। মায়ের পাশাপাশি বাবাকেও সন্তানকে পূর্ণ সময় দিতে হবে। কেননা শিশুর পূর্ণ মনোবিকাশে দুজনের ভূমিকাই সমান গুরুত্বপূর্ণ। পারিবারিক দ্বন্দ্ব-বিবাদ এ সবকিছুই শিশুর সামনে করা যাবে না। একে অপরের সম্পর্কে দোষারোপ সন্তানের সামনে করলে তা শিশুর মনের বিকাশকে মারাত্মকভাবে বাধাগ্রস্ত করে। সন্তান নিরাপত্তহীনতায় ভুগতে থাকে, খুব অল্প বয়সে তাকে এক কঠিন পরীক্ষার মুখে এনে ফেলে। তাই শিশুর পূর্ণ মানসিক বিকাশে এ ধরনের পরিস্থিতি থেকে নিজ সন্তানকে বাঁচাতে এগিয়ে আসতে হবে। সন্তানের চাহিদা ও তার মতামতকে গুরুত্ব দিতে হবে। তবেই তা তার ব্যক্তিত্ব বিকাশে সাহায্য করবে।
ছবি: সাফাওয়াত খান সাফু
