স ং গ ঠ ন

ভয় কী মরণে

আপডেট : ২৯ সেপ্টেম্বর ২০১৩, ১৯:২৯
বছর দেড়েক আগের কথা। একদিন তাহমিদুল আবেদীন এক বন্ধুর সাথে ভার্সিটিতে যাচ্ছিলেন। মিরপুর-১৪ থেকে বাসে ওঠেন। কিছু দূর যাওয়ার পর একটি ছেলেকে দেখেন স্কুল ড্রেস পরে বাসে উঠছে। আগ্রহী হয়ে ছেলেটার পড়ালেখার খোঁজ জানতে চাইলেন। মুহূর্তের মধ্যে ছেলেটির মুখ মলিন হয়ে গেল। তাহমিদুলের মুখেই শুনুন সেই গল্প, ‘তার কাছে জানতে চাইলাম, ভাইয়া তোমার পড়ালেখার কী অবস্থা। সে কিছুক্ষণ চুপ থেকে আমাদের জানালো, স্কুল সে ছেড়ে দিয়েছে। আসলে ছাড়তে বাধ্য হয়েছে। অভাবের সংসারে বাবা ছেলের পড়ালেখার মতো ‘বিলাসিতা’ করতে অপারগ। তাই একটি মটর গাড়ির দোকানে কাজ শিখছে। শুনে আমাদের মনটাই খারাপ হয়ে গেল। সিদ্ধান্ত নিলাম তাকে আমরা আবার স্কুলে পাঠাব। আর আমাদের আশপাশের এরকম যতো স্কুল থেকে ড্রপ-আউট ছেলে-মেয়ে আছে তাদেরকে আবার স্কুলে পাঠানোর ব্যবস্থা করবো। আমরা আলোচনা করে সেই পথেই কাজ শুরু করলাম। এভাবেই আমাদের সংগঠনের যাত্রা শুরু।’ বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ুয়া ছাত্র-ছাত্রীরা মিলে ‘ই-শাল ওয়েলফেয়ার ফাউন্ডেশন’ প্রতিষ্ঠা করার গোড়ার কথা এটি। এরপর বাড়তে বাড়তে এই সংগঠনের সদস্য সংখ্যা এখন ৪০। সবাই পড়াশুনা করছেন। মূলত দরিদ্র পরিবারের যেসব ছেলে-মেয়ে স্কুল ছেড়ে দিতে বাধ্য হয় তাদেরকে স্কুলে পাঠানোর জন্য প্রয়োজনীয় অর্থ এবং সাহস যোগান তারা। এর বাইরেও বিভিন্ন সচেতনতামূলক কাজও করে থাকেন। ঈদ এবং শীতের সময় দরিদ্র মানুষকে কাপড়ও দান করেন সবাই মিলে; কিন্তু প্রশ্ন জাগে তারা তো সবাই ছাত্র। তাহলে এই কাজগুলোর টাকা তারা কোথায় পাচ্ছেন! আসলে তারা প্রতুল মুখোপাধ্যায়ের সেই ঘরের খেয়ে বনের ধারের মোষ তাড়ানোর উল্টো স্বভাবের তরুণ-তরুণী। প্রতি মাসে নিজেদের হাত খরচের থেকে কিছু টাকা বাঁচিয়ে চাঁদা দেন। সেই চাঁদার টাকা এক সময় বিন্দু থেকে সিন্ধুতে পরিণত হয়ে সমাজের উন্নয়নে কাজে লাগছে। তারা এই অগ্রযাত্রাকে আরো এগিয়ে নিতে চান। এখন তাদের এই সংগঠনের পক্ষ থেকে সর্বমোট নয়জনকে পড়ালেখা করাচ্ছেন। এই ছেলে-মেয়েদের স্কুলে ভর্তি করিয়ে যাবতীয় খরচও বহন করেন তারা। পরিকল্পনা আছে একটি আবাসিক স্কুল প্রতিষ্ঠা করার। তাহমিদুলের ভাষায়, ‘আমাদের সব থেকে বড়ো বাধা হলো ঝরে পড়া ছাত্র-ছাত্রীদের বাবা-মায়েরা তাদের সন্তানদের স্কুল ছাড়িয়ে নেন অর্থের অভাবের কারণে। আর পরে আমরা তাদের পড়ার খরচ দিতে চাইলেও ভরণপোষণ করাটাও এই অভিভাবকদের জন্য কষ্টসাধ্য। তাই আমরা আবাসিক স্কুলই প্রতিষ্ঠা করতে চাই। যাতে করে এই সব ছাত্র-ছাত্রীর পুরো দায়িত্বটা নিতে পারি।’ আজকাল ঢাকা শহরে গাড়ির নিচে চাপা পড়ে প্রাণ হারাচ্ছেন অনেক পথযাত্রী। যাতে এই ধরনের দুর্ঘটনা না ঘটে সেই লক্ষ্যে তারা সচেতনতামূলক প্রচাভিযানও চালিয়ে আসছেন। যেকোনো মহত্ উদ্যোগে বাধা আসবেই। তারাও বিভিন্ন সময়ে নানা ধরনের প্রতিবন্ধকতার শিকার হয়েছেন। তাই বলে থেমে যাননি; কিন্তু তারা পিছিয়ে পড়তে চান না। এগিয়ে যেতে চান পূর্ণ উদ্যামে। ভয়কে জয় করার মূল মন্ত্র তো তাদের জানাই আছে— ‘ভয় কী মরণে’।