একাত্তরে সংগঠিত মানবতাবিরোধী অপরাধে অভিযুক্ত পলাতক চৌধুরী মুঈনুদ্দিন ও আশরাফুজ্জামান খানের বিরুদ্ধে মামলার বিচারিক কার্যক্রম শেষে রায় ঘোষণা অপেক্ষমাণ রাখা হয়েছে। গতকাল সোমবার বিচারপতি ওবায়দুল হাসানের নেতৃত্বাধীন যুদ্ধাপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২-এ উভয়পক্ষের যুক্তিতর্ক উপস্থাপন শেষ হয়।
আশরাফুজ্জামান ও মুঈনুদ্দিনের বিরুদ্ধে ৫ ধরনের ১১টি মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগ এনেছিলো রাষ্ট্রপক্ষ। অভিযোগে বলা হয়, ১৯৭১ সালে বাঙালি জাতিকে মেধাশূন্য করার নীলনকশায় স্বাধীনতার ঠিক আগে ১১ থেকে ১৫ ডিসেম্বরের মধ্যে বুদ্ধিজীবী হত্যাকাণ্ডের ‘দায়িত্বপ্রাপ্ত’ আলবদর বাহিনীর ‘চিফ এক্সিকিউটর’ ছিলেন আশরাফুজ্জামান খান। আর মুঈনুদ্দিন ছিলেন সেই পরিকল্পনার ‘অপারেশন ইনচার্জ’। এ নিয়ে যুদ্ধাপরাধ ট্রাইব্যুনালে দুইটি মামলার রায় অপেক্ষমাণ থাকলো। এর আগে গত ২২ সেপ্টেম্বর বিএনপির সাবেক নেতা আবদুল আলীমের বিরুদ্ধে মামলার রায় ঘোষণা অপেক্ষমাণ রাখে।
গতকাল ট্রাইব্যুনালে আসামিপক্ষে রাষ্ট্র-নিযুক্ত আইনজীবী আবদুস শুকুর খান ও সালমা হাই এই দুই আসামির পক্ষে যুক্তি উপস্থাপন শেষ করেন। এরপর রাষ্ট্রপক্ষের কৌঁসুলি সাহিদুর রহমান পাল্টা যুক্তিতর্ক উপস্থাপন করেন। এ সময় রাষ্ট্রপক্ষ দুই আসামির সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদণ্ডের আরজি জানায়। পরে ট্রাইব্যুনাল বলেন, মামলার রায় অপেক্ষাধীন রাখা হলো। যেকোনো দিন রায় ঘোষণা করা হবে।
তাদের অনুপস্থিতিতেই গত ২৪ জুন মানবতাবিরোধী অপরাধের ১১টি ঘটনায় অভিযোগ গঠন করে বিচার শুরুর আদেশ দেয় ট্রাইব্যুনাল। এর আগে গত ২৮ এপ্রিল তাদের বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ দাখিল করেন প্রসিকিউটর মোখলেসুর রহমান বাদল। রাষ্ট্রপক্ষ অভিযোগ আনে, ৭১ সালে তারা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের নয় জন শিক্ষক, ছয় জন সাংবাদিক ও তিনজন চিকিত্সকসহ ১৮ বুদ্ধিজীবীকে অপহরণের পর নির্যাতনের মাধ্যমে হত্যা করেন। তারা দুই জনেই জামায়াতে ইসলামীর তখনকার সহযোগী সংগঠন ইসলামী ছাত্রসংঘের নেতা ছিলেন এবং বাংলাদেশের স্বাধীনতার বিপক্ষে ‘সক্রিয় অবস্থান’ নেন। আশরাফুজ্জামানের গ্রামের বাড়ি গোপালগঞ্জের মুকসুদপুরের বেজড়া ভাটরা (চিলেরপাড়) গ্রামে। আর মুঈনুদ্দিনের বাড়ি ফেনীর দাগনভুঞার চানপুরে। বর্তমানে আশরাফুজ্জামান যুক্তরাষ্ট্রে এবং মুঈনুদ্দিন যুক্তরাজ্যে রয়েছেন।
গত ২ মে আশরাফুজ্জামান ও মুঈনুদ্দিনের বিরুদ্ধে অভিযোগ আমলে নিয়ে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি করে ট্রাইব্যুনাল। সম্ভাব্য ঠিকানায় তাদের পাওয়া যায়নি বলে রাষ্ট্রপক্ষ জানানোর পর ট্রাইব্যুনালের রেজিস্ট্রারকে দুইটি জাতীয় দৈনিকে এই বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করতে বলা হয়।
বিজ্ঞপ্তি প্রকাশের ১০ দিনের মধ্যে তাদের আদালতে হাজির হতে নির্দেশ দেয়া হয়। উল্লেখিত সময়ের মধ্যে তারা আদালতে হাজির না হওয়ায় তাদের অনুপস্থিতিতেই মামলার কার্যক্রম চালিয়ে যাওয়ার আদেশ দেয় ট্রাইব্যুনাল। এর আগে আবুল কালাম আযাদের অনুপস্থিতিতে ট্রাইব্যুনালে তার বিচার হয়। যুদ্ধাপরাধের দায়ে তার মৃত্যুদণ্ড হয়েছে।
মীর কাসেম আলীর মামলা ট্রাইব্যুনাল-২-এ স্থানান্তর
এদিকে জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদের সদস্য মীর কাসেম আলীর বিরুদ্ধে মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলাটি যুদ্ধাপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১ থেকে ট্রাইব্যুনাল-২-এ স্থানান্তর করা হয়েছে। গতকাল বিচারপতি এ টি এম ফজলে কবীরের নেতৃত্বাধীন ট্রাইব্যুনাল-১ এ আদেশ দেন। এ মামলায় রাষ্ট্রপক্ষের সূচনা বক্তব্যের জন্য দিন ধার্য ছিল। আসামিপক্ষের আইনজীবী মিজানুল ইসলাম সূচনা বক্তব্য মুলতবির আরজি জানান। এর বিরোধিতা করেন রাষ্ট্রপক্ষের কৌঁসুলি সুলতান মাহমুদ। পরে ট্রাইব্যুনাল আদেশে বলেন, ট্রাইব্যুনাল-২-এর তুলনায় এই ট্রাইব্যুনালে অধিকসংখ্যক মামলা নিষ্পত্তির অপেক্ষায় রয়েছে। তাই দ্রুত নিষ্পত্তির স্বার্থে মীর কাসেম আলীর বিরুদ্ধে মামলাটি ট্রাইব্যুনাল-২-এ স্থানান্তর করা হলো।
২০১২ সালের ১৭ জুন রাষ্ট্রপক্ষের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে ট্রাইব্যুনাল-১ মীর কাসেমের বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি করলে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী তাকে গ্রেফতার করে। চলতি বছরের ১৬ মে রাষ্ট্রপক্ষ তার বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ দাখিল করে। ৫ সেপ্টেম্বর ট্রাইব্যুনাল-১ মীর কাসেমের বিরুদ্ধে মানবতাবিরোধী অপরাধের ১৪টি অভিযোগ গঠন করেন।
