ভালো নেই দেশের অধিকাংশ প্রবীণ

আপডেট : ৩০ সেপ্টেম্বর ২০১৩, ২২:৫৩
‘মাগো, গরিবের পোলা নাই, গ্রামে একবেলাও খাইতে পাইতাম না। এক পোলার লগে ঢাকা আইছি। অহন প্রতিদিন ১০০ ট্যাকা না দিলে হেরা (ছেলে) আমারে খাইতে দেয় না।’ বলছিলেন বৃদ্ধ আসির উদ্দিন। ৭৫ বছর বয়সী এই প্রবীণ ব্যক্তিটি রাজধানীর মিরপুর সড়কে ভিক্ষা করেন। সারা শরীর থর থর করে কাঁপে। লাঠিতে ভর দিয়েও ঠিকমত দাঁড়াতে পারেন না। শুধুমাত্র দুমুঠো ভাতের জন্য এই বয়সেও তাকে ভিক্ষা করতে হয় । বারডেম হাসপাতালে ডাক্তার দেখাতে আসতেন রাহেলা বেগম (৭০)। দীর্ঘ সময় লাইনে দাঁড়িয়ে থাকতে অস্থির লাগতো তার। একদিন লাইন ভাঙ্গার অপরাধে গার্ড ধমক দিয়েছিলো। এরপর থেকে দীর্ঘ সময় লাইনে দাঁড়িয়েই ডাক্তার দেখাতেন। কিন্তু একদিন লাইনে দাঁড়িয়ে থাকার সময় মাথা ঘুরে পড়ে যান রাহেলা। এরপর থেকে তিনি আর বারডেমে যান না। আসির উদ্দিন বা রাহেলা বেগমদের মতো দেশে প্রবীণ নাগরিকের সংখ্যা দিনদিন বাড়ছে। প্রবীণরা দেশের মোট জনসংখ্যার একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হলেও সবচেয়ে অবহেলায় রয়েছেন তারা। তাদের সার্বিক কল্যাণ ও সুরক্ষা নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের কর্তব্য হলেও এদেশে সে সুযোগ-সুবিধার কোন বালাই নেই। যার কারণে সমাজে প্রতিনিয়ত হেয় হতে হচ্ছে প্রবীণদের। ঘর থেকে বাইরে গেলেই চোখে পড়ে নানা বয়সী প্রবীণদের রিকশা চালাতে, ঠেলাগাড়ি ঠেলতে কিংবা দীর্ঘ লাইনে দাঁড়িয়ে কোন সেবা নিতে হিমশিম খাচ্ছেন। তাই সমাজ বিনির্মাণের অগ্রসৈনিক দেশের প্রবীণ জনগোষ্ঠীর নানা সমস্যা সমাধানে দাবি উঠেছে একটি প্রবীণ নীতিমালা করার। যেখানে ষাটোর্ধ্ব নাগরিকদের দেশের ‘জ্যেষ্ঠ নাগরিক’ হিসেবে স্বীকৃতি দেয়া হবে। তাদের জন্য নেয়া হবে সামাজিক সুরক্ষামূলক নানা কর্মসূচি। এমন প্রেক্ষাপটে আজ পালন হচ্ছে ‘আন্তর্জাতিক প্রবীণ দিবস। এ বছর দিবসটির প্রতিপাদ্য নির্ধারণ হয়েছে ‘প্রবীণদের প্রত্যাশাই আমাদের ভবিষ্যত্’। এ উপলক্ষে রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা পৃথক বাণী দিয়েছেন। সরকারি ও বেসরকারি বিভিন্ন সংগঠন দিবসটি উপলক্ষে দিনব্যাপী নানা অনুষ্ঠানের আয়োজন করেছে। দেশে প্রবীণদের সংখ্যা কত : ১৯৮১ সালের আদমশুমারীর রিপোর্ট অনুযায়ী দেশে প্রবীণ জনসংখ্যা ছিল ৪০ লাখ ৯০ হাজার। ১৯৯১ সালে এই সংখ্যা বৃদ্ধি পেয়ে দাঁড়িয়েছে ৬০ লাখে। বর্তমানে এক কোটি ২৫ থেকে ৩০ লাখ প্রবীণ জনগোষ্ঠী রয়েছে দেশে। ২০২৫ সালে এই সংখ্যা ১০ শতাংশ বেড়ে দাঁড়াবে ১ কোটি ৮০ লাখে। বর্তমানে দেশের মোট জনগোষ্ঠীর ৭ ভাগই প্রবীণ। ২০২৬ সালে এই সংখ্যা হবে ১০ ভাগ। ‘হেলপএইজ ইন্টারন্যাশনাল, বাংলাদেশ’ এর কান্ট্রি ডিরেক্টর নির্ঝরিনী হাসান বলেন, প্রবীণ জনসংখ্যার বাত্সরিক গড় বৃদ্ধির হার প্রায় ৪ দশমিক ৪১ ভাগ। এই হার অব্যাহত থাকলে আগামী ৫০ বছরে উন্নয়নশীল দেশে মোট জনসংখ্যার ১৯ ভাগ হবে প্রবীণ জনগোষ্ঠী। বিশ্বে এই জনসংখ্যাতাত্ত্বিক রূপান্তর ব্যক্তি, সমাজ, জাতীয় ও আর্থ-সামাজিক জীবনে মারাত্মক প্রভাব ফেলবে। কারণ প্রবীণ ব্যক্তিরা বার্ধক্যজনিত নানা সমস্যায় ভোগেন এবং বার্ধক্য বর্তমান বিশ্বের একটি অন্যতম সমস্যা হিসেবে চিহ্নিত। বাংলাদেশ এই জনগোষ্ঠীকে সহযোগিতা দিতে প্রস্তুত কি না -সেটাই বড় প্রশ্ন! অধিকাংশই দরিদ্র ও বঞ্চিত : রাহেলা বেগম, আসির উদ্দিন এর মতো দেশের শতকরা ৮০ ভাগ প্রবীণই দরিদ্র। এরা অর্ধাহারে-অনাহারে, স্বাস্থ্যসেবা না পেয়ে মানবেতর জীবন-যাপন করছেন। দেশে যৌথ পরিবারগুলো ভেঙ্গে একক পরিবার হচ্ছে। এ অবস্থায় প্রবীণরা অসহায় হয়ে পড়ছেন। যারা কাজ করে জীবিকা নির্বাহ করতেন, বয়সের ভারে তারাই আবার কর্মহীন হয়ে আরো দরিদ্র হয়ে পড়ছেন। দেশের প্রবীণ জনগোষ্ঠীর প্রায় ৭৭ শতাংশই বাস করেন গ্রামে। এরা দরিদ্র, নিরক্ষর, অসহায়, স্বাস্থ্যহীন, পারিবারিক, সামাজিক ও রাষ্ট্রীয়ভাবে উপেক্ষিত ও বিচ্ছিন্ন। সংশ্লিষ্টরা জানান, উন্নত বিশ্বে প্রবীণরা পেনশন পান, ভাতা পান। তাদের স্বাস্থ্য নিরাপত্তা আছে। যাদের ২৪ ঘন্টা সেবা প্রয়োজন হয়, তাদের জন্যে ‘হোম’ আছে। তারপরেও উন্নত বিশ্বে পরিবারের লোকজনকে প্রবীণদের যত্ন নিতে উদ্বুদ্ধ করা হচ্ছে । অথচ আমাদের দেশে এসব কিছুই নেই। আমাদের দেশে কমিউনিটি ক্লিনিক আছে কিন্তু সেখানে প্রবীণদের কোন জায়গা নেই। সরকারি বেসরকারি হাসপাতালগুলোতে প্রবীণদের জন্য বিশেষ ব্যবস্থা নেই। কোন বিশেষজ্ঞ ডাক্তার নেই। ধনী বা উচ্চবিত্তের প্রবীণদের জন্যে রাজধানীর আগারগাঁওয়ে ‘প্রবীণ হিতৈষী সংঘ ও জরা বিজ্ঞান প্রতিষ্ঠান’ নামে একটি প্রতিষ্ঠান তৈরি হলেও গরিবদের জন্যে এ ধরনের কোন প্রতিষ্ঠান নেই। প্রবীণ নীতিমালা দাবি: সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা বলছেন প্রবীণদের জন্য বিশেষ কিছু কর্মসূচি প্রণয়ন করা দরকার। যাতে করে তারা একটু ভালো থাকতে পারেন। প্রথমত, একটি জাতীয় নীতিমালা বাস্তবায়ন হওয়া জরুরি বলে মনে করেন তারা। প্রবীণদের জন্যে এমন একটি আইন হওয়া দরকার যাতে করে একটি নির্দিষ্ট বয়সের পর প্রবীণের সম্পত্তি লিখে নিলেও তা আইনে বৈধতা পাবে না। প্রবীণদের সমস্যা নিরসনে সরকারি ও বেসরকারি পর্যায়ে এগিয়ে আসতে হবে। তারা যাতে অর্থনৈতিকভাবে স্বনির্ভর থাকতে পারে সে ব্যবস্থা রাষ্ট্রকেই করতে হবে। তাদের চিকিত্সা সেবা তৃণমূল পর্যায় পর্যন্ত বিস্তৃত করা, নিজ পরিবারে প্রবীণদের পরিচর্যায় উত্সাহিত করা, বয়স্কভাতা এমন পর্যায়ে উন্নীত করা যাতে একজন প্রবীণ নিজেকে আর্থিকভাবে নিরাপদ ভাবতে পারেন। এছাড়া প্রবীণদের সঙ্গ দেয়া, তাদেরকে সামাজিকভাবে মূল্যায়ন ও সম্মান করা জরুরি। তাদের জন্য পর্যাপ্ত বিনোদনের ব্যবস্থা করাও প্রয়োজন। ‘রিসোর্স ইন্টিগ্রেশন সেন্টার (রিক)’ এর পরিচালক আবুল হাসিব খান বলেন, একটা নীতিমালা হলে, ষাটোর্ধ্ব ব্যক্তিরা ‘জ্যেষ্ঠ নাগরিক’ হিসেবে স্বীকৃতি পাবেন। কারণ প্রায় সময় ব্যাংকে গিয়ে প্রবীণদের দাঁড়িয়ে থাকতে দেখা যায়। হাসপাতাল, বাস, ট্রেনে তাদের জন্যে কোন সিট নেই। যেহেতু এ সময়টা সবাইকে পাড়ি দিতে হবে; সেহেতু এর জন্য সুষুম ব্যবস্থা নেয়া এখনই প্রয়োজন। এটিকে জাতীয় সমস্যা ভেবে সবার এগিয়ে আসা দরকার এবং দ্রুত কিছু পদক্ষেপ নিয়ে তা বাস্তবায়ন করা প্রয়োজন বলে তিনি মনে করেন। কর্মসূচি: এদিকে আন্তর্জাতিক প্রবীণ দিবস উপলক্ষে আজ সরকারি ও বেসরকারি পর্যায়ে নানা কর্মসূচি গ্রহণ করা হয়েছে। এ উপলক্ষে আজ সকাল সাড়ে ৯টায় বাংলাদেশ শিশু একাডেমীর সামনে থেকে শোভাযাত্রা বের করা হবে। শোভাযাত্রাটি শেষ হবে ওসমানী স্মৃতি মিলনায়তনে। সেখানে সকাল সাড়ে ১০টায় সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয় ও বেসরকারি সংগঠন ‘হেল্পএইজ ইন্টারন্যাশনাল’ যৌথভাবে একটি আলোচনা সভার আয়োজন করেছে।