কন্যাশিশুর অধিকার

আপডেট : ০১ অক্টোবর ২০১৩, ১৮:২৪
আমাদের দেশে প্রতিবছর অক্টোবরের প্রথম সোমবার উদযাপন করা হয় বিশ্ব শিশুদিবস। শিশু অধিকার সপ্তাহের আর একটি বিশেষ দিন হলো কন্যাশিশু দিবস। এই দিনটি কন্যাশিশু দিবস হিসেবে ভারতীয় উপমহাদেশে বিশেষ করে সার্কভুক্ত দেশগুলোয় পালন করা হয়। শিশুর অধিকার আদায়, অধিকার রক্ষা এবং এ বিষয়ে প্রতিটি মানুষের মধ্যে গণসচেতনতা সৃষ্টির লক্ষ্যে শিশু অধিকার সপ্তাহ তথা বিশ্ব শিশু দিবস উদযাপন করে থাকি। শিশু কন্যা হোক কিংবা পুত্র হোক তাতে কোনো কিছু ভাববার কথা নয়। কিন্তু আমাদের সমাজে ও পরিবারে অভিভাবকদের ব্যবহারিক চিন্তা-চেতনা সবসময় উল্টো। আজো কন্যাশিশুর জন্মকে অনেক অভিভাবকই খোলা মনে স্বাগত জানান না। আমাদের বিপুল জনগোষ্ঠীর সিংহভাগ গ্রামের বাসিন্দা এবং শিক্ষিত নয়। ফলে গ্রামাঞ্চলে পরিবারে কন্যাশিশুর জন্মকে দেখা হয় অবহেলা ও ঘৃণার চোখে। পরিবারে একই মা-বাবার কাছে অনেক বেশি স্নেহ-মমতা ও ছেলে সন্তানটারই বেশি প্রাপ্য দেখা যায়। কন্যা ও পুত্রের মধ্যকার এই বৈষম্য দূর করা এবং কন্যাশিশুর প্রাপ্য অধিকার সুনিশ্চিত করার লক্ষ্যেই শিশু অধিকার সপ্তাহে একটি দিন বিশেষভাবে বেছে নেয়া হয়। আর সেই দিনটিই হলো ৩০ সেপ্টেম্বর। গত ৩০ সেপ্টেম্বর আমাদের দেশে যথাযথভাবে দিবসটি পালন করা হয়েছে। কন্যাশিশু দিবসের বয়স প্রায় তেইশ বছর পদার্পণ করল এবং কন্যাশিশু দিবসের ধারণা আনুষ্ঠানিকভাবে প্রথম গুরুত্ব পায় ১৯৮৬ খ্রিস্টাব্দে। সে বছর ভারতে অনুষ্ঠিত সার্ক শীর্ষ সম্মেলন ‘কন্যাশিশু বর্ষ’ পালনের সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়। তারপর পাকিস্তানের ইসলামাবাদ শীর্ষ সম্মেলন থেকে ১৯৯০ সালকে শিশুকন্যা ঘোষণা করা হয়। ১৯৯০ সালেই মালদ্বীপের শীর্ষ সম্মেলন ‘১৯৯০ থেকে ১৯৯৯ পর্যন্ত’ দশকটিকে ‘সার্ক কন্যাশিশু’ দশক হিসেবে উদযাপনে সিদ্ধান্ত নেয়। সার্ক কন্যাশিশু দশকের পথ ধরে ২০০০ সাল থেকে বাংলাদেশ জাতীয়ভাবে কন্যাশিশুদের জন্য একটি দিন অর্থাত্ ৩০ সেপ্টেম্বরকে উত্সর্গ করে আসছে। কন্যাশিশু দিবস পালনের এই ইতিহাস সকলের অজানা। মূলত এই দিনটি সার্বজনীন করার ক্ষেত্রে বেসরকারি সংস্থা দি হাঙ্গার প্রোজেক্ট গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। কন্যাশিশুর বিকাশের বিষয়টি আরো অর্থবহ করার লক্ষ্যে এই সংস্থাটি ঐ সময় ৫৪টি সংস্থার সমন্বয়ে গঠন করে জাতীয় কন্যাশিশু অ্যাডভোকেসি ফোরাম। এই ফোরামের বিভিন্ন কর্মসূচি আয়োজনের ফলেই কন্যাশিশু দিবস শিশু অধিকার সপ্তাহের একটি দিন বিশেষ দিন হিসেবে গণ্য হয়েছে। বাংলাদেশের মোট জনসংখ্যার ৬ কোটিরও বেশি শিশু-কিশোর যাদের বয়স ১৮’র বেশি নয়। এই ৬ কোটি শিশু-কিশোরের অর্ধেকটাই কন্যাশিশু। এসব কন্যাশিশুর সিংহভাগ গ্রামাঞ্চলের বাসিন্দা। তবে বিগত বছরগুলোয় পোশাকশিল্পে কিশোরী শ্রমিক নিয়োগের ফলে শহরাঞ্চলে কন্যাশিশু তথা কিশোরী কন্যাদের সংখ্যা ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। এখানে বিশেষভাবে উল্লেখ্য, বাংলাদেশে শিশুশ্রম সম্পূর্ণভাবে নিষিদ্ধ। তা সত্ত্বেও শিশুশ্রমিকদের ক্ষেত-খামার থেকে শুরু করে কল-কারখানা, বাসাবাড়িসহ বিভিন্ন শ্রমের কাজে নিয়োগ দেখতে পাওয়া যায়। এসব ক্ষেত্রে কন্যাশিশুদের দারুণ অবহেলা করা হয়। একজন কন্যাশিশু, যার বয়স ১৮’র মধ্যে, তার কারখানায় মাসিক বেতন ৫০০ টাকার বেশি নয়। বাসাবাড়িতে কিশোরী কন্যাদের পেটে-ভাতে গতর খাটাতে হয়। কখনো কখনো তাকে আলাদা খাবার ও পোশাক দেয়া হয়। কন্যাশিশুদের বয়স ১০/১২, অভাবে তাড়নায় স্কুলে যাওয়া বন্ধ, তাকে মায়ের সাথে ঘরের যাবতীয় কাজ করতে হয়। আবার কোনো কোনো অভিভাবক অর্থের প্রলোভনে মেয়েকে শহরে পাঠায়। কখনো কখনো এই কন্যাশিশুটি হারিয়ে যায়, পাচার হয়ে যায় দেশের বাইরে। যে সোনালি স্বপ্নকে ঘিরে শিশুর জন্ম, সেই শিশু জন্মেই দেখে অভাব, অবহেলা, পরিবারে অসাম্য এবং জীবন নির্বাহের ক্ষেত্রে কেবল স্বপ্নভঙ্গ। শুধু তাই নয়, অল্প বয়সে কন্যাশিশুদের বিয়ের পিঁড়িতে বসতে হয়। যার বিয়ের বয়স হয়নি, ঘর-কন্না সম্পর্কে যার আজো কোনো ধারণা নেই, অনিচ্ছা সত্ত্বেও তাকে স্বামীর বাড়ি যেতে হয়। সরকারিভাবে পাত্র-পাত্রীর বয়স নির্ধারিত করা হলেও এ আইন মানা হয়নি। আজো কন্যাশিশুরা এই অল্প বয়সে বিয়ে নামক ব্যবস্থাটির কবলে পড়ে শৈশব-কৈশোরকে বিসর্জন দেয়। কখনো কখনো অভিভাবকদের নিপীড়নে নির্মল ও কোমল প্রাণটি হারাতে হয়। আমরা অনেকেই জানি, শিশুর অধিকার রক্ষা ও বিকাশের লক্ষ্যে দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের পর ১৯৫৪ সালের ২০ সেপ্টেম্বর জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে শিশু অধিকার ঘোষণা গৃহীত হয় এবং তৈরি করা হয় শিশু অধিকার সনদ। আমাদের দেশে ১৯৭৪ সালে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের একান্ত আগ্রহে শিশু আইন প্রণয়ন করা হয়। শুধু তাই নয়, বাংলাদেশের সংবিধানের ২৮(৪) ধারায় শিশুর উন্নয়ন ও তাদের ভবিষ্যত্ গড়ার কথা যথাযথভাবে স্থান দেয়া হয়েছে। অপরদিকে জাতীয় শিশুনীতি ১৯৯৪ ও জাতীয় শিশুনীতি ২০১১-তে শিশুর সার্বিক দিক বিবেচনায় এনে শিশুর সামগ্রিক উন্নয়নের কথা বলা হয়েছে। জাতিসংঘ প্রণীত শিশু অধিকার সনদের দ্বিতীয় অনুচ্ছেদের দুই নম্বর ক্রমিকে বলা হয়েছে: শিশুর পিতা-মাতা, আইনসম্মত অভিভাবক কিংবা পরিবারের সদস্যদের অবস্থান, কার্যকলাপ, প্রকাশ্য মতামত বা বিশ্বাস যদি কোনো শিশুর জন্য বৈষম্য কিংবা শাস্তির কারণ হয়, তবে অংশগ্রহণকারী রাষ্ট্রসমূহ শিশুর অধিকার রক্ষার জন্য সব ধরনের প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করবে। শিশুদের মধ্যে এই বৈষম্যের চিত্র আমাদের সমাজে বেশি। এ কারণেই কন্যাশিশুর সম-অধিকারের প্রশ্নে শিশু সনদের এই নির্দেশনা। কিন্তু বাস্তবক্ষেত্রে সনদের মূলনীতিসমূহ কার্যকর হতে দেখা যায় না। এ কারণেই আমাদের জাতীয় শিশুনীতি-২০১১-তে ৮ নম্বর ধারায় কন্যাশিশুদের উন্নয়নের জন্য বিশেষ করে বৈষম্য দূর করার জন্য হয়েছে— ১. কন্যাশিশুর শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্যের যথাযথ বিকাশের লক্ষ্যে প্রয়োজনীয় অধিকারসমূহ নিশ্চিত করা। ২. কন্যাশিশুর প্রতি সকল প্রকার বৈষম্যমূলক আচরণ দূরীকরণ এবং পরিবারসহ সকল ক্ষেত্রে লিঙ্গ সমতা নিশ্চিত করা হবে। ৩. কন্যাশিশুদের প্রতিষ্ঠানের নিয়মিত উপস্থিতি নিশ্চিত করা হবে। ৪. শিক্ষা প্রতিষ্ঠানসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে যেমন রাস্তাঘাটে কন্যাশিশুরা কোনোরূপ যৌন হয়রানি, পর্ণোগ্রাফী, শারীরিক ও মানসিক নির্যাতনের শিকার না হয় তার জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে। ৫. কন্যাশিশুর জন্য নিরাপদ ও মানসম্পন্ন বিনোদন, খেলাধূলা ও সাংস্কৃতিক চর্চার সুবিধা নিশ্চিত করতে হবে। ৬. প্রতিবন্ধী কন্যাশিশুর প্রতি বৈষম্যমূলক আচরণ দূরীকরণ এবং সকল ক্ষেত্রে নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হবে। জাতিসংঘের শিশুসনদ ও জাতীয় শিশুনীতির এমন নির্দেশনা থাকা সত্ত্বেও আমাদের সমাজে কন্যাশিশুদের বৈষম্য পরিলক্ষিত হতে দেখা যায়। আমরা যদি সচেতনভাবে পুরুষতান্ত্রিক মানসিকতা বর্জন করে সমদৃষ্টিতে সন্তানদের সঙ্গে আচরণ করি, তাহলে বৈষম্য দূর হবে। এটাই সত্, দেশপ্রেমিক কর্মক্ষম ভবিষ্যত্ প্রজন্ম গড়ার জন্য অভিভাবকদের এমন মন-মানসিকতা তৈরি করা উচিত। আমরা একুশ শতকে বাস করছি। আমরা কেউ মধ্যযুগীয় চিন্তা-চেতনা লালন করব না। কন্যাশিশু আমাদের সন্তান, বেঁচে থাকার প্রশ্নে সকল অধিকার তার প্রাপ্য, তার প্রতি বৈষম্যমূলক আচরণ অমানবিকতার শামিল। আসুন আমরা কন্যাশিশুটিকে পুত্রশিশুটির মতো আদর-মমতা ও স্নেহের পরশে বড় করে তুলি।