বসু বাজার লেনের রোডটা অজগর সাপের মতো লম্বা হয়ে দুদিকে ছড়িয়ে পড়েছে। এর একদিক গিয়ে পড়েছে দয়াগঞ্জের দিকে অন্যপ্রান্ত গিয়ে ছড়িয়ে গেছে দুদিকে। একদিক মনির হোসেন লেন, অন্যদিক শরত্গুপ্ত রোডের দিকে। বসু বাজার লেনে আমরা যে বাসায় ভাড়া থাকি বাসাটা পুরনো আমলের দোতলা বাড়ি। বাড়ির ছাদের যে কার্নিশ রয়েছে তাতে পোড়া মাটির নানা রকমের নকশা আঁকা। বাড়ির দেয়াল জায়গায় জায়গায় খসে পড়েছে আর তাতে করে দেয়ালের ভেতরকার কড়া হলুদ রঙের ইট-সুড়কি সব বেরিয়ে পড়েছে। কখনো সখনো সেই ইট-সুড়কিতে ছোট ছোট পাখি এসে বসে।
আমাদের বাসার সদর দরোজাটা ঠিক রাস্তার ওপরে। ঠিক ওপরে না, সদর দরোজার সামনে ছোট্ট এক চিলতে বারান্দার মতো—তার সামনে বুক সমান দশ ইঞ্চি ইটের আড়াআড়ি দেয়াল। । বড়রা বাড়ির সামনের রাস্তায় ইট দিয়ে গোলবার বানিয়ে ফুটবল খেলে। ফুটবল খেলায় ছোটরা বাদ পড়লে তো বসে থাকা যায় না—আমরা তখন বাড়ির দরোজার সামনের এক চিলতে বারান্দায় কক ফাইট খেলি, লাটটু, খেলি, মার্বেল খেলি। খেলার মধ্যে কখনো আমাদের মধ্যে ঝগড়াঝাটি হলে আমরা খেলা বন্ধ করে দেয়ালে বসে পা ঝুলিয়ে বড়দের বল খেলা দেখি। বড়দের খেলা ভালো না লাগলে রাস্তার পাশে বয়ে যাওয়া স্বচ্ছ পানির ড্রেন দেখি। ড্রেনের স্বচ্ছ পানিতে ছোট ছোট পোনামাছ ঘুরে বেড়ায়। দেখতে ভালোই লাগে। আমরা একবার করলাম কী, কাপড় দিয়ে জাল বানিয়ে ড্রেনের পোনা মাছ ধরছি তখন মলিস্নক বাড়ির তরুণদা বাজার নিয়ে যাচ্ছিলেন। নিষ্ঠার সঙ্গে আমাদের মাছ ধরা দেখে তরুণদা ধমকাতে ধমকাতে বললেন, এই তোরা এসব কী করছিস! বাপের জন্মে শুনিনি এসব মাছ মানুষে খায়!
তরুণদার ধমক খেয়ে আমরা বেমালুম বোকা বনে যাই। তরুণদার কথায় আমি বোকার মতো বললাম, কেন এতো সুন্দর মাছ খাবো না তাই কী হয়!
হয়, হয় তা-ই হয়। এক্ষুণি ওঠ ড্রেন থেকে—
তরুণদার কথা ও ধমকে আমরা ড্রেন থেকে উঠে ভদ্র ছেলেদের মতো যে যার বাড়ি চলে যাই।
বসুবাজার লেনের আমাদের বাড়িকে পাড়ার মানুষ উকিল বাড়ি বলে। আমাদের বাসার নম্বর চব্বিশ। চব্বিশ নাম্বার বসু বাজার লেন। বাড়িঅলা দোতলায় পরিবার পরিজন নিয়ে থাকেন। সবসময় সাদা ফতুয়া আর চক্কর-বক্কর ছাপ্পা মারা ইন্ডিয়ান লুঙ্গি পরে ঘুরে বেড়ান। বাড়ির ভেতরে অনেকখানি খোলা জায়গায়। বাড়ির শেষ সীমানায় শ্যাওলা ধরা প্রকাণ্ড দেয়াল— তাও এক মানুষ উঁচু। দেয়ালের ওপারে গাছপালায় ঘেরা এক নির্জন দোতলা বাড়ি, যে বাড়ির চারদিকে রেলিং দেয়া বারান্দায়। আমরা কখনো কখনো টিলো এক্সপ্রেস খেলার সময় গাছপালার আড়ালে লুকিয়ে থাকার সময় খেয়াল করেছি ঐ নির্জন বাড়ির ভেতরে কয়েকটা বিদেশি কুকুর তাদের নাদুস-নুদুস শরীর দুলিয়ে একবার বাড়ির এ মাথা আরেকবার বাড়ির ও মাথা দৌড়ে বেড়াচ্ছে। বিকেল হলেই বাড়ির দোতলার বারান্দায় দেখা যেত এক বুড়োকে। ইজি চেয়ারে আধ-শোয়া হয়ে তিনি তার চোখ মেলে রাখতেন বাইরের দিকে। আমি আমার বড় ভাইকে একদিন জিজ্ঞেস করেছিলাম, বুড়ো লোকটাা কে? বড় ভাই চোখ বড় বড় করে বলেছিলেন, তিনি হলেন নামকরা মানুষ। দেশের সবাই তাকে চেনেন। তার নাম সওগাত সম্পাদক মোহাম্মদ নাসিরউদ্দিন।
বড় ভাইয়ের মুখে নামটা শুনে আমি খুব অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করলাম। মানুষের নাম এতো লম্বা হয়! বলে আমি আবার উচ্চারণ করলাম, সওগাত সম্পাদক মোহাম্মদ নাসিরউদ্দীন।
আমার কথা শুনে বড় ভাই আমাকে ধমক দিলেন, তুই তো দেখে একটা লেবেন্ডিশ। বোকা হাঁদারাম। তার নাম মোহাম্মদ নাসিরউদ্দীন। তিনি ‘সওগত’ নামের একটা পত্রিকার সম্পাদক ছিলেন—এইজন্য তাকে সবাই সওগাত সম্পাদক মোহাম্মদ নাসিরউদ্দীন বলে ডাকে, বুঝলি?
দুই
ছোটবেলায় আমি একটু বোকা রকমের ছিলাম। আমার নানীবাড়ি বিক্রমপুর। বন্ধুরা আমাকে লেবেন্ডিশের পাশাপাশি ‘মেন্দা’ বলেও ডাকত। বিক্রমপুর অঞ্চলে মেন্দা হলো বোকা। কেউ আমাকে একটা কথা বললে আমি প্রথমটায় বুঝতাম না। দুতিনবার বলে ভালো করে বুঝিয়ে দিলে পরে আমি বুঝতাম। নানী আমাদের বাসায় থাকতেন। মাসে দুই মাসে তার নিজের সংসারে যেতেন—আজিপুর কলোনিতে। নানী আমাদের ছেড়ে আর কোথায়ই বা যাবেন? আমার মাকে বছরের বেশিরভাগ সময় হাসপাতালে থাকতে হয়—মার কী এক জটিল অসুখ। বাবা সকালবেলা দয়াগঞ্জ থেকে বাজার-হাট করে দিয়ে আমাদের খাইয়ে-দাইয়ে স্কুলে পাঠাতেন। আমরা স্কুলে চলে যাবার পর বাবা নাশতা সেরে ছুটতেন কোর্টে। দুপুরের পর কোর্ট থেকে বাবা যেতেন মার কাছে হাসপাতালে। সন্ধ্যার পর ফিরে আসতেন বাসায়। বাসায় আসার পর বাবা আমাদের পড়াশোনার খোঁজখবর নিয়ে পত্রিকা নিয়ে বসতেন। কখনো-কখনো সন্ধ্যার পর বাড়িতে বাবার মক্কেলরা এলে বৈঠকখানা ছেড়ে আমাদের ভেতরের ঘরে চলে আসতে হতো। বাবা অনেক রাত পর্যন্ত কেস-কাবারি নিয়ে মক্কেলদের সাথে কথাবার্তা বলতেন। পড়াশোনা খাওয়া-দাওয়া শেষে আমরা ঘুমিয়ে গেলে বাবাও ছোট মানুষের মতো কুন্ডলী পাকিয়ে আমাদের পাশে এসে শুয়ে পড়তেন।
বাবা সপ্তাহে একদিন আমাদেরকে নিয়ে যেতেন মার কাছে। বিকেলবেলা আমরা খেলা ফেলে রিকশায় করে আমাদের মাকে দেখতে যেতাম। মাকে দেখতে যাওয়া যে কতো আনন্দের সেটা সেই বয়সে বলে বোঝানো যেত না। এখন বুঝি। হাসপাতালে গেলে মা আমাদের দেখে খুব খুশি হতেন। তিনতলায় মার কেবিনে আমরা আমাদের মাকে ঘিরে দাঁড়িয়ে থাকতাম।
হাসপাতাল থেকে চলে আসার সময় বড় তিন ভাইকে মা বুঝিয়ে বলতেন, তোরা তোদের নানীকে কখনো বিরক্ত করবি না। খাবার নিয়ে রাগ করবি না। নানী যা রান্না করবে তা-ই খাবি। নানী যা বলে সেভাবে চলবি— কী আমার কথা মনে থাকবে? আমি মায়ের পায়ের কাছে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে মার কথা শুনছিলাম। বড় তিন ভাইয়ের সঙ্গে কথা বলা শেষ হলে মা আমার দিকে তাকিয়ে বললেন, কীরে আমার মেন্দা পোলা! তুই এতো দূরে দূরে থাকিস কেন?
মার মুখে ‘মেন্দা পোলা’ শুনে আমার চোখ দিয়ে পানি চলে আসার উপক্রম হলো। চোখের পানি কোনো রকম ধরে রেখে মাকে বললাম, আমি মেন্দা!
আমার কথা শুনে বড় ভাই চট করে বললেন, মা সাবুরে মেন্দা বইলো না। ওর নাম তো লেবেন্ডিশ।
এবার মা বড় ভাইকে ধমক লাগালেন, আমার সাবুরে তরা লেবেন্ডিশ কবি না। ও আমার সবচেয়ে ঠাণ্ডা পোলা।
মাকে দেখে ফিরে আসার সময় হঠাত্ করে ঝমঝম করে বৃষ্টি পড়া শুরু হলো। রিকশাঅলা রিকশা থামিয়ে বাবাকে বললেন, স্যার তাড়াতাড়ি পোলাপান লয়া একটু নামেন। গদির নিচ থিকা পলিথিন বাইর করতে হইবো।
বাবা রিকশা থেকে নামলেন না। আমাদের দিকে তাকিয়ে বললেন, আমার খুব বৃষ্টিতে ভিজতে ইচ্ছা করছে। তোমরা কী বৃষ্টিতে ভিজবা?
বাবার কথায় রিকশাঅলা অবাক হয়ে বাবার দিকে তাকিয়ে থাকেন। চারপাশের বৃষ্টি তখন জমে উঠেছে। আমরা সবাই বৃষ্টিতে ভিজছি। রিকশা চলছে। ঠিক সে সময় আমার মার ওপর খুব রাগ হচ্ছিল। বৃষ্টির মধ্যে ভিজতে ভিজতে আমি ভাবছি, আহা! মা যদি এখন আমাদের সঙ্গে এই বৃষ্টিতে ভিজত!
