কয়েক দিন ধরেই গার্মেন্টসশিল্পে শ্রমিক বিক্ষোভ চলছে। রাজধানীতে সড়ক অবরোধের ঘটনা ঘটেছে। পুলিশের সঙ্গে বিক্ষুব্ধ গার্মেন্টসশ্রমিকদের ধাওয়া-পালটাধাওয়া হয়েছে। সাভার, গাজীপুর এবং নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লায় সড়ক অবরোধ ও গাড়ি ভাঙচুরের ঘটনা ঘটেছে।
বাংলাদেশের রপ্তানি আয়ের সবচেয়ে বড় এই খাতে নির্বিঘ্ন উত্পাদনের বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তাই শ্রমিকদের জীবনমানের বিষয়টি অবহেলা করার সুযোগ নেই। সেইজন্য তাদের দাবি-দাওয়া গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করতে হবে মালিকপক্ষকে। একটি প্রতিষ্ঠানে শ্রম-অসন্তোষ চলতে থাকলে সেই শিল্পের বিকাশ কিংবা উন্নতি ব্যাহত হতে বাধ্য।
পোশাকশ্রমিকদের জন্য ৬০০ টাকা মজুরি বাড়ানোর যে প্রস্তাব দিয়েছে মালিকপক্ষ, তাতে ন্যূনতম মজুরি দাঁড়ায় তিন হাজার ৬০০ টাকা। বর্তমান মূল্যস্ফীতির বাজারে এই মজুরিতে একজন মানুষের জীবন ধারণ করা কীভাবে সম্ভব, আমাদের বোধগম্য নয়। অথচ দেশের সবচেয়ে বেশি উপার্জনশীল খাত এই পোশাকশিল্প।
পোশাকশিল্পে শ্রমিকের ন্যূনতম মজুরি মানবিক ও যুগোপযোগী করতে দীর্ঘদিন ধরে দাবি করে আসছেন শ্রমিকরা। এ নিয়ে আন্দোলন এমনকি দেশের বিভিন্ন স্থানে ভাঙচুর ও সহিংসতা কম হয়নি। মজুরি বাড়ানো যে দরকার, তা সরকার ও মালিকপক্ষও অস্বীকার করছেন না; কিন্তু ন্যায্য মজুরি দিতেই কেবল অনীহা মালিকপক্ষের। তাই শ্রমিকদের দাবির বিপরীতে মালিকপক্ষ যে মজুরি বাড়াতে চান, তা কতটা সমীচীন, সেই প্রশ্ন উঠেছে।
পোশাকশিল্পের শ্রমিকদের জন্য গঠিত মজুরি বোর্ডে ন্যূনতম মজুরি আট হাজার ১১৪ টাকা করার প্রস্তাব দিয়েছেন শ্রমিকপক্ষ। আর মালিকপক্ষ প্রস্তাব করেছেন তিন হাজার ৬০০ টাকা। মালিকপক্ষ বলছেন, এর চেয়ে বেশি মজুরি বাড়ানো সম্ভব নয় তাঁদের পক্ষে। কিন্তু নিজের শিল্পের উত্পাদনের স্বার্থেই মালিকপক্ষকে শ্রমিকের জীবনমানের দিকটি দেখতে হবে। মজুরি বোর্ডে দুই পক্ষের দেওয়া প্রস্তাবের ব্যবধান দর-কষাকষির মাধ্যমে গ্রহণযোগ্য একটা পর্যায়ে আনা দরকার।
দেশে যে মূল্যস্ফীতি হয়েছে, তাতে পোশাকশিল্পের শ্রমিকদের বর্তমান বেতন দিয়ে চলা সত্যিই কষ্টকর। তিন হাজার ৬০০ টাকা দিয়ে ঢাকার মতো বড় শহরগুলোতে একজন মানুষের থাকা-খাওয়াই কষ্টকর; বাড়তি খরচের কথা ভাবা দূরের বিষয়। তাহলে শ্রমিকরা কী করে শান্তিমতো কাজে মনোযোগ দেবেন? উত্পাদনে এর নেতিবাচক প্রভাব পড়াই স্বাভাবিক। বাংলাদেশের ৪০ লাখ কর্মীর এই খাতটি এমনিতেই নানা ঘটনা-দুর্ঘটনায় নাজুক অবস্থায় আছে। ক্রেতারা বারবার সতর্ক করে আসছেন, শ্রমিকের জীবনমানের উন্নয়ন ও নিরাপত্তা নিশ্চিত না হলে বাংলাদেশের পোশাক খাত নিয়ে তাঁরা নতুন করে ভাববেন। এমনটা হলে মালিক-শ্রমিক দুই পক্ষের জন্যই তা ক্ষতির কারণ হবে। বাংলাদেশের জন্যও।
আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতা বেড়েছে—এ কথা যেমন ঠিক, তেমনি বিশ্বের সবচেয়ে সস্তা শ্রমের কারণে ক্রেতাদের প্রথম পছন্দ বাংলাদেশ। বাংলাদেশের পোশাককর্মীদের চেয়ে অনেক বেশি মজুরি পান অন্যান্য দেশের পোশাককর্মীরা। পোশাক খাতে বিশ্বের প্রধান রফতানিকারক দেশের শ্রমিকরা কেন কম মজুরি পাবেন? শ্রমিকদের স্বার্থ না দেখে শুধু নিজেদের লাভের কথা ভেবেই মালিকপক্ষ দর-কষাকষি করেন বলে এমনটা হচ্ছে। মালিকদের এই মানসিকতা বদলাতে হবে। রাতারাতি টাকার কুমির হওয়ার স্বার্থচিন্তা না থাকলে শ্রমিকদের শোষণ কমে আসবে।
চলমান এই শ্রমিক অসন্তোষ দেশের গার্মেন্টসশিল্পের জন্য শুভকর নয়। বিদেশি ক্রেতারা দেশের গার্মেন্টসশিল্পে একটি সুস্থ পরিবেশ চান। একইসঙ্গে দেশের পোশাকশ্রমিকদের উন্নত জীবনমানের নিশ্চয়তাও দেখতে চান তাঁরা। গার্মেন্টসশ্রমিকদের জীবনমান ও কাজের পরিবেশ উন্নত করার জন্য বেশ কিছু পদক্ষেপ নেওয়ার কথা শোনা গেছে। কিন্তু ন্যূনতম জীবনমানের নিশ্চয়তা মজুরিতে না মিললে তা নিশ্চিত করা সম্ভব নয়।
দেশের গার্মেন্টসশিল্পে স্থিতিশীল পরিবেশ নিশ্চিত করা যাচ্ছে না। শিল্প-কারখানায় মালিক-শ্রমিক সম্পর্ক হওয়া উচিত একই পরিবারের সদস্যদের মতো। মালিকরা যেমন শ্রমিকদের নিজের পরিবারের সদস্য হিসেবে ভাববেন, তেমনি শ্রমিকদেরও কর্মক্ষেত্রটিকে নিজেদের বলে ভাবতে হবে। সম্পর্কের উন্নয়ন ঘটাতে না পারলে কোনোভাবেই শিল্পের মান রক্ষা করা সম্ভব হবে না।
দেশের অর্থনীতির চাকা সচল রাখা এই বিকাশমান শিল্পটিকে রক্ষা করতে হবে। আমাদের গার্মেন্টসশিল্প বিদেশি ক্রেতাদের ওপর নির্ভরশীল। এই শিল্পকে টিকিয়ে রাখার দায়িত্ব মালিক-শ্রমিক উভয় পক্ষের। সুস্থ কর্মপরিবেশ ফিরিয়ে আনতে উভয় পক্ষকে সমঝোতায় আসতে হবে।
ঢাকা
