ইকবাল খন্দকার
আমার এক বড়ভাইকে ফোন করলাম জরুরি একটা কাজে। তিনি প্রথমবার তো ফোন ধরলেনই না, দ্বিতীয়-তৃতীয়বারেও ফোন ধরলেন না। ভাবলাম কোনো সমস্যা কি না। তাই ছোট্ট একটা বিরতি নিয়ে আবার ফোন দিলাম। এবার ধরলেন। আর তাগাদা দিলেন দ্রুত কথা শেষ করার জন্য।
আমি বললাম, ‘ভাই, কোনো সমস্যা নাকি? মানে কোনো ঝামেলায় আছেন?’
ভাই বললেন, ‘ঝামেলা মানে! বিরাট ঝামেলা। বিভিন্ন জিনিসে ভেজাল ধরা পড়ার খবর শুনে আমার মধ্যে এমন এক আতঙ্ক তৈরি হয়েছে, এখন সারাদিনই বাসায় ব্যস্ত থাকতে হয়। অথচ আগে বাসায় ঢুকেই ঘুম দিতাম।’
আমি বললাম, ‘ভেজালের সঙ্গে বাসার ব্যস্ততার সম্পর্ক কী?’
বড়ভাই বললেন, ‘আসলে হয়েছে কী, আমার বাসায় বেশ কয়েকটা মাকড় আছে। অনেকদিন আগেই এরা ঢুকেছে। এদের কাজ হচ্ছে জাল বানানো। আগে বিষয়টা নিয়ে আমার কোনো সমস্যা ছিল না। কিন্তু খাবারে উপর্যুপরি ভেজাল ধরা পড়ার পর ‘ভেজাল’ শব্দটা আমার মাথায় এমনভাবে ঢুকেছে, এখন মাকড়ের জাল দেখলেই ভেজালের কথা মনে পড়ে। জাল আর ভেজাল। কাছাকাছি না? এই জন্য সারাদিন আমি মাকড়কে দৌড়ের ওপর রাখি। যাতে জাল পাততে না পারে।’
আমি বললাম, ‘যারা ভেজাল নিয়ে কারবার করে, তাদের কিছু করতে পারেন না, মাকড় সামান্য একটা জাল পাতে, আর লেগেছেন মাকড়ের পেছনে। যত দোষ, মাকড় ঘোষ!’
আমার এক ছোটভাই বলল, ‘আজকাল আমি আমার ভাতিজাকে কোলে নিতে ভয় পাচ্ছি। ভাতিজাটা অল্পতেই ভয় পেয়ে যায় তো। যতদিন ভেজালের জ্বালাতন থাকবে, ততদিন হয়তো ওকে আর কোলেই নেওয়া হবে না।’
আমি ছোটভাইয়ের কথায় অনেকক্ষণ তাজ্জব হয়ে থেকে বললাম, ‘তোর কথার আগামাথা তো কিছুই বুঝতে পারছি না। ছোট বাচ্চা কোলে নিবি, এখানে ভেজালের কথা কেন আসছে। আর অল্পতে ভয় পেয়ে যাওয়ার কথাটা যেন কী বললি?’
ছোটভাই বলল, ‘পুরো জিনিসটাই তাহলে বুঝিয়ে বলি। এখন তো বাজারে ভেজাল জিনিস ছাড়া আর কিচ্ছু নেই। তো এই ভেজাল জিনিস খেলেই কী হয়, আমার পেটে গুড়ুম গুড়ুম করে আওয়াজ হয়। আর এই আওয়াজ শুনে ভয় পেয়ে যায় আমার শিশু ভাতিজা। এই জন্যই বলছিলাম, যতদিন না ভেজাল বন্ধ হচ্ছে, ততদিন যেহেতু আমার পেটের গুড়ুম গুড়ুমও বন্ধ হচ্ছে না, তাই ততদিন বোধহয় ভাতিজাকে আর কোলে নেওয়া হবে না। বাচ্চা মানুষ। বেশি ভয় পেলে আবার মানসিক বিকাশে সমস্যা হতে পারে।’
আমার এক খালু বললেন, ‘আগে বাজারে মাছ কিনতে গিয়ে খেয়াল করতাম কোন মাছের ওপর মাছি বসে। মানে মাছি বসলে ধরে নিতাম এটাকে ফরমালিন দেওয়া নেই। কিন্তু অবাক কাণ্ড হচ্ছে, এখনকার মাছিদের কোনো বাছবিছার নেই। এখন সব মাছের ওপরই বসে। এখানে দুটো কারণ থাকতে পারে। নাম্বার ওয়ান, মাছিদের গা সওয়া হয়ে গেছে। নাম্বার টু, আজকাল আর উচ্চ বংশীয় মাছির জন্ম হচ্ছে না। সব মাছিই ছোটলোক। একটা মাছিরও কোনো আত্মমর্যাদাবোধ নেই। সামাজিক স্ট্যাটাস নেই। কীয়েক্টাবস্থা!’
