দেশের সর্ববৃহত্ চিকিত্সাসেবা প্রতিষ্ঠান ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল। দরিদ্র ও অসহায় রোগীদের চিকিত্সাসেবার জন্য আর কোথাও ঠাঁই না হলেও এখানে তাদের জন্য দরজা খোলা থাকে সব সময়। বেড থাকুক আর না থাকুক দরিদ্র ও অসহায় রোগীদের ভর্তি করে চিকিত্সা দেয়াকেই প্রথম কাজ মনে করেন চিকিত্সক ও হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ। অনেক সময় মেঝেতে কিংবা বারান্দায় রেখেও জটিল অপারেশন পর্যন্ত করতে হয় চিকিত্সকদের। তবে হাসপাতালের সেই সীমাবদ্ধতা কাটিয়ে উঠতে এবার হাসপাতালে নতুন করে যোগ হচ্ছে ৬শ’ বেডের অত্যাধুনিক ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল-২। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা আজ বৃহস্পতিবার ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল-২ এর আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করবেন।
ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল-২ এ দেশের প্রথম বোনম্যারো ট্রান্সপ্ল্যান্ট (অস্থিঃমজ্জা সংযোজন) ব্যবস্থার সুযোগ থাকছে। প্রথম বারের মতো ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল-২ এ বোনম্যারো ট্রান্সপ্ল্যান্ট ব্যবস্থা চালু হলে দরিদ্র অসহায় রোগীরা উপকৃত হবেন বহুলাংশে। বিদেশে গিয়ে বোনম্যারো ট্রান্সপ্ল্যান্ট করানো যেখানে মধ্যবিত্ত পরিবারের পক্ষে এক প্রকার অসম্ভব ব্যাপার সেখানে দরিদ্র মানুষ তো কল্পনাই করতে পারে না। অত্যন্ত ব্যয়বহুল চিকিত্সা হওয়ায় এদেশে প্রাইভেট হাসপাতালে এ চিকিত্সা সেবা চালু হলেও তা সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরেই থেকে যাবে। ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল-২ এ বোনম্যারো ট্রান্সপ্ল্যান্টের ব্যবস্থা তাই সাধারণ মানুষের জন্য আশীর্বাদ হিসাবেই বিবেচিত হবে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞ চিকিত্সকরা।
এক চিকিত্সক জানিয়েছেন, ব্লাড ক্যান্সার, থ্যালাসিমিয়া, লিপ্লোমা ও মাইলোমায় আক্রান্ত রোগীদের জন্য অত্যাধুনিক চিকিত্সাই হলো বোনম্যারো ট্রান্সপ্ল্যান্ট। সরকারিভাবে ৫ লাখ থেকে ১০ লাখ টাকার মধ্যে বোনম্যারো ট্রান্সপ্ল্যান্ট ফি নির্ধারণ করা হবে। এটা দরিদ্র ও মধ্যবিত্ত রোগীদের জন্য অনেক বড় সুখবর।
ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল হেমাটোলজি বিভাগের ও বোনম্যারো সেন্টারের প্রধান অধ্যাপক ডা. এম এ খান বলেন, রোগীর নিজের দেহের ট্রাম্পসেল সংগ্রহ করে বোনম্যারো ট্রান্সপ্ল্যান্ট করলে ভারতে এর খরচ পড়বে ৮ লাখ টাকা। সিঙ্গাপুরে এ খরচ বেড়ে দাঁড়াবে ৩০ লাখ টাকার উপরে। আর অন্যের দেহ থেকে ট্রাম্পসেল সংগ্রহ করলে এ খরচ ভারতে কমপক্ষে ৩০ লাখ এবং সিঙ্গাপুরে ১ কোটির বেশি হবে। আমেরিকাসহ উন্নত দেশে বোনম্যারো ট্রান্সপ্ল্যান্ট খরচ আরো বেশি। বিত্তশালী রোগীদেরও এ ব্যয়ভার বহন করতে হিমশিম খেতে হয়।
বিশেষজ্ঞ চিকিত্সক ডা. এম এ খানের নেতৃত্বে আটজনের একটি চিকিত্সক দল ও বিশেষজ্ঞ ট্রেনিংপ্রাপ্ত ২০ জন নার্সের একটি দল এবং ৫ জন টেকনিশিয়ানের একটি গ্রুপ বোনম্যারো ট্রান্সপ্ল্যান্টের কাজ করবে। নতুন এ হাসপাতালে আগামী ৬ অক্টোবর থেকে রোগী ভর্তি শুরু হবে এবং ২৩ অক্টোবর থেকে বোনম্যারো ট্রান্সপ্ল্যান্ট শুরু হবে। প্রতিদিন ২ জন রোগীর ট্রান্সপ্ল্যান্ট করা যাবে বলে জানান এ বিশেষজ্ঞ চিকিত্সক।
হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ জানান, ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালটি ১৭০০ বেডের হলেও প্রতিদিন রোগী থাকে ২৫০০ থেকে তিন হাজার। জনবল চাহিদার তুলনায় তিনভাগের এক ভাগ। তারপরও মাত্রাতিরিক্ত চাপের মধ্যে রোগীরা সুচিকিত্সা পেয়ে থাকেন। এ হাসপাতালটির সঙ্গে নবনির্মিত হাসপাতাল-২ এর ৬শ বেড যোগ হলে রোগীদের বিছানা পেতে হয়রানি ও দুর্ভোগ কমবে। নতুন ভবন-২ এ হেমাটোলজি ও বোনম্যারো ট্রান্সপ্ল্যান্ট বিভাগ ছাড়াও মেডিসিন ও এর সাব স্পেশালাইজ্ড ইউনিটগুলো স্থানান্তর করা হবে। গ্যাস্ট্রো এন্টারোলজি, নেফ্রোলজি, নিউরোলজি, হূদরোগ, শিশু (মেডিসিন), এনড্রোকায়েনোলজি, ফিজিক্যাল মেডিসিন, মনোরোগ চিকিত্সা ও ট্রান্সফিউশন মেডিসিন (ব্লাড ব্যাংক) বিভাগগুলো ঐ ভবনে স্থানান্তর করা হবে। এক্সরে প্যাথলজিসহ সবধরনের আধুনিক পরীক্ষা-নিরীক্ষার ব্যবস্থা থাকছে নতুন ভবনে।
নতুন ভবনে ২০ বেডের অত্যাধুনিক আইসিইউ ব্যবস্থা রয়েছে। এছাড়া ১৯টি কেবিন রয়েছে যা পাঁচতারা হোটেল কক্ষের ন্যায়। এখানে হূদরোগীদের জন্য পূর্ণাঙ্গ চিকিত্সা, এনজিওগ্রাম এবং সার্জারি করার ব্যবস্থা রয়েছে। ৬টি লিফট এবং এর মধ্যে একটি সরাসরি ১০তলায় বোনম্যারো ট্রান্সপ্ল্যান্ট সেন্টারে কর্মরত ডাক্তার ও রোগীদের জন্য নির্ধারিত। অন্যদিকে পুরনো ভবনে থাকছে জেনারেল সার্জারি এবং সাব-স্পেশালাইজ্ড সার্জারি ইউনিটসমূহ। শিশু সার্জারি, নিউরো সার্জারি, অর্থোপেডিক্স, ইউরোলজি, ক্যাজুয়েলটি, গাইনি ও অবসর এবং চক্ষু ও নাক কান গলা ও ক্যান্সার বিভাগ।
হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ জানান, ২০০০ সালের শেষদিকে তত্কালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দৃষ্টিনন্দন ১০তলা ভবনবিশিষ্ট ৬শ’ বেডের হাসপাতাল-২ এর ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেছিলেন। হাসপাতাল ভবন-২ প্রকল্পের অধীনে টাকাও বরাদ্দ করেছিলেন। বিএনপি নেতৃত্বাধীন চার দলীয় জোট সরকার ক্ষমতায় আসার পর ঐ ভবনের নির্মাণ কাজ বন্ধ করে দেয়। আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে মহাজোট সরকার পুনরায় ক্ষমতায় আসার পর আবারো ঐ ভবন নির্মাণ শুরু হয়। ২০০৯ সালের মার্চ থেকে নির্মাণ কাজ শুরু হয়ে শেষ হয় সেপ্টেম্বর মাসে। হাসপাতাল নির্মাণে ব্যয় হয় একশ এক কোটি টাকা।
ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মো. মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, নতুন ৬শ’ বেডের ১০তলা ভবন হাসপাতাল-২ চালু হওয়ায় মূল ভবনে রোগীদের চাপ কমে যাবে। অত্যাধুনিক ব্যবস্থাপনায় রোগী সুচিকিত্সা পাবে। সাব-স্পেশালাইজ্ড ইউনিটগুলোর চিকিত্সা সমপ্রসারণ হওয়ার ফলে দ্রুত সঠিক জায়গা থেকে সঠিক চিকিত্সা পাবে রোগী।
