পুন্ড্র কালপরিক্রমায় হয়ে ওঠে মহাস্থান

আপডেট : ২৮ নভেম্বর ২০১৮, ১৯:০৮

ভূ-তাত্ত্বিকদের মতে আজ থেকে পঁচিশ লক্ষ বছর আগে পৃথিবীর মাটি সরে গিয়েছিল। আর তারপর কাল পরিক্রমায় করতোয়া নদীর অববাহিকায় সমতল ভূমিতে গড়ে ওঠে একটি জনপদ। নাম তার পুন্ড্র। নানা কারণে আজ সে মহাস্থান নামে পরিচিত। বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমির নতুন প্রযোজনা প্রত্ন নাটক ‘মহাস্থান’-এর রচয়িতা ড. সেলিম মোজাহার এবং পরিকল্পনা ও নির্দেশনা দিয়েছেন বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমির মহাপরিচালক লিয়াকত আলী লাকী। বাংলাদেশে বোধকরি এত বড় পরিসরে আর কোনো নাটক হয়নি। মহাস্থান নাটকের মোট শিল্পী ৩৫০ জন। নাটকের উপস্থাপন অত্যন্ত জাঁকজমকপূর্ণ ছিল বলে দর্শক বেশ উপভোগও করেছেন। নাটকের পোশাক ঘটনা প্রবাহের সময়কে ধরতে পেরেছে বলে বেশ চমত্কার মনে হয়েছে। কিন্তু নাটককে আমরা যখন কোনো বিশেষ ক্যাটাগরিতে ফেলি, তখন তার বিশেষ কিছু বৈশিষ্ট্য থাকে। যেমন কী কী বিষয় ও বৈশিষ্ট্য থাকলে তাকে আমরা রাজনৈতিক নাটক বলি, আবার কোন কোন বৈশিষ্ট্যের কারণে আমরা একটি নাটককে সামাজিক নাটক বলি ইত্যাদি। কথা হলো মহাস্থান নাটককে নির্দেশক লিয়াকত আলী বলছেন প্রত্ন নাটক, কিন্তু প্রত্নতাত্ত্বিক বিষয়াদির বদলে সেখানে বিশেষভাবে উপস্থাপিত হয়েছে ইতিহাস। সময় ও সময়ের নানা চরিত্র ও ঘটনা। সেদিক থেকে বিবেচনা করলে মহাস্থান নাটককে কতটা প্রত্ন নাটক বলা যায় সেটা বিবেচ্য বিষয়। নাটক দেখার পর মনে হয় এটি কি প্রত্ন নাটক নাকি ঐতিহাসিক নাটক! যাহোক, এবার নাটকের নামকরণের বিষয়টি আলোচনা করা যেতে পারে। নাটকের নাম মহাস্থান। এক সময়ের পুন্ড্র কালক্রমে গুপ্ত সাম্রাজ্যে পরিবর্তিত হয় পুন্ড্রবর্ধন নামে। রাজার পর রাজা আসতে থাকে আর বদলে যেতে থাকে এই অঞ্চলের মানুষের ধর্ম-আচার-রীতি। সেই সাথে বদলে যেতে থাকে মানুষের ভাগ্য। মৌর্য্যদের আমলে যখন বৌদ্ধদের পুড়িয়ে মারা হলো, তখন প্রাণ ভয়ে পুন্ড্র নগর থেকে পালিয়ে চলে গেল চর্যাপদের রচয়িতারা। সাথে করে নিশ্চয় নিয়ে গেল তাদের রচনা চর্যাপদ। এজন্যই হয়তো নেপাল থেকে পরবর্তী সময়ে আবিষ্কৃত হয় চর্যাপদ। মহাস্থানের শৌর্য ও ঐতিহ্যের কথা যুগে যুগে উঠে এসেছে নানাভাবে। কখনো তা আমরা জানতে পেরেছি চীনা পরিব্রাজক হিউয়েন সাঙের মাধ্যমে আবার কখনো ইবনে বতুতার বয়ানে। এখানে যে আলেকজান্ডারের মতো যোদ্ধাও যুদ্ধে লিপ্ত হতে ভয় পেয়েছেন তারও উল্লেখ আছে আবার আর্য অনার্যদের যুদ্ধে যে আর্যরা কখনো মহাস্থান অর্থাত্ পুন্ড্র নগর দখল করতে পারেনি সে বিষয়টাও স্পষ্ট। পুন্ড্রের ইতিহাসে খ্রিষ্টান ধর্মের কোনো রাজত্ব ছাড়া অন্য প্রায় অনেক ধর্মেরই প্রতিষ্ঠা পেয়েছে এখানে। জৈনরা তাদের শাসন ও ধর্ম প্রতিষ্ঠা ও প্রচার করেছে; হিন্দুরা এসেছে; বৌদ্ধরা এসেছে; আর সর্বশেষ এখানে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে ইসলামের শাসন ও ধর্ম। ইসলামের রাজত্ব কায়েমের ফলেই পুন্ড্র মহাস্থান নাম পেয়েছে। বৌদ্ধদের অন্যতম তীর্থস্থান; শীলাদেবীর আত্মাহুতির ফলে সেই ঘাটে প্রতি বছর হিন্দু নারীদের স্নান করা; মাহী সাওয়ার বলখী (র.)-এর মাজার শরীফের কারণে মুসলমানদের তীর্থস্থান। এইসব কারণে পুন্ড্র কালপরিক্রমায় হয়ে ওঠে মহাস্থান। ক্রমবর্ধমান ইতিহাস, ঘটনার বর্ণনা ও দৃশ্যান্তরের কারণে খ্রিষ্টপূর্ব আড়াই হাজার বছর আগের সময় থেকে সর্বশেষ মাহী সাওয়ার বলখী (র.)-এর দ্বারা দ্বিতীয় পরশুরাম নরসিংহের পরাজয়ের ফলে শীলাদেবীর করতোয়ার জলে আত্মাহুতি পর্যন্ত মহাস্থানের ব্যাপ্তিকাল। কিন্তু নাটকের পরেও যে কোরিওগ্রাফি আর তার পরে সুফিবাদ থেকে শুরু করে সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডলের বয়ান। আবার সেখান থেকে নানা পথ পাড়ি দিয়ে এসে পলাশীর প্রান্তরে সিরাজদৌলার পরাজয় ও ব্রিটিশ তাড়িয়ে, পাকিস্তান তাড়িয়ে বাংলাদেশের অভ্যুদয়কে কোনোভাবেই মহাস্থান নাটকের অংশ মনে হয়নি। মনে হয়েছে অপ্রাসঙ্গিক কিছু উপস্থাপনা ঘটে যাচ্ছে চোখের সামনে যা শুধুই দৃষ্টির নান্দনিকতা বৃদ্ধি করা ছাড়া এই নাটকের সাথে কোনোভাবেই খাপ খায় না। যাহোক, বাংলাদেশের ইতিহাসে যেহেতু এত বেশি শিল্পীর সমাহার আর কোনো নাটকেই ঘটেনি, সেহেতু এটি প্রত্ন নাটক হোক বা না হোক তাতে কী আসে যায়। তাদের নান্দনিক উপস্থাপনা নিঃসন্দেহে প্রশংসার দাবি রাখে। সেই সাথে নাটকের সহ নির্দেশক আলি আহমেদ মুকুল এবং সম্রাট প্রামাণিককেও শুভেচ্ছা দর্শককে ভালো একটি প্রযোজনা উপহার দেওয়ার জন্য। আর অবশ্যই পোশাক ও আলোর জন্য আইরিন পারভীন লোপা ও ঠান্ডু রায়হানকে অভিনন্দন। এই নাটকের চমত্কার আবহ সংগীত করেছেন অধ্যাপক কমল খালিদ।