কুরবানির গুরুত্ব, তাত্পর্য ও মাহাত্ম্য

আপডেট : ০৩ অক্টোবর ২০১৩, ১৯:১৫
ঈদুল আজহার দিন সকালে ঈদের নামাজ শেষ করে আমরা পশু কুরবানি করি। এটা শরীয়তের বিধান। প্রত্যেক সক্ষম মুসলমানের ওপর কুরবানি করা সুন্নতে মুয়াক্কাদা। মহান আল্লাহ তায়ালা হয়রত ইসমাইল (আ.) কে স্বপ্ন যোগে তার প্রিয় বস্তু কুরবানি করার নির্দেশ প্রদান করেন। এতে তিনি পরপর তিন দিন তিনটি পশু কুরবানি করেন। তারপরও স্বপ্ন দেখেন প্রিয় বস্তু কুরবানি করার। এরপর আর বুঝতে বাকি রইল না যে আল্লাহ তার প্রাণ প্রিয় সন্তান হযরত ইব্রাহীম (আ.) কে কুরবানি করতে আদেশ করছেন। তিনি ও তার প্রিয় পুত্র উভয়ই সৃস্টিকর্তাকে খুশি করতে কুরবানির জন্য পস্তুত। উভয়ের দুচোখ েঁবধে কুরবানির কাজ শেষ করা হলো। তারপর চোখ খুলে দেখা গেল কুরবানি হয়েছে একটি দুম্বা। মহান আল্লাহর এ নির্দেশ থেকে আমরা শিক্ষা পেলাম আমাদের প্রিয় বস্তু কুরবানি করতে হবে। অর্থাত্ আমি যাকে আদর-যত্ন করে, লালন-পালন করে ভরন-পোষণ করেছি এমন বস্তু বা পশু। বাজার থেকে কিনে এনে সাথে সাথে কুরবানি না করে ২/৩ দিন আগে এনে একটু আদর যত্ন করে মায়া সৃস্টি করে প্রিয় বস্তুতে রূপান্তর করার পর আমরা যেন কুরবানি করি। আল্লাহ তায়ালা তার প্রিয় বান্দাদের জন্য এমন কিছু নির্দিষ্ট সময় ও আমল নির্ধারণ করেছেন, যার প্রচুর পরিমানে নেকি বা সওয়াব রয়েছে, অল্প আমলের বিনিময়। সাধারণত দীর্ঘ জীবন আমল করেও এত নেকি অর্জন করা সম্ভব নয়। এমনই এক বরকতময় ও মহত্বপূর্ণ সময় জিলহজ্ব্ব মাস। প্রত্যেক মুসলমানের কর্তব্য ইবাদাতের মৌসুমগুলোতে বেশি বেশি তাওবা করা। গুনা ও অবাধ্যতা থেকে বিরত থাকা। কারণ, গুনা মানুষকে আল্লাহর অনুগ্রহ থেকে বঞ্চিত রাখে। গুনা ব্যক্তির অন্তর ও আল্লাহর মাঝে বাঁধার সৃষ্টি করে। আরো উচিত কল্যাণকর ও শুভদিনগুলোতে এমন সব আমল ও কাজে নিয়োজিত থাকা, যা আল্লাহর সন্তুষ্টির কারণ। যে আল্লাহর সাথে সত্যতার প্রমাণ দেবে আল্লাহও তার সাথে তাঁর ওয়াদা বাস্তবায়ন করবেন। আল্লাহ তায়ালা আল কুরআনের সূরা আনকাবুতের ৬৯ আয়াতে বলেন “আর যারা আমার পথে সর্বাত্মক প্রচেষ্টা চালায়, তাদেরকে আমি অবশ্যই আমার পথে পরিচালিত করব।” ঈদুল আজহার দিন ঈদের সালাতের পর কুরবানি করা প্রসঙ্গে রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন- যে ব্যক্তি ঈদের আগে পশু যবেহ করল, তার উচিত ঈদের নামাজের পর আরেকটি কুরবানি করা। আর যে এখনো কুরবানিকরেনি, তার উচিত এখন কুরবানি করা (বুখারী ও মুসলিম)। কুরবানি করার সময় চার দিন। অর্থাত্ ঈদের দিন এবং তার পরবর্তী তাশরীকের তিন দিন। যেহেতু রাসূলূল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন :তাশরীকের দিন কুরবানির দিন (সহীহ হাদীস সমগ্র : ২৪৬৭)। কুরবানি অনুমোদনের প্রসঙ্গে আল্লাহ তায়ালা বলেন— “অতএব তোমরা আল্লাহর উদ্দেশ্যেই সালাত পড় এবং কুরবানি কর”(কাউসার : ২)। তিনি আরো বলেন— “আর কুরবানির উটকে আমি তোমাদের জন্য আল্লাহর অন্যতম নিদর্শন বানিয়েছি” (হজ :৩৬)। কুরবানীর সামর্থ থাকা সত্বে তা ত্যাগ করা মাকরুহ। আনাস রাদিআল্লাহু আনহুরসহ বুখারী ও মুসলিম শরীফের বর্ণনা মতে— মহানবী হযরত মুহাম্মদ (স.) তরতাজা ও শিং ওয়ালা দুটি মেষ নিজ হাতে যবেহ করেছেন এবং তিনি তাতে বিসমিল্লাহ ও তাকবীর বলেছেন। কুরবানির পশু হিসেবে উঠ, গরু ও বকরি বা দুম্বা ছাড়া কুরবানি শুদ্ধ হবে না। আল্লাহ তায়ালা বলেন : যাতে তারা আল্লাহর নাম স্মরণ করতে পারে, যে সমস্ত পশু তিনি রিয্ক হিসেবে দিয়েছেন তার ওপর (হজ্ব : ৩৪)। কুরবানি শুদ্ধ হওয়ার জন্য ত্রুটি মুক্ত পশু হওয়া জরুরী, এ প্রসঙ্গে মহানবী হযরত মুহাম্মদ (স.) বলেন : কুরবানির পশুতে চারটি দোষ সহনীয় নয় : স্পষ্ট কানা, স্পষ্ট অসুস্থ্য, হাড্ডিসার ও ল্যাংড়া পশু (তিরমিযী : কিতাবুল হজ : ৩৪)। কুরবানির পশু যবেহর সময় প্রসঙ্গে মহানবী হযরত মুহাম্মদ (স.) বলেছেন : যে ঈদের সালাতের পূর্বে যবেহ করল, সে নিজের জন্য যবেহ করল। আর যে খুতবা ও ঈদের সালাতের পর কুরবানি করল, সে তার কুরবানি ও সুন্নত পূর্ণ করল (বুখারী ও মুসলিম)। যে সুন্দর করে যবেহ করার ক্ষমতা রাখে তার উচিত নিজ হাতে কুরবানি করা। কুরবানি করার সময় যার নামে কুরবানী করা হচ্ছে তার নাম বলবে এবং বিসমিল্লাহি আল্লাহু আকবার বলে ছুরি চালাবে। যেমন রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন : বিসমিল্লাহি আল্লাহু আকবার; হে আল্লাহ, এটা আমার পক্ষ থেকে এবং আমার উম্মতের মধ্যে যারা কুরবানি করেনি, তাদের পক্ষ থেকে (আবূদাউদ ও তিরমিযী)। কুরবানির গোস্ত কুরবানিকারী ব্যক্তির জন্য সুন্নত হলো নিজে খাওয়া আত্মীয় ও প্রতিবেশীদের মাঝে বিতরন এবং গরীবদের দান করা। আল্লাহ তায়ালা বলেন : অতঃপর তোমরা তা থেকে খাও এবং দুস্থ-দরিদ্রকে খেতে দাও (হজ্ব : ২৮)। লেখক : সাংবাদিক