প্রধানমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগ সভানেত্রী শেখ হাসিনা বিএনপি-জামায়াত ও হেফাজতের পরিকল্পিত মিথ্যাচার ও অপপ্রচারে বিভ্রান্ত না হওয়ার জন্য দেশবাসীর প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন। তিনি বলেন, ’৯৬ সালের নির্বাচনের আগেও বিএনপি এই বলে অপপ্রচার চালিয়েছিল যে, আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসলে মসজিদে আযানের পরিবর্তে উলুধ্বনি শোনা যাবে। কিন্তু আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার পর মসজিদে উলুধ্বনি নয়, আযানই হয়েছে। গতকাল বৃহস্পতিবার বিকালে গণভবনে আট জেলার তৃণমূল নেতাদের সঙ্গে মতবিনিময় বৈঠকে প্রারম্ভিক বক্তব্যে প্রধানমন্ত্রী গত ৫ মে রাজধানীর মতিঝিলে বিএনপি-জামায়াত-শিবির ও হেফাজতের তাণ্ডবের কথা উল্লেখ করে বলেন, আমি আলোচনার আহ্বান জানালাম আর বিরোধী দলীয় নেত্রী ৪৮ ঘণ্টার আল্টিমেটাম দিয়ে হুমকি দিলেন আমি নাকি পালানোরও পথ পাবো না। এরপর মতিঝিলে ধ্বংসযজ্ঞ, বায়তুল মোকাররম মসজিদে আগুন দিয়ে শত শত কোরআন শরিফ পুড়িয়ে দেয়া হলো। তিনি প্রশ্ন রেখে বলেন, যারা ইসলামের হেফাজতের নামে মসজিদে আগুন দেয়, শত শত কোরআন শরিফ পুড়িয়ে দেয়-তারা কীভাবে মুসলমান হয়? তবে যতই ষড়যন্ত্র-চক্রান্ত হোক না কেন, আমার দৃঢ় বিশ্বাস যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের কাজ সম্পন্ন করে আমরা দেশকে কলঙ্কমুক্ত করতে পারবো ইনশাল্লাহ্। প্রধানমন্ত্রী বলেন, বিরোধী দলীয় নেত্রীর সব আন্দোলনই যুদ্ধাপরাধীদের রক্ষার জন্য।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, ইদানীং গ্রামে-গঞ্জে গিয়ে হাতে ছোট কোরআন শরিফ নিয়ে সহজ-সরল মানুষকে বিভ্রান্ত করে বলা হচ্ছে, আমরা নাকি সব মুসলমানকে মেরে ফেলেছি! শুধু কোরআন শরিফ নিয়েও মিথ্যাচার করছেন না, মসজিদে বসেও মিথ্যা অপপ্রচার করছেন। গত ৫ মের ঘটনার পর বলা হলো, আড়াই হাজারেরও বেশি মানুষকে নাকি হত্যা করা হয়েছে। আমরা তালিকা চাওয়ার পর একধাপে তা নামিয়ে বলা হলো, ৬১ জনকে নাকি হত্যা করা হয়েছে। যে তালিকা দেয়া হলো তাও মিথ্যা তথ্যে ভরা। আবার এমনও বলা হলো, ওই রাতে নাকি দেড় লাখেরও বেশি গুলিবর্ষণ করা হয়েছে! এতো গুলিবর্ষণ করা হলে তো মতিঝিলের একটি বাড়িঘর, অফিসের দরজা-জানালা ও কাঁচ অক্ষত থাকার কথা নয়। ওইদিন বিপুল সংখ্যক মিডিয়া উপস্থিত থেকে সরাসরি সব প্রচার করেছে। এমন কোন ঘটনাই কেউ বলতে পারেনি। ইসলামের প্রচার ও প্রসারে আওয়ামী লীগ সরকার যা করেছে, অতীতে কোনো সরকার তা করতে পারেনি উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, বঙ্গবন্ধু স্বাধীনতার পর মদ-জুয়া নিষিদ্ধ করলেও জেনারেল জিয়া ক্ষমতা দখল করে মদ-জুয়ার লাইসেন্স দিয়েছিল। কিন্তু জাতির দুর্ভাগ্য, যাঁরা (শেখ হাসিনা) ফজরের নামাজ আদায় ও কোরআন শরিফ তেলাওয়াত করে দিনের কাজ শুরু করেন, তাদের কাছে ইসলাম হেফাজত থাকে না।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, যুদ্ধাপরাধীদের রক্ষার নামে এখন তারা যানবাহনে আগুন দিচ্ছে, ঘুমন্ত ড্রাইভারের গায়ে পেট্রোল ঢেলে দিয়ে হত্যা করছে। একজন মুসলমান হয়ে আরেকজন মুসলমানকে কেউ আগুন দিয়ে পুড়িয়ে হত্যা করতে পারে?-এমন প্রশ্ন রেখে তিনি বলেন, আসলে পরাজিত শক্তির দোসর হিসাবে বিরোধী দলীয় নেত্রী কাজ করছেন। এর আগে বঙ্গবন্ধুর খুনিদের রক্ষা করতেও তিনি হরতালসহ সহিংস কর্মকাণ্ড চালিয়েছিলেন। কিন্তু বঙ্গবন্ধুর খুনিদের তিনি রক্ষা করতে পারেননি। ইনশাল্লাহ্ যুদ্ধাপরাধীদেরও তিনি রক্ষা করতে পারবেন না।
প্রধানমন্ত্রী যেকোনো মূল্যে গণতান্ত্রিক ধারা অব্যাহত রাখতে তাঁর দৃঢ় অঙ্গীকারের কথা পুনর্ব্যক্ত করে বলেন, আমরা অনেক চড়াই-উত্রাই পার হয়ে দেশে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করেছি। দেশে গণতান্ত্রিক ধারা অব্যাহত থাকবে এটাই আমাদের লক্ষ্য। কেননা গণতন্ত্র ছাড়া কোনো দেশের উন্নয়ন হয় না। তিনি বলেন, বাংলাদেশের জনগণের প্রতি বর্তমান বিরোধী দলের ন্যূনতম কোনো দায়িত্ববোধ নেই।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, আমাদের বিরোধী দলীয় নেত্রী বলেছেন, তিনি নাকি আমাকে দেখতে চান না! আমাকে যে তিনি দেখতে পারেন না, তা ইতিপূর্বে নানা কর্মকাণ্ডেই তিনি প্রমাণ করেছেন। ক্ষমতায় থাকতে নিজের কেবিনেট মন্ত্রী ও ছেলেকে দিয়ে ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলা করে আমাকে হত্যার চেষ্টা করেছিলেন। আল্লাহর রহমতে আমি প্রাণে বেঁচে গেলেও আইভি রহমানসহ ২৪ প্রাণ ঝরে গেছে।
প্রধানমন্ত্রী বিগত বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারের পাঁচ বছরের দুঃশাসনের চিত্র তুলে ধরে বলেন, ওই পাঁচটি বছর ছিল বিভীষিকাময় সময়। একাত্তরের পাক হানাদার বাহিনীর মতোই তারা দেশবাসীর ওপর নির্মম নির্যাতন চালায়। দেশকে সম্পূর্ণ ধ্বংসের দিকে নিয়ে যায়। ওই সময় সন্ত্রাস, দুর্নীতি, জঙ্গিবাদ এমন পর্যায়ে গিয়েছিল যে, সবদিক থেকে বাংলাদেশ পিছিয়ে যায়। সারা বিশ্বে বাংলাদেশকে পাঁচবার দুর্নীতিতে বিশ্বচ্যাম্পিয়ন করে। দেশকে সন্ত্রাসী ও জঙ্গিবাদের অভয়ারণ্যে পরিণত করে। দেশের উন্নয়নের পরিবর্তে নিজেদের আখের গুছাতে ব্যস্ত ছিল বলেই বিদ্যুত্ উত্পাদন কমিয়েছে, খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণ দেশকে খাদ্য ঘাটতির দেশে পরিণত করেছিল। আদালতের রায়ে নিজে অভিযুক্ত হবেন বলেই খালেদা জিয়া আদালতে হাজির হতে ভয় পান উল্লেখ করে শেখ হাসিনা বলেন, বিএনপি ক্ষমতায় আসলেই মানুষের জীবন নিয়ে ছিনিমিনি খেলে। দেশের সম্পদ লুণ্ঠন করে নিজেদের অর্থ-সম্পদের পাহাড় গড়া আর বিদেশে অর্থ পাচারের ঘটনা আজ আন্তর্জাতিকভাবে প্রমাণিত হয়েছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের আদালতে বিরোধী দলের নেতার পুত্রের অর্থ পাচারের ঘটনা প্রমাণিত হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী থেকে নিজেও (খালেদা জিয়া) এতিমের টাকা আত্মসাত্ করেছেন।
প্রধানমন্ত্রী বিডিআর বিদ্রোহের সঙ্গে খালেদা জিয়ার সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ এনে বলেন, যার (খালেদা জিয়া) ১২টা বা একটার আগে ঘুম ভাঙ্গে না, তিনি বিডিআর বিদ্রোহের এক-দেড় ঘণ্টা আগে সকাল সাড়ে ৭টায় কালো কাঁচের গাড়িতে করে ক্যান্টনমেন্টের বাসভবন থেকে আত্মগোপনে গিয়েছিলেন কেন? এ ঘটনার সঙ্গে তার সম্পর্ক কী ছিল? আসলে মানুষের জীবন নিয়ে ছিনিমিনি খেলাই তার চরিত্র।
বর্তমান মহাজোট সরকারের উন্নয়ন ও সাফল্যে এবং বিএনপি-জামায়াত জোটের দুঃশাসনের চিত্র ভোটারদের ঘরে ঘরে গিয়ে তুলে ধরার জন্য তৃণমূল নেতাদের প্রতি নির্দেশ দিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, সবদিক থেকে বাংলাদেশ আজ এগিয়ে যাচ্ছে। দেশের এমন কোনো জায়গা নেই, যেখানে আমরা উন্নয়ন করিনি। আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসলেই দেশের মানুষ কিছু পায়, আন্তর্জাতিকভাবে পুরস্কার নিয়ে আসে। যতই চক্রান্ত-ষড়যন্ত্র করা হোক না কেন, যুদ্ধাপরাধীদের বিচার কাজ সম্পন্ন করে জাতিকে আমরা কলঙ্কমুক্ত করতে পারবো ইনশাল্লাহ্।
ধারাবাহিক কর্মসূচির অংশ হিসাবে বৃহস্পতিবার প্রধানমন্ত্রী রাজশাহী মহানগর, রাজশাহী জেলা, নাটোর, নরসিংদী, নেত্রকোনা, শরিয়তপুর, ঝিনাইদহ ও সাতক্ষীরা এই আটটি জেলার তৃণমূল নেতাদের সঙ্গে বৈঠক করেন। প্রধানমন্ত্রীর সূচনা বক্তব্য শেষে তার সভাপতিত্বে রূদ্ধদ্বার বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। প্রধানমন্ত্রী জানান, তৃণমূল নেতাদের এই মতামত এবং নিজের করা কয়েক দফা জরিপ পর্যালোচনা করেই আগামী নির্বাচনে দলীয় প্রার্থিতা চূড়ান্ত করা হবে।
মতবিনিময় সভায় কেন্দ্রীয় নেতাদের মধ্যে দলের প্রেসিডিয়াম সদস্য সতীশ চন্দ্র রায়, কাজী জাফর উল্যাহ, আবুল হাসনাত আবদুল্লাহ, অধ্যাপক ড. আলাউদ্দিন আহমেদ, আহমদ হোসেন, আবু সাঈদ আল মাহমুদ স্বপন, ফরিদুন্নাহার লাইলী এমপি, এইচ এম খায়রুজ্জামান চৌধুরী লিটন, সুজিত রায় নন্দী, ড. আবদুস সোবহান গোলাপ, এস এম কামাল হোসেন, একেএম এনামুল হক শামিম প্রমুখ উপস্থিত ছিলেন।
