প্রাইভেট হাসপাতাল ও ক্লিনিকগুলো এখন একটি সংঘবদ্ধ চাঁদাবাজদের টার্গেটে পরিণত হয়েছে। ভুল চিকিত্সার অজুহাতে ভাংচুরসহ তুলকালাম কাণ্ড ঘটিয়ে হৈ চৈ ফেলে দেয় এসব চাঁদাবাজ। এরপর পরিস্থিতি নিরসনে ঐ চক্র হাসপাতাল কিংবা ক্লিনিক মালিকের কাছ থেকে মোটা অংকের চাঁদা আদায় করে থাকে। অথচ যে রোগীর জন্য হাসপাতাল ও ক্লিনিক ভাংচুর হলো তার পরিবার কিংবা রোগী এসবের কিছুই জানে না। রাজধানীর বেশ কয়েকটি প্রাইভেট হাসপাতাল, ক্লিনিক ও মালিকপক্ষের সঙ্গে আলাপকালে ভুল চিকিত্সার নামে এ চক্রের কোটি কোটি টাকার চাঁদা আদায়ের বিস্তারিত তথ্য জানা যায়।
হাসপাতালের মালিকপক্ষের লোকজন জানান, কোন হাসপাতালে রোগী মারা গেলে এ চক্রটির নিয়োজিত সদস্যরা সেখান থেকে মোবাইল ফোনে মৃত্যুর সংবাদ জানিয়ে দেয় চক্রের অন্যদের কাছে। এর পর মুহূর্তে জড়ো হয়ে যায় অর্ধশত সদস্য। ভুল চিকিত্সার অজুহাতে এরা তখন ভাংচুর ও মারধরসহ নানা ধরনের শারীরিক নির্যাতন শুরু করে দেয়। তারা জানান, এ পর্যন্ত অর্ধ শতাধিক প্রাইভেট হাসপাতালে হামলা হয়েছে এবং ক্ষতির পরিমাণ কয়েকশ’ কোটি টাকা।
কয়েকজন হাসপাতাল মালিক ক্ষোভের সঙ্গে বলেন, হাসপাতালের সম্পদ, রোগী, চিকিত্সক, নার্স ও কর্মকর্তাদের নিরাপত্তার স্বার্থে হাসপাতাল বন্ধ করে দেয়া ছাড়া কোন বিকল্প নেই। সমপ্রতি কিডনি পাচার, বেচাকেনার ধুঁয়া তুলে ঐ চক্রটি প্রাইভেট হাসপাতাল ভাংচুর, চিকিত্সক, নার্সদের মারধর করার ঘটনা ঘটিয়ে আসছে। এ ঝামেলা এড়াতে গিয়ে প্রাইভেট হাসপাতালে কিডনি ও লিভার ট্রান্সপ্ল্যান্ট বন্ধ রাখা হয়। ২ বছরের অধিক সময় প্রাইভেট হাসপাতালে কিডনি ও লিভার ট্রান্সপ্ল্যান্ট বন্ধ থাকায় শত শত রোগী চরম দুর্দশার শিকার হচ্ছেন। অপরদিকে সময়মত সুচিকিত্সা না পেয়ে অনেক রোগী অকালে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ছেন।
বিশেষজ্ঞ চিকিত্সকরা এর সত্যতা স্বীকার করে বলেন, প্রতিদিন বিদেশে কিডনি ও ডোনার বাগিয়ে নিয়ে কিডনি-লিভার বেচাকেনা চলছে। শত শত রোগী বিদেশে গিয়ে কিডনি ও লিভার ট্রান্সপ্ল্যান্ট করে প্রতি মাসে কয়েক কোটির সমপরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা দেশের বাইরে চলে যাচ্ছে। এ দেশে প্রাইভেট হাসপাতালে বিদেশের যে কোন হাসপাতাল কিংবা পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতের চেয়ে তিন ভাগের এক ভাগ টাকায় কিডনি ও লিভার ট্রান্সপ্ল্যান্ট করে আসছে। রোগীরা অল্প খরচে হাতের কাছে দ্রুত অত্যাধুনিক চিকিত্সা সেবা পেয়ে আসছিলেন। হাসপাতাল মালিক ও বিশেষজ্ঞ চিকিত্সকরা জানান, ভাংচুরের মাধ্যমে চাঁদাবাজির কারণে রোগীরা সেই সুযোগ থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। এর পিছনে বিদেশে রোগী বাগিয়ে নেয়ার এজেন্টদের ষড়যন্ত্র রয়েছে।
স্বাস্থ্য অধিদফতরের মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. খন্দকার মো. সিফায়েত উল্লাহ বলেন, চিকিত্সা করতে গেলে ভুল হতেই পারে। একশ’ রোগীর চিকিত্সা করতে গেলে ২/১টি ভুল হতে পারে। বিদেশেও এধরনের ভুল হয়। এটা আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত। ভুল চিকিত্সা হলে তা অনুসন্ধান কিংবা তদন্ত করে তা নিশ্চিত হয়ে ব্যবস্থা নেয়ার বিধান রয়েছে। আগে জানতে হবে কীভাবে ভুল হলো, কে করেছে এবং কে দায়ী। এ সব বিষয় নিশ্চিত হতে হবে। চিকিত্সক দায়ী হলে তার বিরুদ্ধে বাংলাদেশ মেডিক্যাল অ্যান্ড ডেন্টাল কাউন্সিলে (বিএমডিসি) কিংবা আদালতে মামলা করার সুযোগ রয়েছে। কথায় কথায় ভুল চিকিত্সার নামে প্রাইভেট হাসপাতালে ভাংচুর করে তাণ্ডবলীলা চালানো কোন ষড়যন্ত্র কিংবা স্বার্থ উদ্ধারের অংশ বলে মহাপরিচালক মনে করেন।
তিনি বলেন, প্রাইভেট হাসপাতাল ও ক্লিনিক না হলে সরকারের পক্ষে বাংলাদেশের মতো বিপুল জনগোষ্ঠীর দেশে চিকিত্সা সেবা দেয়া সম্ভব হতো না। প্রাইভেট সেক্টর দেশের সম্পদ। প্রাইভেট সেক্টর চিকিত্সা শিক্ষায় অবদান অনেক। এ সেক্টরের নিরাপত্তা ও প্রয়োজনীয় সহযোগিতা প্রদানে উদ্যোগ নেয়া হবে।
জনপ্রিয় অনুষ্ঠান ইত্যাদির উপস্থাপক হানিফ সংকেতের বড় ভাই সিঙ্গাপুরে গিয়ে ভুল চিকিত্সার শিকার হন। এ ভুল চিকিত্সা ধরা পড়ে এ দেশে। হানিফ সংকেত বলেন, সিঙ্গাপুরে তার ভাই ব্যবসায়ী হাবিবুর রহমান ভুল চিকিত্সার শিকার হয়েছেন। তখন তার জীবন বিপন্ন হওয়ার পথে। সিঙ্গাপুরে ভাইয়ের ভুল চিকিত্সার বিষয়টি প্রথমে ধরা পড়ে ল্যাবএইড ও ইউনাইটেড হাসপাতালে। বিষয়টি আরো নিশ্চিত হওয়ার জন্য তার ভাইকে পরে ভারতে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে পরীক্ষায় ভুল চিকিত্সার বিষয়টি প্রমাণিত হয়। এখন তার ভাই সুস্থ বলে তিনি জানান। শুধু হানিফ সংকেত নয় বিদেশে ভুল চিকিত্সার নজির অনেক।
ল্যাবএইড হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ এ প্রতিবেদককে জানায়, বিশ্ববিদ্যালয়ের এক ছাত্রের ভুল চিকিত্সায় সেই ছাত্র এখন ক্যান্সারে আক্রান্ত এ অভিযোগে গত বুধবার ল্যাবএইড হাসপাতালে একদল তরুণ মাইকযোগে এসে অবস্থান নেয়। এ ভুল চিকিত্সার জন্য ল্যাবএইড কর্তৃপক্ষকে এক কোটি টাকা দিতে হবে বলে চাপ দেয় ঐসকল তরুণ। তারা মাইক দিয়ে হাসপাতাল চত্বরে হৈ চৈ করছিল। এসময় ল্যাবএইড হার্ট ও জেনারেল হাসপাতালে কয়েকশ রোগী চিকিত্সাধীন ছিলেন। আইসিইউ ও সিসিইউতে মরণাপন্ন রোগী চিকিত্সাধীন। বহির্বিভাগে কয়েকশ রোগী উপস্থিত ছিল। পেসমেকার লাগানো এক রোগী অসুস্থ হয়ে পড়েন।
ভুল চিকিত্সায় ঐ ছাত্রের ক্যান্সার হওয়া প্রসঙ্গে মহাখালী ক্যান্সার ইনস্টিটিউটের পরিচালক অধ্যাপক গোলাম মোস্তফা বলেন, ক্যান্সার দুই ধরনের হয়ে থাকে। জেনেটিক অর্থাত্ বংশগত এবং দ্বিতীয়টি পরিবেশগত কারণে। খাদ্যাভ্যাস, ধূমপান, বায়ুদূষণ রেডিয়েশন, বেশি রৌদ্রে কাজ করলে, ভাইরাস দ্বারাসহ বিভিন্ন কারণে ক্যান্সার হতে পারে। ভুল চিকিত্সায় সাধারণত ক্যান্সার হয় না।
বাংলাদেশ হসপিটাল অ্যান্ড ক্লিনিক ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি অধ্যাপক ডা. মনিরুজ্জামান ভুঁইয়া বলেন, প্রাইভেট হাসপাতালে চাঁদাবাজির নামে হামলা কোন অবস্থায় মেনে নেয়া হবে না। ভুল চিকিত্সা হয়ে থাকলে প্রচলিত নিয়মে সংশ্লিষ্ট চিকিত্সকের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়ার বিধান রয়েছে। হাসপাতালের আসবাবপত্র ও যন্ত্রপাতিসহ মূল্যবান সম্পদ ধ্বংস করার বিরুদ্ধে তারা কঠোর আন্দোলনে যাবেন। এ বিষয়ে বিএমএর সঙ্গে আলাপ করে পরবর্তী কার্যক্রম নেবে বলে তিনি জানান।
