স্কুলে পড়ার সময় ‘পরীক্ষার পূর্বরাত্রি’ নামে একটি রচনা পড়েছিলাম। ঐ রচনার ভূমিকা ছিল এরকম—শুনিয়াছি ফ্রান্সের রানি মেরির আত্ননিয়ন্ত্রণের চিন্তায় একরাত্রে সমস্ত চুল পাকিয়া গিয়াছিল—আমারও কি তাই হইতেছে? নইলে চোখের সামনে এমন সুবিস্তৃত সরিষাখেত দেখিতেছি কেন?
দেশের বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে আমরা সবাই যেন ফ্রান্সের রানি মেরি হতে চলেছি—চুল পাকিবার বাকি নাই, চোখের সামনে সুবিস্তৃত সরিষাখেত অহরাত্র দেখিতেছি।
এমনটি হবার তো কথা ছিল না—যাঁদের হাতে দেশ চালনার ভার তাঁরা তো কল্যাণময়ী নারী। তাঁরা মায়ের জাত। তাঁদের কাছে প্রত্যাশা অনেক। তাঁরা দেশ চালাবেন শাসন এবং সোহাগের সঙ্গে। কেন তবে উলটো পথে চলা? যে রাষ্ট্রের স্বপ্ন বেগম রোকেয়া দেখেছিলেন ‘সুলতানার স্বপ্ন’-এ, সে স্বপ্নের বাস্তবায়নের ক্ষমতা তো নারীর হাতে এসেছে। তারা কোন অপশক্তির অকল্যাণ চিন্তায় সে ক্ষমতার অপব্যবহার করছেন? সুলতানাদের স্বপ্নে রানির দরদে রাজ্যের গ্লানি মুছে যাবে এটাই দেশবাসীর প্রত্যাশা। সময় তো শেষ হবার নয়— সময় আছে আপনারা দেশবাসীকে স্বপ্ন দেখান অভীষ্ট লক্ষ্যে যাবার স্বপ্ন। সহযোগিতা সহমর্মিতা ছাড়া কি অভীষ্টে যাওয়া সম্ভব? একে অন্যের দোষ বা দুর্বলতা খুঁজে বেড়ালেই কি সমস্যার সমাধান হয়?
কথায় কথায় আমরা একাত্তরের কথা বলি। একাত্তরে আমাদের একটা স্বপ্ন ছিল। স্বাধীন সার্বভৌম সমৃদ্ধ স্বদেশ। যে স্বদেশে থাকবে না হানাহানি, হিংসা দ্বেষ, ক্ষমতা নিয়ে ঘৃণ্য ষড়যন্ত্র। ঘৃণ্য চাতুর্য এবং কুটিল ষড়যন্ত্রের কারণে একবার প্রায় দু’শ বছর আবার নিষ্ফলা ২৪ বছর গোলামির ঘানি টানতে হয়েছে হতভাগ্য দেশবাসীকে। একাত্তরে বুকের তাজা রক্ত ঢেলে জীবনের সর্বোচ্চ ত্যাগ স্বীকার করে দেশকে স্বাধীন করেছে। কারো হেলাফেলায় অপরিণামদর্শিতায় ধুঁকে ধুঁকে প্রাণ নিয়ে বেঁচে থাকা স্বাধীনতা তা কি সহ্য করা যায়, না সহ্য করা উচিত?
কোন ক্ষেত্রে আমরা সফল কোন ক্ষেত্র সম্ভাবনাময় তা যেন হাতের কড় গুনেও বলা যাচ্ছে না। অস্থিরতা কেবলই অস্থিরতা সর্বত্র। অশান্তি অক্টোপাসের মতো আপদমস্তক আটকে ধরে বসে আছে। এর থেকে আমরা মুক্তি চাই—মনে প্রাণে মুক্তি চাই। ঘুরে ফিরে দুই প্রধান দলকেই জনগণ ক্ষমতায় আনে। অথচ দেখা যাচ্ছে দিনে দিনে তারা জনগণের ভাষা বুঝতে পারছে না। না বোঝার কারণে সব বিশৃঙ্খল—সব এলোমেলো। আগামীতে কী হয়, সে চিন্তায় সবাই দিশেহারা, হতাশাগ্রস্ত আশাভঙ্গের বেদনায় বুকবসা। পরাধীন দেশের নাগরিক কবি নজরুলের মতো বুকে মুখে একই উচ্চারণ—
স্বদেশ আমার! জানি না তোমার
শুধিব কবে মা ঋণ
দিনের পরে মা দিন চলে যায়
এল না যে শুভদিন\
খাই দাই আর আরামে ঘুমাই
পাগলের যেন ব্যথাবোধ নাই
ললাট লিখন বলিয়া এড়াই
ভীরুতা, শক্তি ক্ষীণ \
আমরা যেন ভুলে না যাই—আমরা স্বাধীন দেশের নাগরিক। আমাদের যাঁরা পরিচালনা করেন তাঁরা আমাদের দ্বারাই নির্বাচিত। তাঁদের কাছে আমাদের আবেদন—আমাদের খেলার পুতুল না ভেবে সচেতন নাগরিক ভাবুন—মহত্ কাজে লাগান। নিজেরাও স্মৃতির এবং ইতিহাসের সোনালি দিগন্তে থাকুন— আমাদেরও রাখুন।
ঢাকা
