বিশুদ্ধ পানি এবং ওয়াসা

আপডেট : ০৪ অক্টোবর ২০১৩, ২১:৫৯
পানির অপর নাম জীবন। তবে অবশ্যই সে পানি হতে হবে বিশুদ্ধ ও মানবদেহের জন্য নিরাপদ। কিন্তু আমাদের দেশের বর্তমান বাস্তবতায় তা অনেকটা অকল্পনীয়। পানি সরবরাহকারী সরকারি সংস্থা ওয়াসা রাজধানীবাসীকে যে পানি উপহার দিচ্ছেন তা বিশুদ্ধ তো নয়ই বরং ব্যবহারেরও অনুপযোগী। অথচ এ পানি ব্যবহার করে ঢাকাবাসী নানা ধরনের রোগভোগের শিকার হচ্ছে। কিন্তু এ সমস্যা নিরসনে কর্তৃপক্ষের কোনো দায় নেই বলেই মনে হচ্ছে। প্রতি বছর গরমের মৌসুম এলেই ঢাকাজুড়ে তীব্র পানিসংকট ভয়াবহ অবস্থা ধারণ করে। পর্যাপ্ত পানি তো পাওয়া যায়ই না, উপরন্তু ওয়াসার লাইনে যে পানি আসে তা দুর্গন্ধযুক্ত, ময়লা, লালচে ও কালো রঙের। কোনো কোনো এলাকার পানিতে জোঁক-কেঁচোর অস্তিত্বও পাওয়া যায়। রাজধানীতে বিশুদ্ধ পানি পাওয়া ক্রমেই দুষ্প্রাপ্য হয়ে পড়ছে। পানির মান প্রশ্নবিদ্ধ হলে তা জীবনের ওপর হুমকি সৃষ্টি করে। আমাদের কর্তাব্যক্তিরা পানি সমস্যা নিয়ে প্রথম থেকেই যথেষ্ট সচেতনতার পরিচয় দিতে পারেননি। রাজধানীর জনসংখ্যা হুহু করে বাড়লেও গত এক যুগেও পানির চাহিদা পূরণে কোনো সরকারই উদ্যোগী ভূমিকা নেয়নি বললেই চলে। ঢাকার চারপাশে থাকা বুড়িগঙ্গা, তুরাগ, বালু ও শীতলক্ষ্যা নদীর পানি অত্যধিক দূষণের কারণে পানের অনুপযোগী হয়ে পড়েছে। নারায়ণগঞ্জের ডায়িং ও রাসায়নিক কারখানা, হাজারীবাগের ট্যানারিশিল্প, টঙ্গী ও তেজগাঁও শিল্পাঞ্চল এবং সাভারের বস্ত্র কারখানাগুলো থেকে হাজার হাজার টন বর্জ্য গিয়ে পড়ছে এসব নদীতে। নদীগুলোকে প্রতিবেশগত সংকটাপন্ন এলাকা ঘোষণা করা হলেও দূষণ বন্ধে কার্যকর কোনো পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে না। রাজধানীর পানি সরবরাহ নিশ্চিত করতে হলে নদীগুলোকে দূষণমুক্ত করা এবং পরিশোধনের মাধ্যমে পানি সরবরাহের কোনো বিকল্প নেই। আরো বেশি গভীর নলকূপ স্থাপন কোনোভাবেই কাম্য নয়। কয়েক বছর ধরেই মেঘনা বা যমুনার পানি পাইপলাইনে ঢাকায় আনার চিন্তা-ভাবনা করা হলেও দীর্ঘ মেয়াদে তা কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারবে বলে মনে হয় না। বরং নদীগুলো দূষণমুক্ত করার উদ্যোগ নেওয়াটাই বেশি জরুরি। নদীতীরের শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলোকে বর্জ্যশোধন যন্ত্র বা ইটিপি ব্যবহারে বাধ্য করা গেলেই নদীগুলো দূষণমুক্ত রাখা সম্ভব। পত্রপত্রিকায় পানি সমস্যা বিশেষ করে দুর্গন্ধযুক্ত পানি সরবরাহের অভিযোগ উঠলেও নির্বিকার থাকেন তাঁরা। রাজধানীতে ওয়াসা এ মুহূর্তে যে পানি সরবরাহ করছেন তা পান করা দূরের কথা, অন্যান্য দৈনন্দিন কাজে ব্যবহারযোগ্য কিনা, সংশয় দেখা দিয়েছে। ওয়াসার গ্রাহকরা টাকা দিয়েই পানি কেনেন। এ ক্ষেত্রে সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান দয়া-দাক্ষিণ্যের ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়ে গ্রাহকদের যেমন ইচ্ছা তেমন পানি সরবরাহ করবে, এমনটি হওয়া উচিত নয়। ওয়াসার পানির রঙ এবং গন্ধ শুঁকে চোখ বন্ধ করেই বলা যায়, রাজধানীর দেড় কোটি মানুষ টাকা দিয়ে ব্যবহার-অযোগ্য পানি কিনছে। ওয়াসার বিরুদ্ধে অভিযোগের পাহাড় গড়ে উঠলেও তাঁদের নাকি করার কিছু নেই। খাবার পানিসহ নিত্যদিন রান্নাবান্না থেকে শুরু করে বিভিন্ন কারণে মানুষের প্রচুর পানির প্রয়োজন পড়ে। জলবায়ুর পরিবর্তন আর শিল্পবর্জ্যজনিত দূষণের কারণে রাজধানীর আশপাশের নদী-নালা-খাল-বিল এমনিতেই ব্যবহারের অনুপযোগী হয়ে পড়ছে। ফলে পানির উত্সগুলোই আজ বন্ধ হয়ে পড়ার উপক্রম। এ অবস্থায়, পানি সরবরাহে সংকট তো আছেই, তদুপরি সরবরাহকৃত পানির বিশুদ্ধতা বজায় না থাকায় নানা প্রকার রোগ-ব্যাধিতে আক্রান্ত হচ্ছে অনেকে। যত্রতত্র রাসায়নিকের মাত্রাতিরিক্ত ব্যবহারও আজ পানির সংকটের অন্যতম কারণ হয়ে উঠছে। ওয়াসা যে পানি সরবরাহ করেন তার এক বড় অংশের উত্স শীতলক্ষ্যার পানি। এ পানি শিল্পবর্জ্যে এতই দূষিত যে তা পরিশোধনের অযোগ্য। ফলে সেই পানিতে দুর্গন্ধ থাকে প্রকট, ফুটিয়ে পান করাও দুষ্কর। এমনকি পানি ফুটিয়ে পরিশোধন করলেও গন্ধ কাটে না। পানির আরেক নাম যেহেতু জীবন সেহেতু জনস্বাস্থ্যের স্বার্থেই ওয়াসা বিশুদ্ধ পানি সরবরাহ করবেন—এটি গ্রাহকদের অধিকারের পর্যায়ে পড়ে। এ দাবিকে উপেক্ষা করার কোনো উপায় নেই। এ সমস্যার সমাধানে ওয়াসা এবং সরকারকে এখনই উদ্যোগ নিতে হবে। ডাক্তার ও পানি বিশেষজ্ঞদের ধারণা—দূষিত পানি পান করায় পেটের পীড়া, আমাশয়, কলেরা, জণ্ডিস প্রভৃতি রোগের প্রকোপ বৃদ্ধি পেয়েছে। বিশেষজ্ঞ ডাক্তারদের অভিমত, এ রকম দূষিত পানি দীর্ঘদিন পান করতে থাকলে আরো জটিল রোগ, এমনকি মারণব্যাধি ক্যান্সারও হতে পারে। কিডনি রোগ, আলসার, রক্তচাপ, অ্যাজমা, যক্ষ্মা ইত্যাদি রোগের প্রকোপ বাড়তে পারে। ২০০ বছর আগের চাঁদনী ঘাটের পানি শোধনাগার থেকে এখনো বুড়িগঙ্গার পানি শোধন করে সরবরাহ করা হচ্ছে। বুড়িগঙ্গার পানির দূষণমাত্রা ভয়াবহ, তাই বিশুদ্ধ করতে অতিমাত্রায় কেমিক্যাল ব্যবহার করতে হয়। এতে স্বাদ-গন্ধে পরিবর্তন আসে। শুকনো মৌসুমে শীতলক্ষ্যার পানিদূষণও মাত্রাতিরিক্ত হয়ে পড়ে। তাই বুড়িগঙ্গা ও শীতলক্ষ্যার পানি শোধনের জন্য অতিরিক্ত রাসায়নিক ব্যবহার করতে হয়, যা মোটেও সহনীয় নয়। যদিও ওয়াসা কর্তৃপক্ষ বলছেন, এতে জীবাণু বা ক্ষতিকর কিছু থাকে না; কিন্তু ভুক্তভোগীদের বক্তব্য— শুধু স্বাদ-গন্ধের পরিবর্তন নয়, কালো পানিও আসে। ফুটিয়ে পান করলেও ময়লা থাকে এবং রঙ, স্বাদ বদলে যায়। আশার কথা, রাজধানীর পানি সমস্যা সমাধানে মেঘনা নদী থেকে পাইপলাইনে পানি আনার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। এ পানি পরিশোধনের মাধ্যমে সরবরাহ করার কথা। প্রকল্পটি যাতে দ্রুত বাস্তবায়িত হয় সে উদ্যোগ নিতে হবে। শুধু রাজধানী নয়, চট্টগ্রাম ও খুলনা মহানগরীর পানি সমস্যার সমাধানেও উদ্যোগ নিতে হবে সরকারকে। ঢাকা